সিবিএন ডেস্ক:
চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করা সরকারি বাহিনীর মধ্যে আক্রান্ত বেশি হয়েছিল সিএমপির সদস্যরা। গত ১২ এপ্রিল কনস্টেবল সাদেক মিয়ার আক্রান্তের মধ্য দিয়ে করোনার সাথে ভেতরে-বাইরের যে যুদ্ধ সিএমপি শুরু করেছিল তা মাঝে ৮ দিনের জন্য থেমেছিল। তবে গত ৮ অক্টোবর থেকে করোনার থাবা শুরু হয়েছে আবার সিএমপিতে। যাকে কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার সেকেন্ড ঢেউ শুরুর কথা।

এছাড়া সরকারিভাবেও করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। শনিবার (২৮ নভেম্বর) আগের নির্দেশনার সাথে ‍যুক্ত করে নতুন করে ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সিএমপি সদর দপ্তর। যা সিএমপির প্রত্যেক সদস্যকে প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সিভয়েসকে বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি ছিল। দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তাই সিএমপির প্রত্যেক সদস্যদের জন্য আগের নির্দেশনার সাথে নতুন করে ২৬ দফা নির্দেশনা ও তা পালনে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সকল পুলিশ সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আট দিনের মাথায় এ বছরের ১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগর পুলিশের প্রথম সদস্যের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকে থাকা ওই সদস্য আক্রান্তের পর লকডাউন করে দেয়া হয় ব্যারাকটি। এরপর থেকে পুলিশ সদস্যদের সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যারাক থেকে সরিয়ে পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার ও কনভেনশন সেন্টারে নেয়া হয়। তবুও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এই সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি ওই সময়ে। শত শত সদস্য আক্রান্তের পাশাপাশি প্রথম দফার সংক্রমণে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের ডিসি মিজানুর রহমানসহ ৫ সদস্য করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

তবে দ্বিতীয় ঢেউ থেকে বাঁচতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সদর) মঈনুল ইসলাম। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘করোনাকালে ফ্রন্টলাইনে অন্যদের চেয়ে সিএমপির সদস্যরাই মাঠে বেশি ছিল। ফলে তুলনামূলক বেশি করোনাভাইরাস শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে সিএমপির সদস্যদের। সেকারণে দ্বিতীয় ঢেউ প্রবলভাবে শুরুর আগেই আমরা আগের চেয়ে বেশি করে থানায় ও ব্যারাকে স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করছি। হাত ধোয়া কর্মসূচিকে জোরদার করছি। সকলকে পর্যাপ্ত স্যানিটাইজার, মাস্ক দেওয়া যাচ্ছে। কর্মস্থলে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এডিসি মইনুল আরও বলেন, ‘এছাড়া বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালের ১০০ শয্যার মধ্যে ৫০ শয্যাকে ডেডিকেটেড কভিডের জন্য রাখা হয়েছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও সিএমপির উদ্যোগে পতেঙ্গায় গড়ে তোলা ফিল্ড হাসপাতাল চালু রয়েছে এখনো। সাগরিকায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাসকে ৫০ শয্যার কোয়ারান্টাইন সেন্টার হিসেব রাখা হয়েছে।’

করোনা প্রতিরোধে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) প্রতিটি থানা ও ফাঁড়িতে ২৬টি নিদের্শনা প্রদান করা হয়। করণীয় ২৬টি নির্দেশনা হলো-
১. প্রত্যেক ফোর্সকে করোনা বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
২. মাস্ক ব্যতীত কেউ ডিউটি করবে না। ফোর্সের মাস্ক না থাকলে মাস্ক সরবরাহ করতে হবে।
৩. প্রত্যেক গাড়িতে স্যানিটাইজার থাকবে।
৪. থানার সামনে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফোর্স ডিউটি থেকে এসে হাত ধুয়ে তারপর থানায় প্রবেশ করবে। পোশাক সম্ভব হলে ধুয়ে ফেলবে নতুবা রোদে শুকাতে দেবে। একই পোশাক পরপর দুইদিন পরবে না।
৫. প্রত্যেক থানায় খাওয়ার জন্য গরম পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. থানার মেসে প্রতি বেলায় লেবু প্রদান করতে হবে। খাওয়া শেষে এক গ্লাস গরম পানি পান করবে।
৭. প্রতিদিন ফোর্সের তাপমাত্রা মাপতে হবে এবং একটি চার্ট তৈরি করতে হবে।
৮. করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এরূপ কাউকে সন্দেহ হলে সাথে সাথে টেস্ট পরবর্তী আইসোলেশনে রাখতে হবে।
৯. কেউ করোনা আক্রান্ত হলে নিয়মিত তার খোঁজ খবর নিতে হবে। কেন অক্রান্ত হলো তা বের করে পরবর্তীতে যেন সবাই সতর্ক থাকে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং করতে হবে।
১০. থানায় ফোর্সের ঘনত্ব হালকা করার জন্য বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই কমিশনার মহোদয়ের অনুমতি নিতে হবে।
১১. ডিউটি শেষে অপ্রয়োজনে বাইরে যাবে না। বাইরে যেতে হলে থানার অফিসার ইনচার্জের অনুমতি গ্রহণ করবে এবং রেজিস্টারে স্বাক্ষর করবে।
১২. থানার ডিসইনফেকশন গেটকে সচল করতে হবে। থানার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক শনিবার ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
১৩. যে সকল ফোর্স বাসায় বসবাস করছে তাদেরকে ব্রিফিং করতে হবে এবং সতর্ক থাকার জন্য পরামর্শ প্রদান করতে হবে।
১৪. ‘মাস্ক নাই, সার্ভিস নাই’ স্লোগানে সকলকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। থানায় আগত দর্শনার্থীদের হাত ধুয়ে থানায় প্রবেশ করতে হবে। দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ সার্ভিস ডেলিভেরি কক্ষ পর্যন্ত বসানো যাবে। ভিতরে নেয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে।
১৫. ছুটি থেকে আসার পর পুলিশ সদস্যদের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মোতাবেক কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত করতে হবে।
১৬. সকল ফোর্স ভীড় এড়িয়ে চলবে এবং উিউটির সময় সদা সতর্ক থাকবে।
১৭. বাইরের হোটেল/ দোকানে খাওয়া দাওয়া করা, সামাজিক অনুষ্ঠানে গমন, গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকলকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
১৮. থানায় বা কোথাও বসার ক্ষেত্রে, অভ্যন্তরীন সভার ক্ষেত্রে সব জায়গায় সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
১৯. ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণের জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
২০. প্রতিদিন ফোর্স সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে বিশ মিনিট রোদে থেকে এ বিষয়ে সকলকে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং প্রদান করতে হবে।
২১. যাদের ডায়েবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাদের বিষয়ে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
২২. পঞ্চাশ বছরের ওপরে যে সকল ফোর্সের বয়স তাদেরকে ডিউটি প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
২৩. এককভাবে নিয়মিত ৩০ মিনিট ব্যায়ম করার ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিতে হবে।
২৪. করোনা বিষয়ে যে পুলিশের পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে সেই বিষয়ে সকলকে আশ্বস্ত করতে হবে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে।
২৫. সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার, এডিসি, এসি ও ওসি করোনা প্রতিরোধে নিজের থানা, ফাঁড়ির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
২৬. থানার প্রবেশমুখে জীবানুনাশক ফ্লোর ম্যাট থাকবে হবে। –সিভয়েস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •