সিবিএন ডেস্ক:

ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে ইনবক্স বা কমেন্টে হয়রানিমূলক বার্তা পাঠিয়ে যদি কেউ ভাবে তাকে কেউ চিনতে পারবে না, তবে ভুল করবে। সাইবার অপরাধীরা নিজেকে যতই লুকানোর চেষ্টা করুক না কেন, পরিচয় ঠিকই বের হয়ে যাচ্ছে। সাইবার জগৎ সংশ্লিষ্ট সংগঠন, বিশ্লেষক এবং এসব অপরাধের অভিযোগকারীদের সঙ্গে কাজ করা আইনজীবীরা বলছেন, যারা এ ধরনের অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়ছে তারা অনেকেই এ অপরাধ সংশ্লিষ্ট আইন, নজরদারির কৌশল ও শাস্তি সম্পর্কে জানেন না। অপরাধ যেখানে বসেই করুক না কেন পুলিশের বিশেষ বাহিনী তার অবস্থান যে জানতে পারবে সে বিষয়েও অজ্ঞ অনেক অপরাধী। এ কারণে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইন ও শাস্তির প্রচার বাড়ালে এ ধরনের ঘটনা অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ৩ জুলাই ফেসবুকে গ্রুপ খুলে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুক্তাদিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই তরুণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাওয়া স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল, মার্কেট-শপিংমলের সামনে নারীদের টার্গেট করে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও ধারণ করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিতেন। ভুক্তভোগী কয়েকজনের অভিযোগের পর অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় এখন কারাগারে মুক্তাদির।

বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস (সিসিএ) ফাউন্ডেশনের গবেষণা বলছে, বর্তমানে দেশে যত সাইবার অপরাধ হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশের শিকার কিশোরীরা। প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা ১১ ধাপে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিই নতুন। নারী ভুক্তভোগীদের হার বেড়েছে ১৬.৭৭ শতাংশ। তবে ভুক্তভোগীদের ৮০.৬ শতাংশই পুলিশের কাছে অভিযোগ করে না।

অপরাধের ধরন
সহিংসতা, উগ্রবাদ, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ, গ্যাং কালচার, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, চাঁদাবাজি, পাইরেসি, আসক্তি—সবই এখন অনলাইনে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে জেঁকে বসেছে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার ঘটনা। বাড়ছে কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনাও।

আইন অনুযায়ী, ফেসবুকে বা কোনও গণমাধ্যমে কাউকে নিয়ে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করলে, কারও নামে অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট দিলে, কিংবা শেয়ার বা লাইক দিলেও সাইবার অপরাধ হতে পারে। কাউকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে হুমকি, অশালীন কিছু পাঠানো কিংবা দেশবিরোধী কিছু করলে তা সাইবার অপরাধ হবে। আবার ইলেকট্রনিক মাধ্যমে হ্যাক করা, ভাইরাস ছড়ানো কিংবা কোনও সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করলেও তা সাইবার অপরাধ হতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি মনে করেন অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে অপরাধ কমবে না। তিনি বলেন, সাধারণত কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে এবং অভিযোগ পেলে আমাদের এখানে স্যোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তার অবস্থান জানার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ সম্ভব হয় না। এই অপরাধীরা পরে আরও বড় সাইবার অপরাধী হওয়ার চেষ্টা চালায়।

ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমার পরিচিত একজনের বেঙ্গালুরু থেকে একটি ল্যাপটপ হারিয়ে গিয়েছিল। এক বছর পর দেশটির পুলিশ সেটা উদ্ধার করে। এর জন্য আমার বন্ধুটিকে কোনও তদ্বিরও করতে হয়নি। এখানে সাধারণের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে আসতে হবে। তবেই অপরাধীরা সাইবার অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।

সিসিএ ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, অনলাইনে যারা অপরাধ করছেন তাদের অনেকের সাইবার আইন বিষয়ে জানাশোনা কম। তাই তারা মনে করেন অপরাধ করে পার পেয়ে যাবেন। যদি আইন এবং এর বাস্তবায়নের বিষয়ে তাদের জানা থাকে তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই অপরাধ করার সাহস পাবে না।

অনলাইন ব্যবহারকারীদের অনেকেই এ সংক্রান্ত আইন জানে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো, মানুষ আইন জানবে এবং কী শাস্তি হতে পারে তা জেনে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি, জরুরি সব আইন হয়। কিন্তু সেসব নিয়ে কোনও সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকে না।

প্রচার নিয়ে কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন কিনা প্রশ্নে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা তরুণ সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছি। কিন্তু মূল কাজটি সরকারের জায়গা থেকে হতে হবে।’

অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতের বিষয়ে ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, অনেক অভিযোগের ক্ষেত্রে আপস করতে হয়। কারণ ভিকটিম চায় না বিষয়গুলো প্রকাশ হোক। কারও সঙ্গে অনলাইনে পরিচয়ের পর ছবি বিনিময়ের পর যখন ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছে তখন সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভেবে অফিসিয়াল অভিযোগ না করে মীমাংসাই বেছে নিতে চায় তারা।

তিনি বলেন, অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ আইন বিষয়ে বেশিরভাগেরই স্বচ্ছ ধারণা না থাকা। অনেক অপরাধী ফেক আইডি ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি করে আর ভাবে তাকে কেউ চিনবে না। যারা এসব করছে তারা সাইবার জগত জানে, পর্নোগ্রাফির ব্যবহার জানে, কীভাবে একজনের জীবন দুর্বিষহ করে দিতে হবে সেটাও জানে। কিন্তু আইনে কী আছে তা জানে না। ফলে এই জানানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করা জরুরি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •