মুহম্মদ নূরুল ইসলাম


আধুনিক ‘কক্সবাজার’ নামটি যার নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে তিনি হচ্ছেন ‘হিরাম কক্স’ (Hiram Cox)। অনেকেই এই ‘হিরাম’ শব্দটাকে ইংরেজির আদলে ‘হাইরাম’ উচ্চারণ করেন। হিরাম কক্স পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। হিরাম কক্স ১৭৫৯ খ্রীস্টাব্দে (মতান্তরে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে) স্কটল্যান্ডে জন্ম গ্রহণ করেন। কারো করো মতে তিনি দক্ষিণ ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা মেরী ছিলেন আলেকজান্ডার ফ্রেসার-এর কন্যা যার প্রমাতামহ ছিলেন অস্টম লর্ড লোভেটা। পিতা হেনরী চেম্বাস্ মারভে কক্স কিউ. ভি।

পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে তিনি ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই সেপ্টেম্বর ক্যাডেট হিসাবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষে আগমন করেন। ভারত বর্ষে আসার পর ১৮ই সেপ্টেম্বর কমিশন লাভ করেন। কমিশন লাভের পর থার্ড বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের পদাতিক বাহিনীতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে মে ল্যাফটেনেন্ট পদে পদোন্নতি পান এবং ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব প্রদান করলেন। ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব ঘাড়ের উপর চাপানোর পরেই তিনি হাপিয়ে উঠেন। সেনাবাহিনীর চাকুরি কঠিন। ভারতবর্ষের বৈরি পরিবেশে তা আরো বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। তবু নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যান। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক তাকে পেয়ে নিশ্চিন্ত থাকলেও কিন্তু তিনি চাকরিতে স্বস্তি বোধ করছিলেন না।

১১ই এপ্রিল, ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ। চিন্তাভাবনা না করেই তিনি হুট করে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে ইংল্যান্ড ফিরে যান। ইংল্যান্ড গিয়ে মা-বাবার সাথে দেখা করেন। বুড়ো বাবা, মা ঘরে একটি বউ নিয়ে আসতে অস্থির। ফলে মা-বাবার মন রক্ষা করতে তিনি বিয়ে করলেন। বিয়ে করে সংসারি হওয়ার চেষ্টা করলেন। এর মধ্যে ইংল্যান্ডে পাঁচ পাঁচটি বছর পেরিয়ে গেলো। ইতোমধ্যেই তিনি ছেলের বাবা হলেন। ইংল্যান্ডের চেনা জানা পরিবেশে তিনি হাঁফিয়ে উঠলেন। মনকে ইংল্যান্ডের চেনা জানা পরিবেশে টিকাতে পারলেন না। আবার সাত সাগর, তের নদী পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে ফিরে এলেন এবং ফিরে এলেন সেই চিরচেনা পুরোনো ডেরায়।

২৯শে অক্টোবর ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ। পূর্বে ছেড়ে যাওয়া চাকরিতে যোগ দিলেন। পুনরায় থার্ড বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টে ল্যাফটেনেন্ট পদে যোগদান করলেন। হিরাম কক্স তার সাধ্যমত আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। দেখতে না দেখতে আরো পাঁচ পাঁচটি বছর কেটে গেলো। ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি দিলেন এবং ব্যাটেলিয়ন ক্যাপ্টেন নিযুক্ত করলেন। এই পদে তিনি বেশি দিন থাকতে পারলেন না।

তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতায় কোম্পানী কর্তৃপক্ষ তাকে নতুন করে কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োগে উৎসাহ খুঁজে পান। ওখান থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃপক্ষ তাকে বার্মায় কোম্পানীর আবাসিক প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। ক্যাপ্টেন সাইম্স মিশনের সাফল্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং বার্মা সরকারের সাথে কোম্পানির সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চিত করার জন্যই ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন হিরাম (ঐরৎধস ঈড়ী) কক্সের নেতৃত্বে বার্মায় কোম্পানির পরবর্তী মিশন প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে বার্মায় ক্যাপ্টেন কক্সের নিয়োগ ছিল কোম্পানির একজন রেসিডেন্টের পদে, রাষ্ট্রদূতের পদে নয়। এই মিশনের উদ্দেশ্য এবং রেসিডেন্টের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ক্যাপ্টেন কক্সকে বিভিন্ন নির্দেশ দেয়া হয়। মিশনটির উদ্দেশ্য ছিল মূলত তিনটি। প্রথমত : বার্মা ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতি সাধন করা। দ্বিতীয়ত : বার্মায় বাণিজ্যরত বৃটিশ নাগরিকদের স্বার্থ ও সুবিধার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। সবশেষে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে বার্মায় ফরাসি প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করা। ১৭৯৪-৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংলান্ডে স্পেন ও হল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফরাসিদের বিপ্লবাত্মক যুদ্ধ চলাকালীন বিপক্ষীয় রণপোত বা বাণিজ্য জাহাজের বার্মা হতে রসদ সংহের প্রচেষ্টা এবং যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি বর্মী বন্দরে খালাস করার প্রয়াসকে বাধাদানও ছিল এই মিশনের উদ্দেশ্য। এ ছাড়া বার্মা সম্পর্কে ক্যাপ্টেন সাইম্স কর্তৃক সংকলিত বিবরণের অবশিষ্টাংশ প্রণয়নের দায়িত্ব ও ক্যাপ্টেন কক্সকে দেয়া হয়। এ পর্যায়ে বার্মার আভ্যন্তরীণ শাসন, শিল্প-কলা, বাণিজ্য, সাহিত্য ও ভৌগোলিক বিষয়গুলো অনুসন্ধানের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। কলিকাতায় একজন বর্মী রাষ্ট্রদূত প্রেরণের জন্য বর্মীরাজকে উৎসাহী করে তোলার নির্দেশও ক্যাপ্টেন কক্সকে দেয়া হয়। বাণিজ্য প্রসংগে রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও কার্যবলী সম্পর্কে তাঁকে কয়েকটি বিশেষ নির্দেশ দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে, ক্যাপ্টেন সাইম্স বার্মায় কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি। তার কারণেই বার্মার সাথে কোম্পানীর মধ্যে শীলত সম্পর্ক বিরাজ করছিলো। কিন্তু ক্যাপ্টেন সাইম্স কলকাতা ফিরে গভর্ণর জেনারেলের কাছে ঠিক উল্টো বিবরণ প্রদান করেন। এতে করে গভর্ণর জেনারেল তথা কোম্পানী প্রকৃত অবস্থা থেকে যোজন যোজন দূরে ছিলো। ঠিক সেই নাজুক সময়ে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে বার্মায় কোম্পানীর আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

একজন দোভাষী, কয়েকজন কেরাণী ও ভৃত্য, একজন হাবিলদার ও নায়েকসহ ১২ জন সিপাহীর একটি ক্ষুদ্র দেহরক্ষী দল নিয়ে ক্যাপ্টেন সিম্পসন পরিচালিত কোম্পানির জাহাজ ‘সোয়াল’রের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন কক্স ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই অক্টোবর রেংগুন পৌঁছান। রেংগুন পৌঁছে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করে কোম্পানীর প্রাক্তন প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন সাইম্স-এর স্থলাভিষিক্ত হন।

প্রকৃতপক্ষে ক্যাপ্টেন কক্সের রেংগুন বন্দরের সহকারী কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ করার পূর্বেই একটি ঘটনা কোম্পানির মিশনের প্রতি বর্মীদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটায়। ঘটনাটি ছিল বর্মীরাজা কর্তৃক কোম্পানির নিকট আরাকানে অরাজকতার অপরাধে অভিযুক্ত কয়েকজন সর্দার ও তাদের পরিবারবর্গের প্রত্যর্পণ দাবী। উল্লেখ্য যে, সর্দারদের প্রত্যর্পন দাবী ছিল ক্যাপ্টেন সাইম্সের নিকট বর্মীরাজের চিঠিতে উল্লেখিত বক্তব্যেরই প্রতিফলন। গভর্ণর জেনারেল জন শোর বর্মীরাজের এই দাবী অযৌক্তিক মনে করে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশ্য এ বিষয়ে তিনি বর্মীদের সমস্ত বক্তব্য বার্মায় কোম্পানির রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন কক্সের নিকট পেশ করার অনুরোধ জানান। আরাকানি সর্দারদের প্রত্যর্পনের দাবী প্রত্যাখ্যাত হওয়াই ছিল কোম্পানির মিশনের প্রতি বর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার একমাত্র কারণ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর বার্মা রাজা বোধপায়া স্বাধীন আরাকান আক্রমন করেন এবং ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে সম্পূর্ণ দখলে নেয়। এতে প্রায় পাঁচ হাজার বছরের আরাকানের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। বর্মীরাজার সেনাপতি মহাবান্দুলার নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের ফলে প্রায় একলক্ষ আরাকানি কক্সবাজারের রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, মহেশখালী, উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে অত্যাচারিত আরাকানিরা প্রাক্তন রাজবংশের ওয়েসো নামে জনৈক বংশধরকে রাজা হিসাবে মনোনীত করে বর্মীবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বর্মীরা এই বিদ্রোহ দমন করে। এরপর অত্যাচার আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। এ সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ইরাঙ্কিন বলেন, “বর্মীরা বিজিত ও নিরীহদের উপর অত্যাচারের জন্য দায়ী। আমার আদৌ সন্দেহ নেই যে হাজার হাজার নর-নারী ও শিশুকে সুস্থ মস্তিকে হত্যা করা হয়েছে।”

এঘটনার পরে আরাকানের আর এক অমাত্যের সন্তান সিনপিয়ান (ব্রিটিশরা তাকে কিং বেরিং নামে ডাকে) আরাকানের হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে দেশপ্রেমিক আরাকানিদের সংগঠিত করেন এবং একাধিকবার বর্মী সেনাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে বর্মীবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। একারণেই বর্মীরাজ আরাকানি সর্দারকে তাদের হাতে প্রত্যর্পনের দাবী জানায়।

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স দীর্ঘ চার মাস রেংগুনে অনেক দৌঁড়-ঝাপ করে অবশেষে লুট্ট এর তিনজন উচ্চ পদস্থ কর্মচারী তথা হানসাওয়াধির মিথোউন এবং রেংগুনের ইয়েউনের সাহায্যে ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি তিনি বর্মীরাজের সাক্ষাৎ লাভে সক্ষম হন। এই সময় ক্যাপ্টেন কক্স বর্মীরাজের নিকট তিনটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপি তিনটি ছিল কোম্পানির প্রতিনিধির কূটনৈতিক অধিকার, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ফরাসি তৎপরতা সংক্রান্ত। কোম্পানির প্রতিনিধির কূটনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত স্মারকলিপিতে ক্যাপ্টেন কক্স নিন্মোক্ত দাবীসমূহ পেশ করেন। প্রথমত : কোম্পানির এজেন্ট বার্মার আইনের এখতিয়ারের বহির্ভূত এবং তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ কলিকাতা কর্তৃপক্ষের নিকট উত্থাপন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত : কোম্পানির এজেন্টকে রেংগুনে অফিস, বাসগৃহ নির্মাণের অধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া এজেন্ট ও তাঁর লোক-লস্করদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ হবে সর্বপ্রকার শুল্ক মুক্ত।

তৃতীয়ত : বৃটিশ এজেন্ট তাঁর নিরাপত্তার জন্য দেহরক্ষী রাখতে পারেন, তবে দেহরক্ষীর সংখ্যা বর্মী সরকার নির্ধারণ করবেন।

সবশেষে : কোম্পানির এজেন্ট বর্মীরাজ ও রাজবংশের সদস্যদের নিকট অবাধ গমনাগমন করতে পারবেন। এ ছাড়া বৃটিশ সরকারের সাথে সমস্ত যোগাযোগ কোম্পানি এজেন্টের মাধ্যমে করতে হবে।

বাণিজ্যিক স্বার্থ সংক্রান্ত স্মারকলিপিতে ক্যাপ্টেন কক্স বর্মীরাজের নিকট যে সমস্ত দাবী পেশ করেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলÑ ১) বাণিজ্যিক উন্নতির জন্য মুদ্রার প্রচলন, ২) রেংগুনের জাহাজের উপর শুল্ক হ্রাস, ৩) রেংগুনে বন্দরে দ্রব্যাদি পরীক্ষা করার আপত্তিকর পদ্ধতির বিলোপ, ৪) আমদানী শুল্ক হ্রাস করে ৫% এ স্থিতিশীলকরণ, ৫) বর্মী বণিকদের নিকট হতে বকেয়া দাবী আদায়ে বর্মী সরকারের আইন ও প্রশাসনিক বিভাগের সাহায্যে, ৬) সমুদ্রের মধ্যে বৃটিশ নাগরিকদের জাহাজ সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ বর্মী সরকারের বিচারের এখতিয়াভুক্ত না হওয়া, ৭) উভয় দেশের বণিকদের মধ্যে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা উভয় পক্ষের প্রতিনিধির মাধ্যমে সম্পাদন করা, ৮) দ্রবাদি ক্রয় ও বিক্রয়ে ইংরেজ বণিকদের বার্মায় যথেচ্ছ গমনাগমনের সুবিধা, ৯) বৃটিশ জাহাজগুলোর যাত্রী ও নাবিকদের জন্য বার্মা হতে তিন মাসের রসদ সংগ্রহের অনুমতি, ১০) বার্মায় কোন বৃটিশ বণিকের মৃত্যু হলে তাঁর সমুদয় সম্পত্তি কোম্পানির এজেন্টের নিকট হস্তান্তরকরণ এবং ১১) বন্দরে শুল্ক পরিশোধ করার পর কোম্পানির জাহাজ বিলম্ব না করানো।

বার্মায় বাণিজ্যিরত বৃটিশ নাগরিকদের অভিভাবক ও পরিদর্শক হিসেবে রেসিডেন্টের বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বার্মার সাথে আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যে লিপ্ত বৃটিশ বাণিজ্য জাহাজ ও ক্যাপ্টেনদের জন্য একটি রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ এবং ইংরেজ ব্যতীত বার্মায় অন্যান্য বৃটিশ প্রজাদের এফিডেভিট গ্রহণ। এই সাথে ভারতের বন্দরে বাণিজ্য করতে ইচ্ছুক বর্মী বাণিজ্য জাহাজগুলোকে অনুমতিসহ উৎসাহ প্রদানের দায়িত্বও ক্যাপ্টেন কক্সের উপর অর্পণ করা হয়। মিশনটির উদ্দেশ্য সাধনে এবং রেসিডেন্ট হিসাবে সার্বিক দায়িত্ব পালনে কোম্পানি ক্যাপ্টেন কক্সের নিপুণতা, শিষ্টাচার এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রকৃত পক্ষে ক্যাপ্টেন সাইম্সের নিকট প্রেরিত বর্মীরাজের পত্রে কোম্পানির প্রতিনিধির যে ক্ষমতা ও পদ মর্যাদার উল্লেখ করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্ব কোম্পানি ক্যাপ্টেন কক্সের উপর অর্পণ করে।

বর্মীরাজের নিকট উপস্থাপিত ক্যাপ্টেন কক্সের তৃতীয় স্মারকলিপি ছিল বার্মায় ফরাসিদের প্রভাব সম্পর্কে। ক্যাপ্টেন কক্স দাবী করেন যে ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানি কর্তৃক তিনজন আরাকানি সর্দারকে বর্মীদের হাতে এই শর্তে অর্পন করা হয়েছিল যে বর্মী সরকার ইংরেজদের শত্রুদের বিশেষত: ফরাসিদের বার্মায় আশ্রয় দেবেন না, এবং ফরাসি জাহাজগুলোকে মেরামত বা লুন্ঠিত দ্রব্য খালাস করার জন্য বর্মী বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। উক্ত শর্তানুযায়ী ক্যাপ্টেন কক্স দাবী করেন যে কোন ফরাসি জাহাজ বর্মী বন্দরে অবতরণ করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে বন্দর ত্যাগ করার নির্দেশ দিতে হবে, অন্যথায় জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করা হবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে বর্মী কর্মচারী বা প্রজাগণ ফরাসি জাহাজকে কোন রসদ বা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন না।

অবশেষে ক্যাপ্টেন কক্সের স্মারকলিপি ল্ট্টুর রাজ দরবারে আলোচিত হয়। আলোচনার সময় বর্মী মন্ত্রীবর্গ কিছু অপ্রত্যাশিত সুপারিশ করেন। প্রথমত : চট্টগ্রামে আশ্রিত আরাকানী উদ্বাস্তুদের প্রত্যর্পনের জামিন স্বরুপ রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন কক্সকে বার্মায় আটক রাখা হোক। দ্বিতীয়ত : বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর, কাশিমবাজার, মুর্শীদাবাদ ও ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে বর্মী সরকারের নিকট হস্তান্তর করার জন্য কোম্পানীর উপর চাপ প্রয়োগ করা হোক। উল্লেখ্য যে একত্রে বর্মী মন্ত্রীগণ ঐতিহাসিক কারণ দর্শিয়ে এই অঞ্চলেসমূহ আরাকানিদের অধিকারভূক্ত বলে গণ্য করেন। অবশ্য পরে এই সিদ্ধান্তটি পরিবর্তন করে ঢাকার অর্ধেক অংশ দাবী করার বিকল্প সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপ্টেন কক্স ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। তিনি গভর্ণর জেনারেলকে জানান : “অল্পকালের মধ্যে আমার কোন চিঠি না পেলে ধরে নিবেন যে, আমি অন্তরীণাবদ্ধ ও সকল প্রকার যোগাযোগ বর্জিত। ক্যাপ্টেন কক্স এ সময় বর্মীদের সামরিক প্রস্তুতির কথা কোম্পানীকে অবগত করান। তিনি জানান যে বর্মী সরকার আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম ও আসাম সীমান্তে ২০,০০০ সৈন্য সমাবেশ করেছেন। এ ছাড়া ১০,০০০ সৈন্যের একটি দল রেংগুন ও পেগুর নিরাপত্তার জন্য বার্মার দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এই সময় ক্যাপ্টেন কক্স বার্মা সম্পর্কে ক্যাপ্টেন সাইম্স প্রদত্ত বিবরণের তীব্র সমালোচনা করেন। কক্সের মতে বার্মা সম্পর্কে ক্যাপ্টেন সাইম্সের অতিরঞ্জিত কাহিনী কোম্পানীকে বর্মীদের প্রতি তোশন নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে এবং পরিণামে এই ব্যবস্থা কোম্পানীকে ভুল পথে পরিচালিত করতে বাধ্য করেছে। প্রকৃতপক্ষে কোম্পানীর প্রতি বর্মীদের মনোভাব পবিবর্তনের কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত : এন্ডারসনের গ্রন্থে প্রকাশিত পিকিং এ লর্ড মেকাটিনের মিশনের ব্যর্থতা বর্মী সরকার অবগত হন এবং এরই প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কোম্পানীর প্রতি বর্মী সরকারের নীতিতে। দ্বিতীয়ত : বর্মী রাজদরবারে অহমীয়া দল, মিইন উনজিও মালাবারের শাহবন্দরসহ রেংগুন ও অমরাপুরার প্রভাবশীল রাজনৈতিকচক্র আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে জনরব ছড়িয়ে কোম্পানীর প্রতি বর্মী ভয় ও সন্দেহকে বদ্ধমূল করে তোলেন। তৃতীয়ত : দুটি জনশ্রুতি কোম্পানীর প্রতি বর্মী সরকারের বিরূপ মনোভাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই জনশ্রুতি দুটি হল মিনগুনের প্যাগোডা নির্মাণে বার্মা ধ্বংশ হয়ে যাবার ভবিষ্যদ বাণী। এই ঘটনার পূর্বে বার্মার ধাতু নির্মিত নতুন মুদ্রা প্রবর্তন করা হবে বলে জনৈক ফুংগী আরো একটি ভবিষ্যৎ বাণী করেন। উল্লেখ্য যে, কিছুদিন পূর্বে বর্মীরাজ বোধপায়া ধাতু নির্মিত নতুন মুদ্রা প্রবর্তন করেন এবং ক্যাপ্টেন কক্স তাঁকে কিছু মুদ্রাও একটি মুদ্রাযন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। নতুন মুদ্রা প্রচলনের ফলে বার্মার অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এই অবস্থাকে নতুন মুদ্রা প্রবর্তনজনিত ফল হিসেবে গ্রহণ না করে শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন কক্সকেই তাদের দূর্গতির জন্য দায়ী করা হয়। এ ছাড়া আসামের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বার্মাও বাংলাদেশের পরস্পর বিরোধী ভূমিকা কোম্পানীর প্রতি বর্মীদের শেষ আন্তরিকতাও লুপ্ত হয়ে যাবার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

কোম্পানীর প্রতি বর্মী সরকারের এই মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপ্টেন কক্স তাঁর সমস্ত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমকালীন রাজনীতি ছিল সম্পূর্ণরূপে তাঁর বিরোধী। বার্মায় কোম্পানীর মিশনের অচলাবস্থায় ক্যাপ্টেন কক্সের কলিকাতার পথে প্রত্যাবর্তন করার প্রত্যেকটি অনুরোধ বর্র্মী সরকার প্রত্যাখান করেন। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রাজপ্রাসাদে একটা ঘটনা কক্সকে নতুন করে অনুকূল পরিবেশের প্রত্যাশায় আশান্বিত করে তুলে। ক্যাপ্টেন কক্সের প্রত্যক্ষ বিরুদ্ধাচারণকারী মিইন উনজি বর্মী সভাসদের সহায়তায় বর্মীরাজ বোধপায়াকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করে ব্যর্থ হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপ্টেন কক্স পুনরায় বর্মীরাজের নিকট তাঁর দাবীসমূহ উত্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর দাবীসমূহ প্রত্যাখ্যাত হয় এবং তিনি ১৭ই অক্টোবর অমরাপুরা ত্যাগ করে নৌকাযোগে ১লা নভেম্বর রেংগুন পৌঁছান। রেংগুনেও ক্যাপ্টেন কক্সকে এক বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। হানসাওয়াদীর মিয়োউন ক্যাপ্টেন কক্সকে অনতিবিলম্বে অমরাপুরায় প্রত্যাবর্তনের জন্য নির্দেশ জারী করেন। প্রকৃতপক্ষে এই নির্দেশের অর্থ ছিল রেসিডেন্টের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করা। ক্যাপ্টেন কক্স নিজেই সংকটময় পরিস্থিতি উপলব্ধি করেন এবং তিনি সুপ্রীম কাউন্সিলকে জানালেন : “আমার বাসস্থান হতে আমায় বলপূর্বক নিয়ে যাবার কোন প্রচেষ্টাই আমি বিনা বাধায় হতে দেব না। যাই হোক না কেন, যতদিন না আপনাদের নির্দেশ পাই ততদিন আমার স্থান ও নীতি রক্ষা করবোই।”

রেংগুন ও অমরাপুরায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্মী সরকার রেংগুনে কোম্পানীর রণতরীর আক্রমণের আশংকা করেন এবং আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন কক্স জানান যে, বিনা অনুমতিতে কোন জাহাজ রেংগুন নদী বেয়ে যাতে অগ্রসর হতে না পারে সেজন্য রেংগুনের নিকটে বর্মী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ সময় রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন কক্স বার্মার সাথে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও কর্মপন্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি কোম্পানীকে জানান : অতীত অপমানের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যৎ আক্রমণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ছাড়া অন্য কোন শর্তে এদের সঙ্গে আপোষ করবেন না। এ উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে তরবারি হাতে নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে। আপনাদের পূর্ব সীমান্তবর্তী প্রদেশের নিরাপত্তার জন্য এ জাতির সংগে একটি দৃঢ় মৈত্রী চুক্তির জরুরী প্রয়োজন রয়েছে। এরা যদি আমাদের নিয়ন্ত্রাধীনে না আসে, কিংবা আমরা যদি এদের নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার অর্জন করতে না পারি তবে শীঘ্রই বাংলার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে। কারণ বাংলাদেশের উপর এদেশের যে কোন নৌশক্তি সম্পন্ন জাতির কাজে আসে এমন কতগুলো অবস্থা ও সুবিধাদি রয়েছে। এরপর কোম্পানীর নিকট লিখিত রেসিডেন্ট কক্স-এর কয়েকখানা পত্রে কক্স মিশনের করুণ চিত্র প্রতিভাত হয়। কোম্পানী এ পর্যায়ে বর্মীরাজ, তাঁর প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উনজি, দ্বিতীয় উন-জি ও পেগুর প্রতিনিধির নিকট সরকারি পর্যায়ে সংবাদ প্রেরণ করে মিশনের ব্যর্থতার জন্য রেসিডেন্ট কক্সকেই দায়ী করে এবং রেসিডেন্টকে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেয়। তাঁকে জানানো হয় যে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তনে বর্মীরা কোন বাধা দিলে কোম্পানীর সুপ্রিম কাউন্সিল সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ সময় হঠাৎ করে বর্মীদের মনোভাব পরিবর্তন হয় এবং তারা কোম্পানীর মিশনের প্রতি আন্তরিতাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেন। সম্ভবত : মিশনটি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের সংবাদই বর্মীদের মনোভাব পরিবর্তনের কারণ ছিল। ক্যাপ্টেন কক্স ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন কলিকাতায় ফিরে আসেন। উল্লেখ্য যে, ক্যাপ্টেন কক্স এর রেংগুন ত্যাগ করার পর পরই লুট্ট হতে প্রকাশিত এক বিজ্ঞাপ্তিতে বর্মী সরকার ক্যাপ্টেন কক্সকে রিসিডেন্ট হিসেবে বিভিন্ন সুবিধাদানের প্রস্তাবে সহযোগিতা করতে রাজী হন। বর্মীদের এই সহযোগিতার বক্তব্য ভিত্তিহীন। কারণ এরপর ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষ বার্মায় পুনরায় এজেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব করলে বর্মীদের নিরুত্তর থাকতে দেখা যায়।

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের মিশনের ব্যর্থতা হতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উপলব্ধি করা যায়। প্রথমত : ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বাক্ষরিত ক্যাম্পো-ফরমিও চুক্তির পর ইউরোপের রাজনীতিতে ইংল্যান্ডের মর্যাদার ব্যাপক হ্রাস লক্ষ্য করা যায় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডকে ফরাসী শক্তির মোকাবিলা করতে হয়। এই ক্ষমতা ও মর্যাদা হ্রাসের প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি ছিল ভারতের দেশীয় রাজন্যবর্গের দরবারে ফরাসীদের প্রাধান্যও তাদের বিরোধী ষড়যন্ত্র। নিজাম, সিন্ধিয়া ও টিপু সুলতানের দরবারে ফরাসী শক্তি প্রাধান্য লাভ করে। ভারতের রাজনীতিতে কোম্পানীর এই অবস্থার সুযোগ নিয়েই বর্মী সরকার বারংবার চট্টগ্রাম সীমান্ত লংঘন ও কোম্পানীর মিশনের অগ্রাহ্য করেন। এই অবস্থার সাথে সংযোগ ঘটেছিল পিকিং এ লর্ড মের্কাটনির মিশনের ব্যর্থতা। কক্স মিশনে দ্বিতীয় গুরুত্বটি ছিল বার্মা সম্পর্কে ক্যাপ্টেন সাইম্স প্রদত্ত অতিরঞ্জিত ও ভুল ধারণার নিরসন। কক্স মিশনের পর পরই কোম্পানী বার্মা সম্পর্কে তাদের ভুল ধারণা উপলিব্ধি করতে সক্ষম না হলেও পরবর্তীকালে ক্যাপ্টেন ক্যানিং এর মিশনসমূহের মাধ্যমে কক্স মিশনের ব্যর্থতার কারণ উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স কলকাতা ফিরে আসার পরেই তাকে চট্টগ্রামের দক্ষিণে আরাকানি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য সুপারিনটেন্ডেন নিযুক্ত করা হয়। উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দিয়ে হিরাম কক্সকে চট্টগ্রামের কালেক্টর মি. ফ্রায়ারের কাছে পাঠানো হয়। হিরাম কক্সের নিযুক্তির পূর্বে চট্টগ্রামের কালেক্টর তার নিজস্ব লোকজনদের মাধ্যমেই উদ্বাস্তুদের দেখ-ভাল করতেন। ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নতুন নিয়োগ পাওয়ার পরে চট্টগ্রামের পরীর পাহড়ে পৌঁছে কালেক্টর মি. ফ্রায়ারের কাছে তার পরিচয় পত্র পেশ করেন।

তখন শুষ্ক মওসুম। সম্ভবত ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর বা ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি। ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স তার বাহিনী নিয়ে রামু পৌঁছেন। তিনি রামু পৌঁছে আরাকানি উদ্ভাস্তুদের অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং তাদের পুনর্বাসনে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কক্স এর স্থান নির্বাচন ছিল সুস্পষ্ট এবং সুদৃঢ়। কোম্পানী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। কক্স সরকারি মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলেই পুনর্বাসনের স্থান নির্ধারণ করেন। দক্ষিণাঞ্চলে ইতিমধ্যেই বিচ্ছিন্নভাবে উদ্বাস্তুরা বসবাস শুরু করে দিয়েছিল। উত্তরাঞ্চলে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করার পক্ষে পূর্বে বোর্ড অব রেভেনিউর সদস্য টমাস গ্রাহাম জোর সুপারিশ রেখেছিলেন। তিনি দক্ষিণাঞ্চলে পুনর্বাসনে প্রতিবন্ধকতার প্রশ্ন তোলেন।

ক্যাপ্টেন কক্স দক্ষিণাঞ্চলে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কারণ ছিল এই যে, (১) চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে চাষাবাদ ও বসতি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, (২) উদ্বাস্তুদের বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমষ্টিগতভাবে পুনর্বাসন দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে এরা একে অন্যের সাহায্য করতে পারবে এবং নিজেদের প্রাচীন আইনের মাধ্যমে শাসিত হয়ে বনভূমি আবাদ করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবে, (৩) উদ্বাস্তুদের ব্যক্তিগতভাবে পুনর্বাসন সাময়িকভাবে লাভবান করবে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট উদ্বাস্তুদের জীবন হবে দরিদ্র ও ভবঘুরের মত এবং তারা এই নিরাপত্তাহীন জীবন বেশীদিন পছন্দ করবে না। তাই তিনি উদ্বাস্তুদের বাঁকখালী নদী অথবা নাফ নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে পুনর্বাসনের স্থান নির্বাচন করেন। এই অঞ্চল নির্বাচনের পেছনে তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, (১) উদ্বাস্তুরা নিজেরাই এসব জায়গা পছন্দ করছে, (২) এখানকার অধিকাংশ জমিই অনাবাদী এবং সম্ভবত: যে কোন বৈধ দাবী হতে মুক্ত, (৩) জঙ্গল পরিষ্কার কষ্টসাধ্য হলেও আবাদ করে কোম্পানীর রাজস্ব এবং আয় বৃদ্ধি সম্ভব, (৪) এই অঞ্চলে পূর্ব থেকে বসবাসকারী আরাকানীরা উদ্বাস্তুদের সাহায্য করতে পারবে, (৫) এই অঞ্চলে প্নুর্বাসনে তিনি একটি প্রশাসনিক সুবিধাও দেখেন। আর তা এই যে, তাদের জঙ্গী স্বভাব মগ, বর্মী বা পার্বত্যবাসীদের আক্রমণ প্রতিহত করার কাজে লাগবে। তবে তিনি কিছু অসুবিধাও লক্ষ্য করেন। প্রথমত : কোম্পানীর প্রতি বর্মী সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং দ্বিতীয়ত : আরাকানী বিদ্রোহী সর্দারদের আক্রমণের প্রবণতা। সমকালীন নথিপত্রে তার প্রমাণ না থাকলেও বার্মা মিশনে কক্স-এর তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাকে উদ্বাস্তুদের এ অঞ্চলেই পুনবার্সিত করে বর্মী সরকারের মাথা ব্যথার কারণ সৃষ্টি করার কাজে উৎসাহী করে তুলেছে। কক্স এর বার্মা মিশনটি ছিল মোটামুটি ব্যর্থ এবং মর্যাদাহানীকর। কখনো কখনো তাকে অদক্ষ অফিসার মনে হতে পারে। কিন্তু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল বলিষ্ঠ এবং তৎপরতা ছিল বেগময়। তিনি বার্মা সরকারের যে কোন আক্রমণ মোকাবেলার জন্য বাঁকখালী নদীর তীরে সেনা ঘাটি স্থাপনের সুপারিশ করেন। তিনি রামু হতে উখিয়াঘাট ও নাফ নদী পর্যন্ত তীর হতে ত্রিশ মাইল দূরত্ব রেখে একটা রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করেন। অবশ্য পূর্বে লেফটেনেন্ট টমাস ব্রগহাম এই রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করেছিলেন। এই রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব বোর্ড অব রেভিনিউ সমর্থন করে। রাস্তা নির্মাণের কাজে কক্স উদ্বাস্তুদের নিয়োগ করেন। রামু হতে উলিয়াঘাট পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণে উদ্বাস্তুদের ব্যবহারের জন্য বোর্ড অব রেভিনিউ ঢাকার কালেক্টরকে ৩৫০০ টি কোদাল প্রেরণের নির্দেশ দেন।

উদ্বাস্তুদের ব্যক্তিগত জীবনে তাদের আইন ও প্রথাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে এখানকার আইনকে, প্রথাকে উপেক্ষা করা হয়নি- সমন্বয় সাধনের একটি শর্ত লক্ষ্য করা যায়। ক্যাপ্টেন কক্স সঠিকভাবে কোম্পানীর স্বার্থ স্বীকার করে পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করেন। তিনি রামু হতে উখিয়ারঘাট পর্যন্ত প্রস্তাবিত রাস্তার দুই পার্শ্বে উদ্বাস্তুদের বসতি দেবার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি আদর্শ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বনভূমি পরিস্কার ও আবাদের জন্য উদ্বাস্তুদের ২০০ কুঠার, ১০০ কাঁটারি, ১২ খানা বড় কাঁচি, ২০টি করাত, ৫০টি শুচালু কুঠার, ১০০টি কোদাল এবং ৪টি শান পাথর দেওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন কক্স রামুর অফিসে বসেই তার যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন। তিনি অফিসের সাথেই তার থাকার ব্যবস্থা করেন। আরাকানী উদ্বাস্তুদের সম্পূর্ণ পুনর্বাসনের পূর্বেই বর্ষা মওসুম শুরু হয়। এতে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যেমন বাঁধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হন। রামুতে তখন উন্নত চিকিৎসা ব্যবসা ছিলো কল্পনা বিলাস। ফলে বলতে গেলে প্রায় ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স বিনা চিকিৎসায় ১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দের ২রা আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। রামু বাঁকখালী তীরে কক্সকে সমাহিত করা হয়েছিল বলে রামুতে একটি কথা প্রচলিত আছে। বাঁকখালী নদীর গতি পথ পরিবর্তন ও ভাংগনে সেই সমাধি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

তিনি আরাকানি উদ্বাস্তুদেরকে পেশাভিত্তিক ভাবেই পুনর্বাসন করেন। এসময় বর্তমান কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর দক্ষিণ কূল ঘেষে অনেক উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসন করেন। এসময় তিনি বাঁকখালী নদীর তীরে একটি বাজারের পত্তন করেন এবং বাজারের সন্নিকটে পাহাড়ের উপর বৌদ্ধ মন্দির স্থাপন করেন।

ক্যাপ্টেন কক্সের মৃত্যুর পরে ঢাকার রেজিস্ট্রার মি. কার হিরাম কক্সের স্থলাভিষিক্ত হন। আর ইতোধ্যেই হিরাম কক্স প্রতিষ্ঠিত বাজারটি ‘কক্স সাহেবের বাজার’ নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ফলে মি. কারও বাজারের নাম ‘কক্স সাহেবের বাজার হিসেবে রেখে দেন।’ পরবর্তীকালে বাজারটি ‘কক্স সাহেবের বাজার’ থেকে ‘কক্সবাজার’-এ রূপ লাভ করে।

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স বার্মার রেসিডেন্ট হিসাবে নিযুক্ত থাকার অভিজ্ঞতার ওপর একটি বই লেখেন। বইটি নাম Journal of a Residence in the Burma Empire । বইটি তার পুত্র এইচ সি এম কক্স কিউ ভি ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন।


লেখক : সাংবাদিক, লোকগবেষক, ইতিহাস লেখক, সভাপতি, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী।

e-mail :islamcox56@gmail.com.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •