কোহিনুর

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৯:১৩

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন:
কোহিনুর হিরা সম্পর্কে সবাই জানে ।কিন্তু বর্তমানে এটি ইংল্যান্ডের মহারানীর নিকট রয়েছে।আপনি কি এটা জানেন , কোহিনুরকে একটা অভিশপ্ত হিরে মানা হয়! কারন এটা যখনই যার কাছে গিয়েছে তাকে বরবাদ করে দিয়েছে।কোহিনুর হিরেকে পাওয়া গিয়েছিল ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের গোলকুন্ডায়।কোহিনুরের অর্থ হলো “আলোর পাহাড়”।কোহিনুর পাথরের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরানো। এই ব্যাপারে প্রথম তত্ত¡ পাওয়া গিয়েছিল ১৩০৪ খ্রী:।সেই সময় এই হিরাটি ছিল মালবারের রাজা মেহেল্লাজ দেবীর কাছে।বাবরনামায় দেখা যায় গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতসিং পানিপথের যুদ্ধের সময় তাঁর সমস্থ সম্পত্তি আগ্রার কেল্লায় রেখে গিয়েছিল।যার মধ্যে কোহিনুরও ছিল, যোদ্ধে জেতার পর বাবর আগ্রার কেল্লা নিজের কব্জায় করে নেয় ।সাথে সাথে কোহিনুরও পেয়ে যান। এই ১৮৬ কেরেট্রে হিরার নাম তখন তিনি দেন বাবর হিরা । তাঁর পর কোহিনুর হিরা মোগল সাম্রাজ্যেই ছিল।কিন্তু ১৭৩৮ খ্রি : ইরানের সম্রাট নাদির শাহ্ মোগল সাম্রাজ্য আক্রমন করে।১৭৩৯ ভ্রি:নাদীর শাহ কোহিনুর হিরা লুন্ঠন করে।বলা হয় এই নাদীর শাহ বহুমুল্য হিরার নাম কোহিনুর রেখেছিলেন।১৮১৩খ্রি: পাঞ্জাবের শিখ রাজা রনজিত শিং এর কাছে আবার কোহিনুর হিরা ফিরে আসে।রনজিত সিং এটিকে তাঁর মুকুটে ধারন করেন।রনজিত সিং এর মৃত্যুর পর কোহিনুর হিরা তাঁর ছেলে দিলীপ কুমারের কাছে চলে আসে।বলা হয় ১৮৪৯ খি:ব্রিটেন যুদ্ধে এই মহারাজাকে হারিয়েছিল।সেই সময় দিলীপ সিং লাহোরে চুক্তিতে সাক্ষর করে।যার শর্ত অনুযায়ী কোহিনুর হিরেকে ইংল্যান্ডের মহারানীর কাছে সপে দিতে হয়েছিল।এর পরে লর্ড ডালহৌসী ১৮৫০ খ্রি: লাহোর থেকে কোহিনুর হিরাকে মুম্বাই নিয়ে আসে এবং সেখান থেকে পাঠিয়ে দেয় লন্ডনে।সময় সময় মাঝে মাঝে এখনো কোহিনুর হিরাকে ফেরত পাওয়ার আর্জি জানানো হয়।কিন্তু ব্রিটেন একটি কথাতেই এই সমস্থ দাবীকে খারীজ করে দেয়।তাদের দাবী আইনত ভাবেই এই হীরা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র ভারত নয়, পাকিস্থান, বাংলাদেশ,দক্ষিন আফ্রিকা কোহিনুরকে নিয়ে দাবী জানায়।কোহিনুর হীরাকে যখন খনি থেকে বের করা হয়েছিল তখন এটা এতটা প্রসিদ্ধ ছিলনা।কিন্তু ১৩০৬ খ্রি:এটা চর্চায় আসে।যখন এটা বলা হয়েছিল এই হিরে যার কাছে থাকবে,সে পুরো পৃথিবীর রাজা হবে।সাথে সাথে এটাও বলা হয়েছিল এর সাথে সাথে তার বরবাদিও শুরু হবে।কিন্তু কেউ এই কথাটার উপরে বিশ্বাস করেনি।যখন এই হিরে কাস্পিয় বংশের কাছে ছিল তখন তাদের অস্থিত্ব ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।তার পর থেকে বিভিন্ন রাজার কাছে এই কোহিনুর হিরা গেছে এবং সেই সমস্থ রাজা এবং সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে।তাই প্রতিটি পুরুষের জন্য কোহিনুর হিরাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছিল।যখন এই অভিশাপ থেকে বাচার চেস্টা করা হচ্ছিল,তখন জানা যায় যদি কোন ইশ্বরের দুত অথবা কোন মহিলা যদি এই কোহিনুরকে ধারন করে তাহলে এই অভিশাপ শেষ হয়ে যা্েব।এই ভাবেই ব্রিটিশ শাসকেরা ঠিক করে এটি কোন পুরুষ নয় মহিলাই ধারন করবে।শেষে কিং জর্জ এর স্ত্রী কুইন এলিজাবেথের মুকুটে এটি জোড়া হয়।

বাল্যকালে একটি পাঠ্য বইয়ে পড়েছিলাম, ঢাকার সোনার গাঁয়ের তৈরি মসলিন কাপড় এত বেশি মিহি হত যে সত্তর হাত লম্বা একটি মসলিন শাড়ি নাকি কয়েক ভাজ করে একটি আংটির ভিতর দিয়ে বের করা যেত তবে মসলিন সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন ঐ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।

বাঙালিরা তাদের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের যে সামান্য কিছু বিষয় বা বস্তু নিয়ে গর্ববোধ করত এবং এখনও করে তাদের মধ্যে প্রধানতম হল মসলিন কাপড়। ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এ কাপড় তার সূক্ষ্ণতার জন্যই সারা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল। ভারতের মুঘল রাজপরিবার তো বটেই এমনকি ব্রিটিশ রাজরানীদেরও নাকি প্রথম পছন্দের কাপড় ছিল ঢাকাই মসলিন।

‘মসলিন’ শব্দটি খাঁটি বাংলা নয়। কিন্তু এটি কোন ভাষা থেকে কিভাবে এসেছে তা নির্ণয় করাও কঠিন। তবে দুজন ইংরেজ ভাষাবিদের দাবি অনুসারে ‘মসলিন’ শব্দটি এসেছে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় ব্যবসাকেন্দ্র মসুলের নাম থেকে। মুসলমান শাসন আমলে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে ভারতের যোগাযোগ ছিল অত্যান্ত নিবিড়। ভারতের স্থাপত্যকলার অধিকাংশ শিল্পীই এসেছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইরান বা ইরাক থেকে। ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে তখনও মসুলের বেশ সুনাম ছিল। আর তখন মসুলেও সূক্ষ্ণ কাপড় তৈরি হত। তাই মসুল থেকে ঢাকায় কাপড়ের কারিগরগণের আসা কিংবা ঢাকা থেকে মসুলে যাওয়া অসম্ভব ছিল না। মসলিন বলতে বাঙালিরা বোঝাত ঢাকার আশেপাশে তৈরি হওয়া সকল প্রকার সূক্ষ্ণ শ্রেণির কাপড় বা শাড়িকে। তাই মসুল আর সূক্ষ কাপড় এ দুইয়ের যোগসূত্র দিয়ে মসলিন শব্দটি চালু হয়েছে। তবে নামে যাই হোক মানে এ কামে যে এ কাপড় অতি উচ্চমানের ও পৃথিবীতে আবিষ্কৃত বা তৈরিকৃত মিহিতম কাপড়গুলোর অন্যতম ছিল তার সাক্ষ্য ইতিহাসই দেয়; বাঙালিদের আলাদা ভাবে দাবি করতে হয় না।

২০ গজ লম্বা ও ১ গজ চওড়া একটি মসলিন কাপড়ের ওজন হত ২০ তোলার মতো। ৫০ মিটার লম্বা এক প্রস্থ মসলিন কাপড়কে একটি সাধারণ দিয়াশলাই/ম্যাচ বাক্সের মধ্যে অনায়াসেই ভাঁজ করে রাখা যেত।

গ্রীষ্ম মওসুমে মুঘল সাহজাদী জেব-উন-নেসা মসলিন কাপড়ের জামা পরে তার পিতা সম্রাট আওরঙ্গজেব এর দরবারে উপনীত হন। মেয়ের পরনে পাতলা কাপড় দেখে সম্রাট লজ্জিত হয়ে ক্ষেপে যান। তিনি রাজকুমারীকে প্রশ্ন করেন, মুঘল সাম্রাজ্যের কী এতই দূরবস্থা যে রাজকুমারীর শরীর কাপড়ের অভাবে বেআব্রু হয়ে আছে? রাজকুমারী জেব-উন-নেসা সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে জাঁহাপনা? আমি তো যথাযথ কাপড়ই পরিধান করেছি? সম্রাট বললেন, তবে কাপড় ভেদ করে তোমার শরীর দেখা যাচ্ছে কেন? রাজকুমারী বললেন, এ কাপড় অতি মিহি জাঁহাপনা। তবে কেন এক প্রস্থ না পরে দুই প্রস্থ পরলে না? রাজকুমারী বললেন, তাই তো করেছি জাঁহাপনা! আমি তো এক প্রস্থ নয়, দুই প্রস্থ নয়, আমি তো সত্তর প্রস্থ কাপড় পরেছি? দেখুন তাহলে। কোন কাপড় কত পাতলা বা সূক্ষ্ণ হলে পর পর সত্তুর পর্দা দিলেও সম্রাটের চোখে তা এক প্রস্থের চেয়েও পাতলা মনে হত!

কথিত আছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবার আলীবর্দী খানের দরবারে ছিল আব-ই-রওয়ান জাতের মসলিনের কদর। ফারসি ভাষায় আব-ই-রওয়ান এর অর্থ হল সকালের শিশির। যদি সকালের শিশির ভেজা ঘাসের উপর এ কাপড় বিছিয়ে দেয়া যেত তবে ঘাসের শিশিরের সাথে এটা এমনভাবে একাকার হয়ে যেত যে কোনটা কাপড় আর কোনটা ঘাস বোঝাই যেত না। বাংলার সুবেদার থাকার সময় আলীবর্দী খাঁ তার জন্য তৈরি এক প্রস্থ মসলিন কাপড় ঘাসের উপর শুকাতে দিয়েছিলেন। এ স্থানের কিছু দূরে ঘাস খাচ্ছিল একটি গাভী। সে ঘাস খেতে খেতে মসলিনের কাছে এসে ঘাস ও কাপড়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পেরে ঘাসের সাথে সাথে গোটা কাপড়টিই খেয়ে ফেলল। আলীবর্দী খাঁ এর শাস্তি স্বরূপ গাভীর মালিককে ঢাকা থেকেই বের করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও আর রইল না। মুঘলদের পরাজিত করে বাংলা দখল করল ব্রিটিশ বেনিয়ারা। রাজ্য ক্ষমতা দখলের পূর্বেই তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের বিলিতি শাড়ীর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হল ঢাকার মসলিন। তাই তারা মসলিনকে চিরতরে দূর করে দিতে চাইল। প্রথমেই তারা মসলিন কাপড়ের উপর অত্যধিক শুল্ক বা ট্যাক্স চাপিয়ে দিল। বিলেত থেকে আমদানী করা কাপড়ের উপর শুল্ক ছিল ২-৪%। কিন্তু মসলিনসহ দেশি কাপড়ের উপর তারা ট্যাক্স বসাল ৭০-৮০%। তাই দেশে যেমন বিলিতি কাপড় সুলভ হল, একই সাথে ব্যয়বহুল হয়ে উঠল মসলিনসহ দেশি কাপড়। প্রতিযোগিতায় তাই মসলিন টিকতে পারছিল না। কিন্তু তারপরও টিকেছিল মসলিন।

এবার ইংরেজ শাসকগণ নিষেধাজ্ঞা জারি করল মসলিন তৈরির উপর। তাদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও চলল মসলিনের উৎপাদন। তখন ব্রিটিশরাজ চড়াও হল মসলিনের কারিগরদের উপর। তারা মসলিন কারিগরদের ধরে ধরে তাদের হাতের আঙ্গুল কেটে দেয়া শুরু করল যাতে গোপনে গোপনে তারা মসলিন তৈরি করতে কিংবা এর নির্মাণকৌশল অন্যদের শিক্ষা দিতে না পারে। আর এভাবেই একদিন বাঙালিরা হারিয়ে ফেলল তাদের গর্বের মসলিন তৈরির প্রযুক্তিজ্ঞান। বর্তমানে মিরপুরের একমাত্র জামদানিই মসলিনের দূর সম্পর্কিত শ্রেণি হিসেবে টিকে আছে।

ইংরেজগণ এদেশে এসে একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনা ও বিকাশ ঘটিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। সারা বিশ্বেই তারা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা। কিন্তু একই সাথে তারা সারা পৃথিবী থেকে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলোকেও যে ধ্বংস করে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সিদ্ধ করেছিলেন, ঢাকার মসলিন শিল্প ধ্বংসের কাহিনীই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সম্পদ পাচারের বিষয়টি প্রধানত সংঘটিত হয়েছে বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে। সাম্রাজ্য স্থাপনের আগপর্যন্ত ব্রিটেন ভারতবর্ষ থেকে টেক্সটাইল ও চালের মতো পণ্য ক্রয় করতো সরাসরি ভারতীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে। আর এসব পণ্যের বিনিময় মূল্য তারা পরিশোধ করতো সাধারণ উপায়ে- প্রধানত রূপার মাধ্যমে, যেমনটি তারা অন্যান্য দেশের বেলায়ও করে থাকতো। কিন্তু ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কুক্ষিগত করার পর থেকেই এই ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে। তারা ভারতীয় বাণিজ্যে মনোপলি স্থাপন করে।

এবং এই মনোপলির মূল ভিত্তি ছিল কর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশ থেকে কর সংগ্রহ শুরু করে, এবং চতুরতার সাথে তারা সংগৃহীত আয়ের এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করতে থাকে ব্রিটিশ প্রয়োজন মেটাতে ভারতবর্ষ থেকে পণ্য ক্রয়ের কাজে। সহজ কথায় বলতে গেলে, ভারতীয় পণ্য কিনতে নিজেদের পকেট থেকে টাকা খরচের পরিবর্তে, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা সেগুলো কোনো অর্থ ব্যয় না করেই সংগ্রহ করতে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, তারা কৃষক ও তাঁতিদের কাছ থেকে পণ্য দাম দিয়েই কিনছে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা বিনিময়ে সেই অর্থই প্রদান করছে, যা তারা কিছুকাল আগে এই কৃষক-তাঁতিদের কাছ থেকেই হাতিয়ে নিয়েছে! এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ভারতবর্ষ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে যে পণ্য ব্রিটিশরা নিয়ে যেত, সেই পণ্য কি কেবল তারা নিজেরাই ভোগ করত? না, ওই পণ্যের কেবল কিয়দাংশই তারা নিজেরা ভোগ করত। বরং আরও লাভের আশায় ঐ পণ্যই পরবর্তীতে তারা আরও চড়া মূল্যে ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানী করত। ভারতবর্ষে উৎপাদিত পণ্যের সুনাম ছিল গোটা ইউরোপ জুড়েই। এবং সেগুলো যেহেতু অন্য আর কোনো দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে পাওয়া যেত না, তাই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা সেই সকল পণ্যের উপর এমনকি শতভাগ লাভও করতে পারত। ভারতবর্ষ থেকে সংগৃহীত পণ্যের এরূপ পুনঃরপ্তানীর মাধ্যমেই ব্রিটেন সরাসরি কিছুর উৎপাদক না হয়েও ইউরোপের বাজারের অন্যতম বড় খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছিল।

একে একপ্রকার জালিয়াতিই বলা চলে। কিংবা পুকুর চুরি বলতে আমরা যা বুঝে থাকি আর কী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ ভারতীয়ই এই বিষয়গুলো ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। কারণ যে প্রতিনিধিরা তাদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করতে আসতো, ঠিক তারাই তো আবার তাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে আসতো না। অশিক্ষিত ভারতীয়দের পক্ষে তখন এটি বোঝা সম্ভবপর হয়নি যে গ্রহীতা ও দাতা আলাদা আলাদা ব্যক্তি হলেও, তাদের মূল উৎস আসলে অভিন্ন, এবং তাদের মাঝে যোগসাজশ বিদ্যমান রয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আজও ব্রিটেনের অনেকেই ভারতবর্ষে তাদের করা অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না।রক্ষণশীল ইতিহাসবিদ নায়াল ফার্গুসন যেমন দাবি করেন, ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতবর্ষের উন্নয়নই হয়েছে। এই চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছিল ২০১৪ সালের একটি জরিপেও। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের ৫০ শতাংশই আজও বিশ্বাস করে, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ফলে উপনিবেশগুলো লাভবানই হয়েছে।

অবশ্য এর বিপরীত মনোভাবও লক্ষণীয়। যেমন ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ই স্বীকার করেছিলেন, ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনি।

শেষ কথা:
ভারতবর্ষে প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন এ অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয়ে কোনো উন্নতিই ঘটেনি, বরং উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজের হাতে যাওয়ার সময়কালে মাথাপিছু আয় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। ১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ভারতীয়দের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এক-পঞ্চমাংশ হ্রাস পেয়েছিল। পলিসি-প্ররোচিত দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় অকালে প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯০৯-১৪ পর্যন্ত যেখানে এ অঞ্চলের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ ছিল ১৯৭.৩ কেজি, ১৯৪৬ সাল নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ১৩৬.৮ কেজিতে।

তাই এ কথা দ্ব্যর্থহীন চিত্তে বলাই যায়, ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্রিটেনের কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং গবেষণাপত্র থেকে দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ভারতবর্র্ষের কাঁধে চেপেই আজকের উন্নত ব্রিটেনের জন্ম।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •