অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। তবে ১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রাম অবশ্যই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নয়। শুক্রবার সকালে জাতীয় জাদুঘরে ৪৭ তম বিজয়দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে সাবেক এক ভারতীয় উইং কমান্ডার মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করলে তিনি এ মন্তব্য করেন। দুই দেশের দূতাবাসের আয়োজনে এমন মন্তব্যে হতাশা প্রকাশ করে বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৭১ এর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধকৌশল উপস্থাপন করা হয়। এ সময় বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রামের এই অর্জনকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে আপত্তি জানান অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে আজ মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে আমি একটু কষ্ট পেয়েছি। কারণ প্রেজেন্টেশন দেখে মনে হয়েছে এটা ছিল পাক-ভারত যুদ্ধ। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই এ যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে হয়নি। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।”
অনুষ্ঠানে ভারতীয় উইং কমান্ডার ডিজে ক্লের ১২ দিনে ঢাকা বিজয় বইয়ের উন্মোচন করা হয়। বইয়ের পরিচিতিতেও মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাক যুদ্ধ হিসেবেই লেখা হয়। এ ব্যাপারে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বইয়ের লেখকের কাছে জানতে চাইলে আর্মড ফোর্সেস ভেটেরান উইং কমান্ডার ডিজে ক্লে ভিএম সময় সংবাদকে বলেন, এতে আপত্তির কিছু নেই।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে আমাদের বন্ধুরাস্ট্রের সৈনিকদের এভাবে উপস্থাপন আমাদের ব্যথিত করেছে।দুই দূতাবাসের যৌথ এই আয়োজনে হতাশা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। এ বক্তব্য প্রত্যাহারেরও দাবি জানান তারা।অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়েছে এটা বললে আমরা মেনে নিব না। ৩০ লাখ বাঙালি রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আমরা তাদের এ বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।আলোচনা সভার বাইরে মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর স্মৃতি বিজড়িত আলোকচিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
পাঠককুলকে জানাতে চাই , ঠিক তেমনি এর আগেও সিরাজদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর যে সব মুক্তিপাগল স্বাধীনতাকামীরা যে সংগ্রাম করেছে তা ইংরেজ শাসক ও তাদের পদলেহীরা বিকৃত আন্দোলন হিসেবে প্রচার করেছে তার বর্ণনা একটু পড়ুন।
১৭৫৭- তে পলাশীর যুদ্ধ বা মুসলমান শাসনের পতন হয়, আর ১৮৫৭ অর্থাৎ ১০০ বছর পর হয় মহাসংগ্রাম। এ ১০০ বছরের মাঝে ছোট বড় বহু আন্দোলন, আক্রমণ, যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের ধারা অব্যাহত থেকেছে। প্রধানতঃ মুসলমান পরিচালিত আন্দোলন ও সংগ্রামগুলো ছিল ইংরেজ সরকার ও তাদের দালাল অত্যাচারী কর্মচারী এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ইংরেজদের স্তাবক ও পদলেহীরা সেগুলিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় আন্দোলন বলে চালাতে চেয়েছে। এটা ছিল তাদের সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অপচেষ্টার অংশ। মুসলিম জাতিকে ঐক্যহীন করার অভিপ্রায়ে মুসলিম বিপ্লবীদেরকে ‘ওহাবী’ হিসাবে প্রচার করে দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাপক অমলেন্দু দে লিখেছেন, “জমিদারদের স্বার্থ রক্ষাকারী নয় অথবা জমিদারদের বাসস্থানের সংলগ্ন এলাকায় নয় এমন হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলের অধিবাসীরা কেবলমাত্র হিন্দু হওয়ার জন্য আক্রান্ত হয়েছেন এমন কোনো তথ্য সরকারি বা বেসরকারি সূত্র থেকে পাওয়া কষ্টকর।… মনে রাখা প্রয়োজন, মুসলিম বিপ্লবীরাই সর্বপ্রথম বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংঘবদ্ধভাবে ভারতবর্ষ হতে ইংরেজ বিতাড়নের জন্য সুদীর্ঘকালব্যাপী এক সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। আর এ বিপ্লবকে মুসলিম কৃর্তৃত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করবার অভিপ্রায়ে মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত ভারতবর্ষে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করা যায়।”(অমলেন্দু দে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, পৃষ্ঠা ১২৯)১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ পূর্ণতা পেতে পারে নি জমিদার আর রাজা-মহারাজাদের বেঈমানি করার কারণে- “যাদের উপর নির্ভর করে ইংরেজরা সে যাত্রায় পার হয়ে গিয়েছিল তারা ছিল ইংরেজ শাসনের দ্বারা সৃষ্টি কিছু অনুগত রাজা, মহারাজা ও জমিদার। (এন. ভট্টাচার্য, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৯।
১৮৫৭ সনের বিদ্রোহ শুধু সিপাহীদের নয়, লাখ লাখ সাধারণ মানুষও প্রত্যক্ষভাবে অস্ত্র ধরে লড়াই করেছেন, কোটি কোটি মানুষ তাদের সমর্থন করেছেন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ, খাদ্য ও অস্ত্র যুগিয়েছেন সাধ্যানুসারে এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধ্যাতীতভাবে। সাতান্নর বিপ্লবকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলার প্রতিবাদে কার্ল মার্কস বলেন, “ব্রিটিশ শাসক শ্রেণিরা অভ্যূত্থানকে কেবল সিপাহীবিদ্রোহ রূপে দেখাতে চায় তার সাথে যে ভারতীয় জনগণের ব্যাপক অংশ জড়িত তা লুকাতে চায় তারা।” (প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ: কার্ল মার্কস- ফ্রেডারিক এঙ্গেলস পৃষ্ঠা ১০) বিদ্রোহের ইতিহাস যাঁরা প্রথমে লিপিবদ্ধ করেছিলেন তাদের সকলেই ছিলেন ইংরেজ, বেশির ভাগ লেখক আবার ইংরেজ রাজপুরুষ। “ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একে বলেছেন সিপাহী বিদ্রোহ আর ভারতীয়েরা একে বলতে চান ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।” (সিপাহী যুদ্ধের ইতহাস: মণি বাগচি, প্রথম প্রকাশ, পৃষ্ঠা ১)বিদ্রোহের আগুনে ঘি মুর্শিদাবাদ থেকেই ভারতের মুসলমান শাসন হস্তান্তরিত হয়েছিল ইংরেজদের হাতে, মুর্শিদাবাদের বহরমপুরেই সৈন্যরা প্রথম বিদ্রোহ করে। তার পরের মাসে বিদ্রোহ হয় ব্যারাকপুরে। দেশের সর্বত্র মাওলানা পীর ও ফকির নামে অভিহিত অসংখ্য মুসলিম বিপ্লবী সিপাহীদের আরও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে সাহায্য করেন। বিদ্রোহ জোরদার হয়ে উঠল সৈন্যদের টোটা ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। প্রত্যেক ক্যান্টনমেন্টে একথা পৌঁছে দেয়া হল যে, দাঁতে কেটে যে টোটা বন্দুকে দেয়া হচ্ছে তাতে চর্বি আছে। আর চর্বি যেখানে বিক্রি হয় সেখানে গরু, মহিষ ও শূকর প্রভৃতি পশুর চর্বি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সুতরাং আরও ঘোরতর করে রটিয়ে দেয়া হল যে, টোটাতে শূকর ও গরুর চর্বি একত্রে মেশানো আছে। এ সম্বন্ধে এ উদ্ধৃতিটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়- “১৮৫৭-র গোড়ার দিকে যে মাত্র প্রচলিত শূকর ও গরুর চর্বি মাখান টোটার প্রবর্তন, ফকিরেরা বলতে লাগল -ইচ্ছা করে করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেক সিপাহী জাত খোয়ায়। …অযোধ্যা ও পশ্চিমের প্রদেশগুলিতে ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে লোকদের উস্কাতে লাগল এ ফকিরেরা।” (দ্র: কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, পৃষ্ঠা ১৯৮। ইংরেজদের লেখা ইতিহাসগুলিতে যাদেরকে ফকির, মওলানা, রেইডার্স বা ডাকাত ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে তারা ছিলেন প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিপ্লবী। ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে মুসলমানরাই সর্বাগ্রে বিদ্রোহী হয়, এর কারণ সম্বন্ধে ইংরেজরা তাদের কর্মচারি হেদায়েত আলীর কাছ থেকে যে রিপোর্ট নিয়েছিল তাতে বলা আছে: (ক) দাড়ি কাটা বাধ্যতামূলক ছিল না, কিন্তু পরে দাড়ি কাটতে বাধ্য করা হয়েছিল; (খ) শূকরের চর্বিযুক্ত টোটা দাঁতে কেটে ব্যবহার করতে হয়; (গ) সরকারি হাসপাতালে মেয়েদের পর্দা তুলে দেয়া হয়; (ঘ) সৈন্যদের শপথ নেয়া হয়, যেকোন দেশের সাথে বা যেকোন দূর দেশের যুদ্ধে যোগদান করতে হবে ইত্যাদি।
বিপ্লবীরা সারা দেশে রটিয়ে দিলেন যে, ইংরেজদের তত্ত্ববধানে যে সব ময়দা তৈরি হচ্ছে তাতে গরুর হাড়ের গুঁড়া মেশান হচ্ছে। সারা দেশের কোনো হিন্দু আর আটা বা ময়দা কিনতে চায় না। সৈন্যরাও রুটি খেতে অস্বীকার করল। এমনিভাবে লবণে হাড়ের গুঁড়া, ঘিয়ের সাথে জন্তুর চর্বি এবং কুয়ার জলে শূকর ও গরুর মাংস ফেলে জল অপবিত্র করা হয়েছে-এমন গুজবও রটে গেল। “পাউরুটিকে তখন লোকে বলত বিলিতী রুটি আর তাদের ধারণা ছিল এ বিলিতী রুটি খেলে জাত যাবে।” (তথ্য: মণি বাগচি, পৃষ্ঠা ৪৫) সমুদ্র পার হয়ে ভারতের বাইরে যুদ্ধে যাওয়া রীতিবিরুদ্ধ কাজ ছিল বলে ভারতীয় হিন্দু সৈন্যরাও ইংরেজদের উপর ক্ষেপে ওঠে। সৈন্যদের রান্নার ব্যাপারে হিন্দু মুসলমান উভয়ের জন্য যে পৃথক পৃথক পাচক থাকত তা তুলে দেওয়াও ক্ষোভের অন্যতম কারণ। শেষে পুরী জগন্নাথ মন্দিরের কর্তৃত্ব ইংরেজ কোম্পানী হাতে নিলে ক্ষোভ চরমে ওঠে। তাছাড়া তখন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচার এত ব্যাপক হচ্ছিল যে, হিন্দু মুসলমান উভয় জাতির সাধারণ মানুষ ও সৈন্যরা ক্ষেপে উঠেছিলেন। পাদ্রীরা হাট, ঘাট, বন্দর, হাসপাতাল ও স্কুল সর্বত্রই তাদের ধর্ম প্রচার করতে থাকে। প্রত্যেক স্কুলে বাইবেল শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। ছাত্রদের প্রশ্ন করা হত, ‘তোমাদের প্রভু কে এবং কে তোমাদের মুক্তিদাতা?’ ছাত্ররা শেখানো খ্রিস্টীয় পদ্ধতিতেই তার উত্তর দিত। (দ্র: সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস: আহমদ ছফা পৃষ্ঠা ১২, ১৩ ও ১৪ মি: হোমসের উদ্ধৃতি দিয়ে আহমদ ছফা বলেছেন, “হায়দার আলীর মত সামরিক প্রতিভার অধিকারী হলেও একজন সিপাহীকে (তার) অধীনস্থ একজন ইংরেজ সেপাইর সমান মাইনে দেয়া হবে না এ বৈষম্যের কারণে কর্তৃপক্ষের প্রতি সেপাইদের বিশ্বাস ক্রমশ শিথিল হয়ে আসে।” এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন, ইংরেজ অফিসাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের হিন্দু স্ত্রীলোক রাখতেন। অনেক সেপাইকে অর্থ ও নানা চাপ দিয়ে তাদের আত্মীয়দের এনে দিতে বাধ্য করতেন তারা। অবশ্য দারিদ্র্যের কারণে, টাকার লোভে অনেকে আপন আত্মীয়দেরকে সাহেবদের দিয়ে দিত। (আহমদ ছফা : ঐ ২৫, ৩১)বিদ্রোহের দাবানল ১৮৫৭ সনের ৩১ শে মে সারা ভারতে একসাথে বিদ্রোহ, বিপ্লব ও আন্দোলনের আগুন জ্বেলে অভ্যুত্থান ঘটান হবে ঠিক করা হল। “বিদ্রোহের বাণী সেদিন সারা ভারতে প্রচারিত হয়েছিল এক আশ্চর্য উপায়ে-চাপটির মারফত। ….এছাড়া মুসলমান সিপাহীদের প্ররোচিত করবার জন্য বহু মুসলমান ফকিরের সাহায্য গ্রহণ করা হয়েছিল” (মণি বাগচি, পৃষ্ঠা ৭৩)। রুটির ভিতরে থাকত পত্র। সুদক্ষ ব্রিটিশ গুপ্তচরও তা টের পায় নি। এদিকে ৩১ মে আসার আগেই মীরাটে ২৫ জন ভারতীয় সৈন্যকে কঠিনভাবে শাস্তি— দেয়া হয়। ফলে কর্নেল স্মিথের উপর লোক আরও ক্ষেপে ওঠে। এত হৈ চৈ সত্ত্বেও তিনি ‘দিল্লী গেজেটে’ লিখলেন: দিল্লী শান্ত, বিদ্রোহীদের শাস্তি দেয়ার পর মনে হচ্ছে এখানে আর কোন বিপদ ঘটিবার সম্ভাবনা নেই। তারপরে দেখা যায়, ভারতীয় জনসাধারণ ও সৈন্যরা জেলখানার লোহার গেট ভেঙ্গে ফেলেন এবং বিপ্লবী স্বেচ্ছাসেবকদের পায়ের বেড়ি খুলে দিয়ে মুক্ত করে দেন। খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে কর্নেল ফিনিশ একদল ইংরেজ সৈন্য নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বিপ্লবীদের সামনে দাঁড়ালেন। সেদিন কিন্তু সৈন্যরা তাকে কোন সম্মান তো জানালেনই না, বরং সকলে সিংহের মতো গম্ভীর হয়ে চোখের ভাষা দিয়ে জানিয়ে দিলেন- ‘আমরা তোমার গোলাম নই।’ পলকের মধ্যেই বিপ্লবীদের বন্দুক থেকে ঝাঁকে গুলি বের হতে লাগল-কর্নেল মি: ফিনিশ সাথে সাথে মারা গেলেন।
সারা ভারতে বিশাল জনতা ও বিপ্লবীদের তখন যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। সৈন্যরা মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিতেন ‘দ্বীন দ্বীন’ রবে। মুসলমান যোদ্ধারা বলতেন, “আমরা স্বধর্ম রক্ষা করার জন্য এখানে যুদ্ধ করতে এসেছি।” আরও বলা হত- “ইংরেজ শাসন ধ্বংস হোক, বাদশাহ দীর্ঘজীবী হোন” [দ্র:মণি বাগচি, পৃষ্ঠা ৯৯-১০১] যদিও দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের কঠোর নিষেধ ছিল ইংরেজ শিশু ও মহিলা যেন নিহত না হয়, তবুও বিপ্লবীরা সে চরম মুহূর্তে তার এ কথা পালন করতে পারেন নি। ১৬ই মে বেসামরিক অনেক খ্রিস্টান নারী ও বালককে আরো ভাল বন্দীখানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বের করে লম্বা দড়ি দিয়ে বেষ্টনী দিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে নিহত করা হয়। এ সঙ্কট-সময়ে একজন বুদ্ধিমতী মহিলা মিসেস আলডোয়েল বলেছিলেন, ‘মারার আগে তাদের কি অপরাধ আছে জানিয়ে দিলে ভাল হয়, কারণ মহিলা ও শিশুরা আপনাদের তো কোন ক্ষতি করে নি।’ উত্তরে বিপ্লবীরা ওই সময় খ্রিস্টান জাতির কাউকে ছাড়বেন না বলে জানান। ভদ্রমহিলা জানতেন জনতার বেশির ভাগই মুসলমান। তাই তিনি বললেন, ‘আমি মুসলমান হয়েছি, তবুও কি আমি রেহাই পাব না?’ এ উত্তরে বিপ্লবীরা তাকে ও তার তিনটি পুত্রকে স্পর্শ করেন নি। (মণি বাগচির লেখা সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাসের ১১১ পৃষ্ঠা)। মিরাটে পঞ্চাশ জন বিপ্লবী ধারা পড়লেন। তাদের বিচার না করে প্রত্যেকের হাত বেঁধে সারি করিয়ে কামান দাগা হল, সাথে সাথে পঞ্চাশটি প্রাণ ও তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উড়ে গেল কামানের গোলায়। অবশ্য ঘটনার নায়ক মি: ফ্রেজারকে বিপ্লবী আবদুল কাহ্হার গুলি করে হত্যা করেন।
বেনারসে হিন্দু সংখ্যাধিক্য। সেখানে তখন এক হাজার চারশো চুয়ান্নটি দেবমন্দির এবং দু’শো বাহাত্তরটি মসজিদ ছিল। মোঘল বংশের বিপ্লবী ‘ফিরোজ শাহ’ এ সময় বেনারসে পৌঁছাতেই তাকে দেখবার জন্য হিন্দু মুসলমানের ভিড় জমে উঠল। তখন কাশীর লোকসংখ্যা মি: মেকলের মতে পাঁচ লক্ষ, শতকরা ৯০ জন হিন্দু। মোঘল রাজকুমারদের নেতৃত্বে সমস্ত লোককে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করা হয়। কিন্তু অতীব দুঃখের কথা যে, “কাশীর রাজা ইংরেজ মিশনারীদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দান করেছিলেন এমনকি, অর্থ ও সৈন্য সাহায্য করতেও তিনি কৃপণতা করেন নি। শহরে জনতা, আতঙ্ক ও গোলমাল। মুসলমানেরা উড়িয়েছে সবুজ পতাকা। কয়েদীরা মুক্ত হয়েছে জেলখানা থেকে।” (সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৪৯)কাশীর রাজার সাহায্য পেয়ে মি: নীল নিষ্ঠুরভাবে প্রতিশোধ নিলেন। সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাসে লেখা হয়েছে-“বহুলোকের ফাঁসি হইল, পল্লীতে পল্লীতে নির্মম বেত্রাঘাত বেপরোয়াভাবে চলিল। সারি সারি ফাঁসিকাষ্ঠে বহু নির্দোষীর প্রাণবায়ু বহির্গত হইল। কর্নেল নীলের নির্দেশে ইংরেজ সৈনিক ও কর্মচারীরা কাশীর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে প্রবেশ করিয়া সেখানকার বহু লোককে রাস্তার দুই ধারের গাছে গাছে ফাঁসি দিয়া লোকের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করিতে লাগিল।” (পৃষ্ঠা ১৫৭)মাওলানা লিয়াকত আলির নেতৃত্বও সেদিন সারা দেশকে তোলপাড় করেছিল। যে কথাকে কেন্দ্র করে তিনি জনসাধারণকে উত্তপ্ত করতে পেরেছিলেন তা হচ্ছে- ‘ইংরেজরা ছলে বলে মানুষকে খ্রিস্টান করে ফেলবে; কোর’আন, পুরাণ সব খতম হয়ে যাবে।’ তিনি ছিলেন বিখ্যাত বক্তা, কঠোর পরিশ্রমী ও সংগ্রামী সংগঠক। বাগচি মহাশয়ও এর সমর্থনে লিখেছেন, ‘ইংরেজরা এবার স্থানীয় লোকদের জোর করে খ্রিস্টান করবে কিংবা অন্যভাবে তাদের জাত মারবে-এ জনরবের মূলে ছিলেন চুম্বুবাগের এক মৌলভী। নাম লিয়াকত আলী।’ (পৃষ্ঠা ১৫৩)।এলাহবাদেও এ আগুন চরম রূপ নিয়েছিল। একদিন ইংরেজ নেতা কর্নেল সিস্পসন চমকে উঠলেন বিপ্লবীদের কামানের আওয়াজে ঘোড়া ছুটিয়ে সেখানে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কেন এরকম করছ?’ উত্তরে সাথে সাথে বিপ্লবীরা গুলি করলেন। গুলিতে তার মাথা না উড়ে টুপি উড়ে গেল। সংবাদ পেয়ে আটজন খাস ইংরেজ সৈন্য তাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এল। কিন্তু গুলিবৃষ্টিতে সকলকেই নিহত হতে হল। কোতোয়ালীর মাথায় উড়ল মুসলমানদের সবুজ পতাকা। বিদ্রোহীদের তোপে তোপে রেলইয়ার্ডের ইঞ্জিনগুলো চূর্ণ হয়ে যেতে লাগল। এরপর সেনাপতি মি: নীল ১৮ই জুন নানা প্রদেশ হতে ইংরেজ সৈন্য যোগাড় করে একটা বড় স্টিমারে কামান সাজিয়ে গঙ্গা নদীর ধারে বেপরোয়া ভাবে গোলা বর্ষণ করতে লাগলেন। কামানের বর্ষণে নগর শ্মশানে পরিণত হল।
ঢাকায় সিপাহী বিদ্রোহকে কিভাবে দমন করা হয়েছিল তা লিখেছেন জনাব আবুল হাশিম: পূর্বাঞ্চলীয় সিপাহীরা ঢাকার লালবাগে জমায়েত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জনৈক চামড়ার ব্যবসায়ী গোপনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে এই সংবাদ জানান। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই বিদ্রোহ গোড়াতেই দমন করার সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা গোপনে ঢাকায় এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। আকষ্মিক হামলা চালিয়ে এই বাহিনী ঢাকায় যারা জমায়েত হয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করে এবং এই হত্যাকাণ্ড থেকে যারা বেঁচে যায় তাদেরকে বন্দী করে। তাদের ষাটজনকে (যাদের সবাই ছিলেন মুসলমান) গাছের ডালে লটকিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং তাঁদের মৃতদেহ শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। যে জায়গায় এই অমানুষিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় সেই জায়গাটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে পরিচিত। ১৮৭২ সালের অস্ত্র-আইন বলে ভারতের মুসলমানদের সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করা হয় এবং এভাবেই মুসলমানদের ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের ইতি ঘটে। এভাবেই বাংলার মুসলমানেরা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ভাইদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত শতবর্ষেরও অধিককাল ধরে ব্রিটিশ-বিরোধী বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়েছেন। (আজাদী আন্দোলনে মুসলিম বাংলার অবদানঃ আবুল হাশিম কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আল্লামা গোলাম আহমদ মোর্তজা, হায়দার আলী চৌধুরী প্রমুখ ঐতিহাসিক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •