ইকবাল বাহার জাহিদ

একটা সময়ে স্কুলে অলিখিত একটা নিয়ম ছিল, যারা ভালো ছাত্র (মেধাবী) তারা সবাই বিজ্ঞান বিভাগে পড়বে অর্থাৎ তারা ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হবে। যারা গড়ে ৪০-৫০ নম্বর পেতেন ও ইংরেজিতে ফেল করতেন তারা বাণিজ্য বিভাগে পড়বে অর্থাৎ তারা ব্যাংক/অফিসের হিসাবনিকাশের চাকরি করবে।

আর যাদের একমাত্র আশা ভরসা ও স্বপ্ন ৩৩ নম্বর, তারা মানবিক বিভাগে পড়বে অর্থাৎ সরকারী চাকরি করবে বা স্কুল বা কলেজে মাস্টারি করবে। বলে দেয়ার কেউ ছিল না যে তাদের আসলে কি করা উচিৎ বা কি পড়া উচিৎ।

বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং ধীরে ধীরে টেলিভিসন ও ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে এই ধারণা বদলেছে। এখন মেধাবিরা শুধু ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার নয়, তারা চার্টার্ড অ্যান্ড কষ্ট একাউনট্যাঁনট, এমবিএ, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি পড়ছে। তরুণরা এখন নিজেরাই নানান রকম তথ্য এনালাইসিস করতে পারছে কোথায় তাদের পড়া উচিৎ। তবুও এখনো বাবা-মা রা তাদের সিধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন সন্তানদের উপর যে তারা কি হবে বা কি বিষয়ে পড়বে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে সবাই হুজুগে দৌড়ায়। এক একবার একেকটা জোয়ার আসে তো সবাই সেটাতে গা ভাসিয়ে দেয়। শিক্ষা বাণিজ্যিকরাও সেই সুযোগটা লুফে নেন।

২-৪ টা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বাদ দিলে বাকি ইউনিভার্সিটিগুলুর মান নিয়ে কথা নাই বা বললাম। এত বিবিএ এমবিএ দিয়ে কি হবে? কারা চাকরী দিবে, কোথায় চাকরী পাবে আমাদের তরুণরা?

যে ছেলেটা বা মেয়েটা ক্রিকেট খেলবে, গান করবে, অভিনয় করবে, ফটোগ্রাফার হবে, বড় সেফ হবে, ডিজাইনের কাজ করবে, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করবে, হোটেলে কাজ করবে, আউটসোরসিং এর কাজ করবে, ফাস্ট ফুডের বিজনেস করবে, মেডিক্যাল ল্যাব এর কাজ করবে, মার্চেন্ডাইজিং এর কাজ করবে, আধুনিক কৃষি ভিত্তিক কাজ করবে – সে কেন বিবিএ এমবিএ বা ভূগোল পড়বে! খেলা, গান, ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, মার্চেন্ডাইজিং সহ এই সকল বিষয়ের উপর তারা গ্রাজুয়েসান করবে প্রয়োজনে মাষ্টারস করবে।

দরকার এসএসসির পর থেকেই কারিগরি শিক্ষা। যারা গত ১৫-২০ বছরে শত শত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বানিয়ে এমবিএ ও বিবিএ সার্টিফিকেট বিক্রি করেছেন এবং আমাদের তরুণরা সবাই সেই সনদ দিয়ে কোন চাকরী বা উদ্যোত্তাও হতে পারেনি, তাদের অনুরোধ করবো আপনারা এবার কিছু আধুনিক কারিগরি কলেজ/ইউনিভার্সিটি বানান যাতে আমাদের মেধাবী ও কর্মঠ তরুণরা এসএসসির পর থেকেই হাতে কলমে কাজ শিখতে পারে ও ঐসকল বিষয়ে প্রয়োজনে ডিগ্রি নিতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন ও নতুন নীতিমালা দরকার। যদিও আমাদের দেশে বেশ কিছু পলিটেকনিক ইন্সিটিউট আছে, ঐগুলোর মান এবং সিলেবাস বর্তমান সময়ে একেবারেই অচল।

যদি ঐগুলোকে ব্যাবহার করেও আমাদের লাখ লাখ দেশ প্রেমিক শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো যেত, তবে তারা এখনকার চেয়ে ২-৩ গুন বেশী আয় করতে পারতো। আমাদের তরুণরা বিদেশের হোটেলের রুম সার্ভিসের কাজ না করে ম্যানেজার হতো।

গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেই মাস্টার্স পড়তে যাবেন না। আগে কিছু দিন কাজ করুন তারপর নিজের টাকায় মাস্টার্স করবেন। গ্র্যাজুয়েশান করে তারপর মাস্টার্স শেষ করে তারপর সিভি বানিয়ে চাকরীর জন্য আবেদন করবেন, সেই দিন শেষ ! শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে এখন আর চাকরী বা ব্যবসা হবে না, সাথে লাগবে দক্ষতা।

২-৩ বছর চাকরী বা ব্যবসা করার পর প্রয়োজন হলে মাস্টার্স করবেন নাইট শিফটে।

সার্টিফিকেট বানানোর শিক্ষা নয়, দরকার কাজ শেখার শিক্ষা এবং বিজনেস ও উদ্যোক্তা মনন শিক্ষা।

লেখক: খ্যাতনামা মোটিভেশনাল বক্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •