কবির হোসেন

প্রতিবছর শীতকাল এলেই জলাশয়, বিল, হাওড়-বাওড়, পুকুর-নদী, নদীর চর ও সাগর-নদীর মোহনা ভরে যায় নানা রংবেরঙের নাম না জানা পাখিতে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কাছে সেসব পাখির পরিচয় অতিথি পাখি হিসেবে। শীতের হাত থেকে বাঁচতে যেসব পাখি নিজ দেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে, তাদেরকে বলা হয় অতিথি পাখি। পাখির কোন নির্দিষ্ট দেশ বা সীমারেখা নেই। বাস্তুতত্ত্ব অনুযায়ী বেঁচে থাকতে খাবার, প্রজনন এবং পরিবেশের ভারসাম্য অনুযায়ী এদের দেশ-দেশান্তরে ছুটে চলা। তাই অতিথি পাখি বলা হলেও মূলত এরা পরিযায়ী পাখি।

বাংলাদেশে বরফ শুভ্র হিমালয় এবং হিমালয়ের ওপাশ থেকেই বেশির ভাগ অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এসব পাখিরা হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতের লাদাখ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ান ইন্ডিয়ান ফ্লাইওয়ে দিয়ে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য (যেমন সাইবেরিয়া) থেকেও এসব পাখি আসে। এরা কিছু সময় পর আবার ফিরে যায় নিজ দেশে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পাখিদের দুটি শ্রেণি রয়েছে। একটি ‘পরিযায়ী’, অন্যটি ‘আবাসিক’। আমাদের দেশেও একই। আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে আমাদের দেশে পাখির তালিকা প্রায় ৬৫০ প্রজাতি। এর মধ্যে পারিযায়ী প্রজাতি প্রায় ৩০০, আর আবাসিক প্রজাতি প্রায় ৩৫০।

আমাদের দেশে যেসব পাখি দেখা যায় শীতকালে, তাদের মধ্যে ২৫০ প্রজাতির বেশি গ্রীষ্মে আহার, বাসস্থান ও প্রজননের জন্য হিমালয়ের তুষারঢাকা অঞ্চল হয়ে সুদূর সাইবেরিয়া অঞ্চলে চলে যায়। এসব পাখির তিন থেকে ছয় মাস ওই অঞ্চলে থাকে। তারপর আবার প্রত্যাবর্তন করে। একইভাবে কিছু পাখি আছে যারা শীত এলে শীত প্রধান অঞ্চলেই প্রজননের জন্য পাড়ি জমায়। এদের প্রজাতির সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ এর অধিক নয়।

পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে অল্প দূরত্বের পথেও পরিযায়ন দেখা যায়। শীত এলে সাধারণত বেশিরভাগ বিল, হাওড়-বাওড় শুকিয়ে যায়। এসময় জলচর পাখিরা দেশের লোকালয়ের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শীতপ্রধান এলাকাগুলোর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। খাদ্য ও প্রজননের অনুপযোগী হয়ে পড়লে সেসব এলাকা থেকে পাখিরা উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় যায়। শীতে বনভূমি, শষ্যক্ষেত গুলো শষ্য চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ গাছের পাতা ঝড়ে পড়ে ফলে এ দুঃসময়ে পরিযায়ী পাখিরা বেরিয়ে পড়ে উষ্ণ আবহাওয়ার অঞ্চলে।

শীত প্রধান অঞ্চলের বেশিরভাগ পাখিই পরিযায়ী এবং বিশ্বের সিংহভাগ পরিযায়ী পাখির আদি নিবাস শীত প্রধান অঞ্চল। বিশেষ করে রাশিয়া আর কাজাখাস্তানে। এসব অঞ্চলে পাখি অক্টোবর থেকে শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে আশে পাশে যতো গরম দেশ আছে, সবদেশেই ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে তো আসেই, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, আর্মেনিয়া, ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, সিরিয়া, সুদান, তুরস্ক, ইসরায়েল, ওমান, এমনকি পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ায়ও যায়। কিছু পরিযায়ী পাখি আছে যারা দক্ষিণ এশিয়া হয়ে অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশ পর্যন্ত যায়।

শীতের সময় যেসব পরিযায়ী পাখি এদেশে আসে, অধিকাংশ বসবাস করে উপকূলীয় নরম কাদাচর ও সিলেটের হাওরের বিলে। তখন এসব চর ও বিলে পানি অল্প থাকে। অল্প পানিতেই থাকে খাবার। খাওয়া শেষ হলে চর বা বিলের আশপাশের ঘাসের মাঠ, বনভূমি বা বন-বাদাড়ে এসব পাখিরা থাকে, প্রজনন করে। পরিযায়ী পাখির অধিকাংশই ‘জলচর’ বা ‘সৈকত’ পাখি। আমাদের দেশের জলচর পরিযায়ী পাখিদের অধিকাংশ দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে ও মেঘনা নদীসহ বিভিন্ন নদীর মোহনায় জেগেওঠা কাদাচরগুলোতে। শীত মৌসুমে যেসব জলচর পরিযায়ী পাখি দেখা যায় তার মধ্যে আছে-দেশি কানিবক, গো বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি চকাচকি, খয়রা চকাচকি, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, উত্তুরে খুন্ত্মেহাঁস, পাকড়া উল্টোঠুঁটি, ছোট নথজিরিয়া, কালালেজ জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, জুলফি পানচিল, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কাসপিয়ান পানচিল, চামচঠুঁটো বাটান, খুন্তেকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এসব চরের অবস্থান- ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, কক্সবাজারের মহেষখালী ও এর আশপাশের উপকূলে।

মিঠাপানির জলাশয়ে আশ্রয় নেয়া কয়েকটি হাঁস জাতীয় পরিযায়ী পাখির নাম বালি হাঁস, লেঞ্জা হাঁস, পাতারি হাঁস, বৈকাল হাঁস, গিরিয়া হাঁস, ধূসর রাজহাঁস, ভূতি হাঁস, চিতি হাঁস, বারো ভূতি হাঁস, বৌমুনিয়া হাঁস। খুলনা অঞ্চলের বাওড়, সিলেট অঞ্চলের হাওড়-বিল এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম চলনবিলে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, বোটানিক্যাল গার্ডেনের লেকেও কয়েকশত হাঁস জাতীয় পাখির দেখা মেলে শীতকালে। এছাড়া এসব জলাশয় ও বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পরিযায়ী প্রজাদির কবুতরও দেখতে পাওয়া যায়। পরিযায়ী কবুতরের মধ্যে জাল কবুতর, গঙ্গা, পান্তামুখী, লালশির, নীলশির, রাঙ্গামুরি, পাথরঘুরানি বাতান ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, পাতিকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কণ্ঠ বৈচিত্র্যের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রাজহাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙামুড়ি, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি।

শীত মৌসুমে বরিশাল বিভাগের চর বারি, চর বাঙ্গের, কালকিনির চর, চর শাহজালাল, টাগরার চর, ডবা চর, গাগোরিয়া চর, চর গাজীপুর, কালুপুর চর, চর মনপুরা, পাতার চর ও উড়ির চর; চট্টগ্রাম বিভাগের চর বারী, বাটা চর, গাউসিয়ার চর, মৌলভীর চর, মুহুরী ড্যাম, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, পতেঙ্গা সৈকত, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ; সিলেট বিভাগের আইলার বিল, ছাতিধরা বিল, হাইল হাওর বাইক্কা, হাকালুকি হাওর, পানা বিল, রোয়া বিল, শনির বিল ও টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলে কয়েক লক্ষ কানিবক, গো বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কাস্তেচরা, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, পাকড়া উল্টোঠুঁটি, ছোট নথজিরিয়া, কালালেজ জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, জুলফি পানচিল, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কাসপিয়ান পানচিল, চামচঠুঁটো বাটান, খুন্তেক, কালামাথা কাস্তেচরা, ইউরেশীয় চামচঠুঁটি, নদীয়া পানচিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়। এদের মধ্যে মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটান পাখিও কিছু পরিমাণ দেখা যায়।

এই পাখিগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনই সুন্দর এদের গায়ের বাহারি রং। ওদের দেখলেই মন ভরে যায়। পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, আমাদের অনেক উপকারও করে। ফসলে ভাগ বসিয়ে পাখিরা মানুষের যেটুকু ক্ষতি করে, উপকার করে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। পরিযায়ী পাখিদের জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন। এসব পাখি দেশান্তরি হওয়ার আগে প্রচুর পরিমাণে আহার করে শরীরে চর্বি জমায়। কিন্তু এ সঞ্চয় দিয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, পথে বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতি করে খাবার খায়। কিন্তু প্রতিবছরই দেখা যায় আগের বছরের অনেক জায়গা বসবাস বা খাবার সংগ্রহের উপযোগী থাকে না। ইতিমধ্যে একটানা পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে বহু পাখি মারা যায়। মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতার ফলেও এ দেশে পরিযায়ী পাখিরা আজ বিপন্ন। এশিয়ান ফ্লাইওয়ে হয়ে বাংলাদেশে আসার পথে দীর্ঘ যাত্রায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ছোট ছোট বিলে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নেয়। এসময়ের মধ্যেই চোরা শিকারিরা বিপুল পরিমাণে পরিযায়ী পাখি শিকার করে।

বসন্তের সময় মানে মার্চ-এপ্রিলের দিকে শীতপ্রধান অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করে, কিছু কিছু গাছপালা জন্মাতে শুরু করে। ঘুম ভাঙতে শুরু করে পুরো শীতকালে ঘুমিয়ে থাকা অনেক প্রাণীদের। ঠিক এ রকম এক সময়ে অতিথি পাখিরা নিজ বাড়িতে ফিরে যায় দলবলসহ। সঙ্গে থাকে নতুন জন্মানো বাচ্চা। আবার অনেককে হারানোর বেদনা নিয়েও ফিরে যেতে হয় তাদের। ভ্রমণ প্রিপাসু জনসাধারণ শীতকালে এসব পরিযায়ী পাখি দেখার জন্য দেশের নানা প্রান্তে ছুটে যায়। কিন্তু তাদের অসাবধানতায় প্রকৃতিকে সৌন্দর্য বর্ধনকারী এসব পাখির জীবন হয়ে পড়ে মহাবিপন্ন। দূর পথ পাড়ি দেওয়া পাখিদের আশার আলো দেখা স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়।

অতিথি পাখি নিধন বন্ধে আইন থাকলেও কেউ তা মানছেন না এবং প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে চলে মানুষের ধ্বংসলীলা। অতিথি পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁক গলিয়ে একশ্রেণির পেশাদার এবং শৌখিন শিকারি কাজগুলো করে চলেছে। বাসস্থান সংকট, বিষটোপ ব্যবহার করে খাদ্যসংকট ও জীবন বিপন্ন করা, শিকার, পাচার ইত্যাদি কারণে আশঙ্কাজনকহারে আমাদের দেশে শীতে পরিযায়ী পাখি আসার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা বলা চলে নিরব। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক লাখ টাকা জরিমানা, এক বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড। একই অপরাধ আবার করলে শাস্তি ও জরিমানা দ্বিগুণ। উদাসীন বন বিভাগের নজরে আসেনা পাখি নিধনের কোনও ঘটনা। হাতেনাতে ধরা না পড়লে পুলিশও এর দায় নেয় না। এমনকি পাখি নিধনের প্রতিবাদ করলে তাকেও হেও করা হয় এই সমাজে।

অতিথির আগমনে আমরা আনন্দিত হই। কিন্তু সম্মানের সাথে তাদেরকে বিদায় জানাতে শিখিনি। পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলকে নিরাপদ রাখা ও পাখিদের বিচরণস্থল সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি বাংলাদেশ সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। পাশাপাশি আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। এতে শুধু বিপন্ন পরিযায়ী পাখিদের জীবনই রক্ষা পাবেনা, একই সঙ্গে প্রকৃতির ইকো সিস্টেমের ভারসাম্য বজায় থাকবে। প্রকৃতি বাঁচলে, বাঁচবে মানুষ। তাই পাখি হত্যা বা নিধন বন্ধ করায় বন বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রশাসন অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিযায়ী পাখিসহ দেশীয় পাখি রক্ষার্থে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

কবির হোসেন

কবি ও গল্পকার

kabirhossain02021998@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •