মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

হজরত কুতুব আওলিয়া ও হজরত আবদুল মালেক আল কুতুবী (রহ:) এর স্মৃতি ধন্য দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। বাতিঘরের জন্য প্রসিদ্ধ। সরকারের উন্নয়নের চাকা সেখানেও ঘুরছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন কেবল বিদ্যুৎ লাইন সংযোগের কাজ চলছে কুতুবদিয়া চ্যানেলে। বাতিঘরের জন্য প্রসিদ্ধ কুতুবদিয়া আলোকিত হবে জাতীয় গ্রীডের ঝলমল আলোতে।

সে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় ২৮ নভেম্বর সফরে গিয়ে রাত কাটিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন। এর আগেও তিনি চকরিয়া ও পোকুয়ায় রাত কাটিয়েছেন রুটিন ভিজিটে গিয়ে। তার এসফর নিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক আইডিতে একটি চমৎকার স্ট্যাটাস দিয়েছেন। স্ট্যাটাসে তিনি কক্সবাজার জোলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পোকুয়াতে অর্থকরী ফসল সুপারী চাষ সম্প্রসারণ করে অর্থনীতিতে বিশাল রাজস্ব যোগান দেওয়ার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন-সুপারীর বাজারমূল্য বেশ ভাল থাকায় এ খাতে শুধু কক্সবাজার থেকেই ৫ শত কোটি টাকা অর্জন সম্ভব। ডিসি কামাল হোসেন তাঁর স্ট্যাটাসে সোনার মূল্যে সুপারী উৎপাদনকারী কৃষক ভাইদের ‘টুপি খোলা স্যালুট’ জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আঞ্চলিক গানের রানী প্রয়াত শেফালী ঘোষের গাওয়া সেই বহুল জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি “যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম, মইশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাওইতাম। একদিন তারে কাছে পাইলে রসের পিরিত শিখাইতাম”-উল্লেখ করতেও ভূলে যাননি। ডিসি মোঃ কামাল হোসেন তাঁর স্ট্যাটাসে বৃটিশ আমল থেকেই জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটেরা যে থানায় রাত্রি যাপন করতেন তাও তুলে ধরছেন অকপটে। কৈয়ারবিলের সৈকত পরিদর্শনের রাত্রিবেলার ক’টি ছবি এবং সুপারীর স্তুপের সুদৃশ্য বেশ ক’টা ছবি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এই পোস্টে। ছবিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহা: শাজাহান আলি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা, কুতুবদিয়ার ইউএনও খন্দকার জহিরুল হায়াতকেও দেখা যাচ্ছে।

২ ডিসেম্বর রাতে পোস্ট করা তথবহুল, প্রেরণাময়ী ও সৃষ্টিশীল এ স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো :

“যথারীতি স্থান একই, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম মধ্য কৈয়ার বিলের সমুদ্র সৈকতের সাথে। দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় অবস্থিত। মূলত গিয়েছিলাম সরকারি সফরে। জেলা প্রশাসকদের প্রতি মাসেই উপজেলা পরিদর্শন করতে হয়, এর সাথে রয়েছে রাত্রি যাপনের বিধানও, সে কারণেই কুতুবদিয়ায় রাতে থাকা। ব্রিটিশ আমল থেকেই চলছে এ প্রথা। তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থার বাস্তবতায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর থানায় রাত্রি যাপন ছিল অতিশয় প্রাসঙ্গিক। বলা হয়ে থাকে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে এ প্রথা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এর আগেও আমি চকরিয়া, পেকুয়াতে রাত্রিযাপন করেছি। জেলা প্রশাসকের উপজেলায় সারাদিন ভিজিট আর রাত্রিযাপন এর প্রথা আমার কাছে কখনই গুরুত্বহীন মনে হয়নি। তিনি থানার সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে পারেন, তাদেরকে জানতে পারেন; যার কিছুটা গতকাল লিখেছিলাম। আজ লিখবো অন্য কথা, লিখবো ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ রশিদের কথা। তিন ছেলে আর এক স্ত্রী নিয়ে তার সংসার কৈয়ারবিলের সমুদ্রতটে। হাতে তার পলিথিনে মোড়ানো লাল রঙের কিছু দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম চাচা কি ওটা? লজ্জাভরে ও কাচুমাচু করে বললেন পান সুপারি। পলিথিনের প্যাকেট খুলে দেখলাম ৪ টি সুপারি আর কিছু পান। চারটি সুপারির দাম নিয়েছে কত জানতে চাইলে যা বললেন তাতে আমি সহ আমার সহকর্মীরা অনেকটা থমকেই গেলাম। ৪ টি সুপারি নাকি ২০ টাকা দাম নিয়েছে! তার মানে ৫ টাকায় মিলেছে ১ টি সুপারি! জিজ্ঞেস করলাম এখানে ডিমের হালি কত? জানতে পারলাম ৩২ টাকা। তার অর্থ দাড়ালো ১ টি ডিম পাওয়া যায় ৮ টাকায়। বুঝতে পারলাম ২ টি সুপারি দিয়ে ১ টি ডিম কিনে আরও দু’টাকা উদ্বৃত্ত থাকে এই কৈয়ার বিলের সমুদ্রতটে। মোহাম্মদ রশিদের কাছে ডিম না হলে মাসের পর মাস চলে যায় কিন্তু সুপারি না হলে নয়। শুধু মোহাম্মদ রশিদই বা কেন, প্রিয় কবি আসাদ চৌধুরীর পানরস মুখের দিকে তাকালেই মনে পড়ে পান-সুপারি তো আমাদের সংস্কৃতির স্বরুপ। দাম শুনে বুঝে গেলাম চাহিদা আর যোগানের বিস্তর ফারাক রয়েছে এখানে। জানতে পারলাম কুতুবদিয়াতে মাত্র ৩ হেক্টর জমিতে গড়পরতা ৯০০০ এর মত গাছ রয়েছে যা জেলার সর্বনিম্ন। মূলতঃ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ গেলে চোখে পড়বে সারি সারি সুপারির বাগান। খোঁজ নিলাম সেখানে দাম অর্ধেক। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে এ মৌসুমে খোলা বাহনে চাষীদের সুপারি কক্সবাজারে নিয়ে আসার মনোরম দৃশ্য দেখলে কিছুটা সময় আপনিও হয়ত ঘোরের মধ্যে থাকবেন। আকারেও এত বড় হয় যেন ক্রিকেট বল, রঙটা সিঁদুর লাল। জেলার প্রায় ৩,১০০ হেক্টর জমিতে এক কোটি বিশ লক্ষ গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ফলন্ত গাছ প্রায় ৬০%। প্রতিটি গাছে গড়পরতা সুপারি হয় ৩০০ টির মত। এ হিসেবে কক্সবাজারে প্রতি বছর সুপারি পাওয়া যায় ১৮৩ কোটি ৬০ লক্ষ। প্রতিটি সুপারির গড় মূল্য ২.৫০ টাকা ধরলে প্রতি বছর ৪৫৯ কোটি টাকার সুপারি হয় এ জেলায়। এর সাথে রয়েছে মহেশখালির পান যা “যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম
যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম, মইশাইল্যা পানের খিলি তারে বানাই খাওইতাম।”- শেফালি ঘোষের সেই জননন্দিত মায়াভরা ভালোবাসার গানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মহেশখালির সে মিষ্টি পানের কথা আর একদিন বলবো। শুরু করেছিলাম বৃদ্ধ মোহাম্মদ রশিদ এর ২০ টাকায় ৪ টি সুপারি কেনা দিয়ে, একটি জেলা সুপারি উৎপাদন করে প্রতি বছর আমাদের অর্থনীতিতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা যোগান দিচ্ছে। টেকনাফ, উখিয়া, রামু আর সদর বাদে অন্য চারটি উপজেলায় এর ফলন প্রসারের সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিভাগের ভাবার সুযোগ রয়েছে/ তাহলে হয়ত কুতুবদিয়ার মোহাম্মদ রশিদদের চারটি সুপারি ২০ টাকায় কিনতে হবে না, আবার ৫০০ কোটির জায়গায় দ্বিগুন হতে পারে এর উৎপাদন আয়। স্যালুট সেসব সোনার মূল্যে সুপারি উৎপাদনকারী কৃষক ভাইদের, পুনশ্চ টুপি খোলা স্যালুট।”

ঝরঝরে বাক্য গঠন ও সুপাঠ্য এ স্ট্যাটাসটি ইতিমধ্যে শেয়ার, লাইক ও কমেন্টে ভরে গেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •