জে. জাহেদ , চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :

সন্তানের দ্বারা বৃদ্ধ বাবা-মা নানাভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। মূল্যবোধহীন শিক্ষা শিক্ষিতদের নৈতিকতাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। সন্তানের এমন চরম অবহেলা যার নিত্যসঙ্গী এমনই এক বৃদ্ধা মায়ের খবর পাওয়া গেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে, চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর গ্রামে। জানা যায়, মৃত ফজল আহম্মদের ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তার তিন ছেলে এক মেয়ে। তিন সন্তানই মোটামুটি স্বাবলম্বী বলা যায়।

কিন্তু এ বয়সে মরিয়ম বেগমের আরাম-আয়েশে দিন কাটানোর কথা। সেখানে দু’বেলা খাবার জোটাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতে হয় তাকে। মাঝেমধ্যে বের না হলে খাবার জোটে না তার ভাগ্যে। রোজা রেখে কাটাতে হয়।

চার সন্তানের জননী মরিয়ম বেগম। বড় ছেলে কোরআনে হাফেজ মসজিদে চাকরি করেন। মেঝো ছেলে ফার্ণিচার মিস্ত্রি ও ছোট ছেলে ট্রাক সমিতির ম্যানেজার। ৪র্থ মেয়ে বিবাহিত শ্বশুরবাড়িতে রয়েছেন।

বড়উঠান ইউনিয়নের মিস্ত্রিজান বাপের বাড়ির একাধিক এলাকাবাসী জানান, ১৯৯১ সাল। ২৯ বছর আগে স্বামী হারা বিধবা মরিয়ম বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলো চার সন্তানের মুখের দিকে থাকিয়ে। হঠাৎ স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারে টানাটানি থাকলেও চার সন্তানকে কমবেশি শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। তিন ছেলে মোটামুটি আজ বিয়েশাদি করে নিজেদের সংসার চালাচ্ছেন। থাকছেন আলাদা ভবনে। কিন্তু গর্ভধারিণী মাকে আজ দু’বেলা খাবারের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে করতে হচ্ছে। বয়সের ভার আর অসুস্থতার কারণে বাড়ি বাড়ি যাওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে মরিয়ম বেগমের।

গত ২১ নভেম্বর উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছে ছেলেদের বিরুদ্ধে নালিশ দিতে এসেছেন। শোনালেন কষ্টের কথা। কোন ছেলেই তাকে ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। যে যার মতো নিজেদের সংসারে ব্যস্ত।ঝুপড়ি ঘরে বিনা চিকিৎসায় অর্ধাহারে বেঁচে আছেন তিনি।

বিষয়টি জানতে পেরে বৃদ্ধা মরিয়ম বেগমের চিকিৎসা ও খাবার দাবারের উদ্যোগ নিলেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. দিদারুল আলম। বৃদ্ধার ছেলেদের পরিষদে ডাকার ব্যবস্থা করলেন।

স্থানীয় সংবাদকর্মী মহিউদ্দিন জানান, সন্তানরা এত খারাপ কীভাবে হতে পারে তা জানা ছিল না। বিষয়টি দেখে মনেহচ্ছে জীবনের পড়ন্তবেলায় আপন সন্তানদের চরম অবহেলা অনাদরে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার অপেক্ষায় রয়েছেন মরিয়ম বেগম। এমন হতভাগ্য মা-বাবার সংখ্যা এ দেশে নেহাৎ কম নয়। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সন্তানের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।’

ভূক্তভোগি মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জসিম ও ছোট ছেলে হালিম খুব বেশি কষ্ট দিচ্ছে আমায়। বহু কষ্টে ছোট ছেলেকে বিয়ে করাইছিলাম। দুমাস পরে দেখি ছেলের বউসহ আমাকে নির্যাতন করে। এমনি আমার স্বর্ণ ও গরু বিক্রি করে আলাদা বাসায় চলে যায়। বাড়ির বিদ্যুৎ বিলও দিচ্ছে না। শাড়ি ও আলনা নিয়ে যাবার পাশাপাশি আমার নামাজ পড়ার চেয়ারটুকুও নিয়ে গেছে। গত ৩/৪ মাস আমি নাজিম মেম্বারের কাছে বিচার চাইলাম। উল্টো মেম্বার আমাকে বকাঝকা করল। আমি চেয়ারম্যানের কাছে এর সুবিচার চাই।’

এদিকে, মরিয়ম বেগমের ছোটছেলে মো. হালিম বলেন, ‘আজ সকালে এলাকার মেম্বারসহ আমরা দুভাই মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। মা বলল, এলাকার চেয়ারম্যান যেভাবে সমাধা দেবেন তিনি তা মানবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি চেয়ারম্যানের কাছে যাব।’

চট্টগ্রাম জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন বলেন,
সরকারি বিধিমালা হয়েছে, পিতা-মাতাকে সন্তানের সঙ্গে রাখতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে পিতা-মাতা যার সঙ্গে বসবাস করতে চান, তাকে প্রাধান্য দিতে হবে। অন্য সন্তানরা সমভাবে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের ব্যয় বহন করবেন। কোনো কারণে সন্তানরা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সঙ্গে রাখতে না পারলে তাদের ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে সন্তানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও থাকছে। আইনে এই অপরাধে ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাস জেলের বিধান রয়েছে।’

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিনা সুলতানা জানান, বিষয়টি খুবই কষ্টদায়ক। খোঁজ নিয়ে বৃদ্ধা মায়ের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করব।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •