জসিম উদ্দীন:
মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের পর আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার দিকে চেয়ে আছেন মামলার বাদী সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস।

চার্জশীট এবং তদন্তে কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকে আসামী হিসেবে অভিযুক্ত না করার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এমনটি মন্তব্য করেন।

শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বলেন, আদালতের প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। আমি তৎকালীন পুলিশ সুপারকে অভিযুক্ত করতে আবেদন করিনি। আমার আবেদন ছিলো ওনার (এসপি) দায়িত্ব অবহেলা এবং বিতর্কিত বক্তব্য প্রচারের জন্য অভিযুক্ত করা। চার্জশীট এখনো হাতে পায়নি। তবে, বিভিন্ন মাধ্যমে যতটুকু খবর পেয়েছি চুড়ান্ত প্রতিবেদনের ভেতর এসপির দায়িত্ব অবহেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনটি হয়ে থাকলে পরবর্তী ব্যবস্থা আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে নিবেন বলে আমার বিশ্বাস। তাই এখন আদালতের নির্দেশনার পানে-ই চেয়ে আছি আমি।

উল্লেখ্য, গত ৩ জুলাই ‘জাস্ট গো’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ট্রাভেলস শো ডকুমেন্টারির শুটিংয়ের জন্য তিনজন সহযোগীসহ কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে ওঠেন মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ। এই খবর পৌঁছায় টেকনাফের তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমারের কাছে। তখন থেকেই ওসি প্রদীপ অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘ভিডিও পার্টিকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, যেকোনো মূল্যে।’ এরপর থেকেই সিনহাকে নজরদারিতে রাখেন পরিদর্শক লিয়াকত ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত।

৩১ জুলাই সকালে একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর সিনহা রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন।

ওইদিন (৩১ জুলাই) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের দিকে আসার পথে বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আলোচনা হয় বিদেশেও।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন ও নিরাপত্তা বিভাগ। তখনই বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলিসহ সকল পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

এঘটনায় ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে, যিনি সিনহাকে গুলি করেছিলেন। টেকনাফ থানার ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয়েছে ২ নম্বর আসামি। এজাহারে বলা হয়েছে, গুলি করার আগে লিয়াকত তার সঙ্গে ফোনে পরামর্শ করেছিলেন। ওসির ‘প্ররোচনা ও নির্দেশনাতেই’ লিয়াকত ঠান্ডা মাথায় সিনহাকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে প্রদীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সিনহার ‘মুখমন্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে’ বিকৃত করার চেষ্টা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে টেকনাফ থানার এসআই দুলাল রক্ষিতকে, যিনি সিনহার মৃত্যুর পর মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন। এরপর অভিযুক্ত সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে র‌্যাব হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিনজন ছাড়াও এপিবিএনের তিন সদস্য, প্রদীপের দেহরক্ষী এবং পুলিশের মামলার তিন স্বাক্ষীসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেফতার করে। আদালতের নির্দেশে টেকনাফ থানায় মামলাটি রুজু হয়। দন্ডবিধি ৩০২, ২০১ ও ৩৪ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয় (মামলা নম্বর সিআর: ৯৪/২০২০ইং/টেকনাফ)।

দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় আলোচিত এই মামলাটি তদন্ত শেষে ওসি প্রদীপসহ ১৫জনকে অভিযুক্ত করে রবিবার (১৩ ডিসেম্বর) কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন র‌্যাব-১৫ এর কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. খায়রুল আলম। অভিযুক্তদের মাঝে ১৪ জন কারাগারে এবং একজন পলাতক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •