আবদুর রহমান খান


করোনার মরণ আতংকে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। আর এমন দু:সময়ে শরীর ও মন চাংগা করার টনিক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে দক্ষিন আফ্রিকার জুলুদের পায়ের তালে ছন্দবদ্ধ একটি নৃত্য সঙ্গীত ‘জেরুজালেমা’। মাত্র পাঁচটি লাইনে খুবই সাধারন একটি সুরে পায়ের তালে শরীর দোলানোর ছন্দ যে কতটা আকর্ষনীয় হতে পারে তার প্রমান এ নৃত্য-গীতটি।

ইতোমধ্যেই বিশ্বের দেশে দেশে এটি ভাইরাল হয়ে পড়েছে। ইংরেজী, ফরাসী, স্প্যানিস , জার্মান, ইটালিয়ান ও আরো নানা ভাষায় গানটি রূপ নিয়েছে একই ছন্দ ও তালে। ‘জেরুজালেমা’ সংগীতের তালে দলবদ্ধ হয়ে নাচছে আফ্রিকার অনাহারী অর্ধ-উলংগ নগ্নপদ শিশুরা, দরিদ্র বা স্বচ্ছল, কালো এবং সাদা, নারী এবং পুরুষ সবাই । আফ্রিকার বাইরেও ইউরোপ, দক্ষিন আমেরিকা আর উত্তর আমেরিকাতেও নাচছে নানা পেশা আর বয়সের মানুষ। হসপাতালে নাচছে ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মিরা, গীর্যার চত্তরে পাদ্রী আর নান; সমূদ্র সৈকতে সূর্যসেবী নারী-পুরুষ, ফসলের ক্ষেতে কৃষক, খেলার মাঠে খেলোয়ার, শ্রেনীকক্ষে শিক্ষার্থী, বিমানবন্দরে বিমানবালা আর ক্রুগন, রাস্তায় পুলিশের দল, ফায়ার ব্রিগেডের সদস্য, কারারক্ষীগন, নির্মান শ্রমিক, হোটেল কর্মী, রেস্তোরার ওয়েটার, সুপারমার্কেটের বিক্রয়কর্মীর দল – কেউ বাদ নেই। জনসমাবেশপূর্ন স্থান, পার্ক, ছাদের ওপর বা ঘরের মধ্যে সর্বত্রই নাচছে মানুষ এ গানের ছন্দে। করোনার মাঝে মন্দার বাজারে হোটেল রেস্তোরায় ক্রেতা আকৃষ্ট করতে বা বাজারে নতুন পন্যের প্রচার বাড়াতেও এ নৃত্যগীতিটি ব্যবহৃত হচ্ছে দারুন নৈপুন্যের সাথে। ইতোমধ্যে দেশে দেশে নাচের স্কুলগুলোতে তালিম নিচ্ছে শিশু, কিশোর-কিশোরী আর যুবক-যুবতীর দল। চলছে প্রতিযোগিতা আর চ্যালেঞ্জ। ‘জেরুজালেমা’ নাচের তালে কার দল কত চমৎকার করে নাচতে পারে।

ইহুদি-খ্রিস্টানদের গসপেল থেকে নেয়া ধর্মীয় অনুভূতির প্রক্ষাপটে রচিত জেরুজালেমা সংগীতটি। এটা ঈশ্বরের কাছে গায়কের প্রার্থনা যেন তাকে পবিত্র জেরুজালেম নগরীতে নিয়ে যাওয়া হয় । এ নৃত্য-গীতটিতে ছোট ছোট কয়েকটি বাক্যে বলা হয়েছে “জেরুজালেম আমার বাড়ী; (ঈশ্বর) আমাকে সুরক্ষা দাও ; এখান আমাকে ফেলে রেখে যেওনা ; আমাকে সাথে নিয়ে চলো; আমার স্থান এখানে নয়; এ রাজ্য আমার নয় ; আমার বাড়ী জেরুজালেম। “

এ সংগীতটির অনুভূতির কেন্দ্রে রয়েছে যে জেরুজালেমের নাম সেটি হচ্ছে আব্রাহামিয়, জুডিয়, খৃষ্টান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন পবিত্র শহর। এ শহরকে বলা হয় বিশ্বের কেন্দ্রস্থল। এখানেই অবস্থিত পবিত্র আল-আসকা মসজিদ যা ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। এ মসজিদ থেকেই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (স: ) মে’রাজে গমন করেছিলেন। জেরুজালেম তাই সকল কিতাবী ধর্ম ( আহলে কিতাব) অনুসারীদের জন্য পবিত্র তীর্থ স্থান।

এরকম একটি ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত সংগীত ‘জেরুজালেমা’ তাই ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছে বিশ্বব্যাপী।

ছন্দ-তালের জগতে গসপেল হাউস মিউজিক হিসেবে সংগীতটি রেকর্ড করা হয় একবছর আগে -২০১৯ সালের ১১ আগষ্ট। এটি সামাজিক মাধ্যমে পোষ্ট করার পর সংগীতপ্রিয়দের কাছ থেকে দারুন উৎসাহ পেয়ে নভেম্বর নাগাদ এটিকে ইউটিউবে ছেড়ে দেয়া হয়। তাৎক্ষনিক জনপ্রিয়তায় চমকিত হয়ে এক মাসের মধ্যেই গানের ভিডিওটি রিলিজ করা হয়। আর ২০২০ সালের জানুয়ারীতে গানটির স্রষ্টা মাষ্টার কেজি তার দ্বিতীয় এলবামে অন্তর্ভূক্ত করে এটি বাজারে ছাড়ে। গানটি ইতোমধ্যে নানাভাবে রিমিক্স হয়েছে নানা বাদ্য যন্ত্রর সংযোজনের দ্বারা। কোভিড ১৯ সংক্রমনের আগেই আফ্রিকার ক্লাবগুলিতে এটি দারুনভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এ যাবৎ আফ্রিকার কোন সংগীত বিশ্বব্যাপী এতটা জনপ্রিয়তা পায় নি। এ বছর নভেম্বর পর্যন্ত গানটি ইউটিউব থেকে নামিয়ে শোনা হয়েছে বিশ কোটি বারের অধিক। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গিয়ে বেলজিয়ামের শীর্ষ ৫০টি আলট্রা টপ সংগীতের তালিকায় এ গানটি উঠে যায় এক নম্বরে। অনুরূপ ভাবে ইউরো ডিজিটাল ছংস এর তালিকায় এক নম্বর, ফরাসী ডিজিটাল ছংস-এর তালিকায় এক নম্বর, নেদারল্যান্ডসের টপ ৪০ তালিকায় এক নম্বর, হাঙ্গেরীর সিঙ্গেল টপ ৪০ তলিকায় এক নম্বর; সুইজারল্যান্ডের এক নম্বর; রোমানিয়ার একশ জনপ্রিয় সংগীতের তালিকায় এক নম্বর, আর আমেরিকার ডিজিটাল সংগীতের বিক্রয় তালিকায় এক নম্বর স্থান দখল করে নেয় ‘জেরুজালেমা’ নৃত্যগীতটি। ফেসবুক, টুইটার, টিকটক এর মাধ্যমে হাজারো সংগীতানুরাগী প্রতিদিন ‘জেরুজালেমা ‘ ভিডিও মিউজিকটি শেয়ার করছেন বন্ধু বা অনুসারীদের সাথে।

গত অক্টোবরে (২০২০) আফ্রিকান ঐতিহ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে দক্ষিন আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তার দেশবাশীকে আহবান করেছেন উৎসবে এ নাচটি নাচতে। এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এ নৃত্যগীতের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্য মন্ডিত সংগীত, নৃত্য ও বাজনার ছন্দ ও তাল বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা একসাথে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা ও বিশ্বমহামরী করোনা সংক্রমনে মৃতদেরও স্মরন করতে পারি।

গানটির স্রষ্টা মাষ্টার কেজি নামে পরিচিত কিগাওগেলো মোয়াগা সম্প্রতি এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, তার গানটি জনপ্রিতার এতটা তুঙ্গে উঠবে সেটা তার কাছে অকল্পনীয়। বিশ্ব এখন নাচছে। গড ইজ এমেজিং- ঈশ্বর দারুন এবং বিস্ময়কর।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •