cbn  

এম.জিয়াবুল হক,চকরিয়া :

২০১৮ সালে চকরিয়া থানার মোড়স্থ আল মদিনা রাইচমিলে লুটপাট ও টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মিলের ম্যানেজার আবুল হাশেম, সহকারি ম্যানেজার জালাল উদ্দিন এবং আবুল হাশেমের ছেলে রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি নালিশী মামলা করেন জন্নাত আরা বেগম। যার মামলা (নং১২৪৫/১৮)। বাদি রাইচমিল মালিক নুর হোসেনের স্ত্রী। ওই মামলার অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালতের বিচারক তদন্তের জন্য চকরিয়া থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। ওইসময় পুলিশের পক্ষথেকে আদালতে যথারীতি তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করেন পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, মিল মালিকের স্ত্রী জন্নাত আরা বাদি হয়ে ম্যানেজারসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাটি করার পর থেকে আল মদিনা রাইচমিলটি বন্ধ রয়েছে। মুলত মিল মালিক নুর হোসেন থাকেন প্রবাসে। সেই কারণে মিলটি দেখভালে লোক না থাকায় গেল দুইবছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অবশ্য বর্তমানে ওই মিলটির আর অস্তিত্ব নেই সেখানে। মুল মালিক সেখানে এখন অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

এ অবস্থায় প্রথম ঘটনার দুইবছর পর প্রবাস থেকে দেশে ফিরে চলতি ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর একই ঘটনার অবতারণা করে মিল মালিক নুর হোসেন বাদি হয়ে এবার একটি সাজানো চাঁদাবাজি মামলা করেছেন। আর মামলায় আসামি করেছেন চকরিয়া উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান জেসমিন হক জেসি চৌধুরী ছাড়াও তিন ব্যবসায়ীকে।

অভিযোগ উঠেছে, মিল মালিক নুর হোসেনের কথিত সাজানো মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বাক্ষীদের জবানবন্দী না নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে মিথ্যা চাঁদাবাজী প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এমনকি মামলায় আনীত অভিযোগ এবং প্রতিবেদনের সাথে বাস্তবতার মিল না থাকায় এনিয়ে মামলার বিবাদীপক্ষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। চকরিয়া পৌরসভা ৪নং ওয়ার্ডের থানা সেন্টারের পূর্বপাশে^ থানা রোড এলাকায় ঘটনাস্থল দেখিয়ে আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দেন।

অভিযোগে জানাগেছে, চকরিয়া পৌরসভা ৪নং ওয়ার্ডের ভরামুহুরী হাজী পাড়া এলাকার মৃত আহমদ শফির পুত্র নুর হোছাইন বাদী হয়ে বিগত ৩ সেপ্টেম্বর’ ২০ইং চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি ফৌজদারী অভিযোগ (নং সিআর ৬৫৬/২০) দায়ের করেন।

এতে বিবাদী করা হয়েছে থানা সেন্টার এলাকার ব্যবসায়ী মৃত আবুল কাসেমের পুত্র মো: কামাল উদ্দিন, উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান জেসমিন হক জেসি চৌধুরী, তার বয়োবৃদ্ধা মা রাজিয়া বেগম, স্থানীয় দোকান কর্মচারী অপ্রাপ্ত বয়স্ক মমতাজ আহমদের পুত্র মো: নবী হোসেন ও ব্যবসায়ী মৃত আবুল কাসেমের পুত্র জমির উদ্দিনকে। এছাড়াও মামলায় অজ্ঞাত ১৫/২০জনকে আসামি দেখানো হয়েছে।

আদালতের বিচারক বাদির নালিশী অভিযোগটি কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগটির তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করেছেন। প্রতিবেদনে অভিযোগের ঘটনাস্থল ও তারিখ দেখানো হয়েছে’ প্রথম ঘটনা ২৬মার্চ’২০ইং দিবাগত রাত ৩টা ও ২য় ঘটনা ১০ আগষ্ট’২০ইং রাত ২.৩০টায় মেসার্স হোছাইন ষ্টীল মাঠ, আল মদিনা মেজর অটো রাইচ মিলের শোরুম ও লাকড়ির মিলে।

একদিকে, ঘটনার ৬মাস পর আদালতে অভিযোগ দাখিল। আবার সেখানে ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী এবং ১৭ লাখ ৯১ হাজার টাকার মালামাল চুরির কথা বলা হলেও বাস্তবে কোন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী বিবাদিপক্ষের লোকজন।

এমনকি এইধরণের নামে ওই এলাকায় কোন ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-রাইচ মিলের অস্তিত্ব না থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পরিদর্শক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ তড়িগড়ি করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন কথিত ১০ লাখ টাকা চাঁদাদাবীর কথা।

ভুক্তভোগি জেসমিন হক জেসি চৌধুরী ও জমির উদ্দিন জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা সরেজমিনে কোন ধরণের তদন্ত না করে এবং স্বাক্ষীদের কোন লিখিত জবানবন্দী না নিয়ে বিজ্ঞ আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে মহিলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জেসমিন হকের বয়োবৃদ্ধা মা রাজিয়া বেগমকে অব্যাহতি দিলেও অবশিষ্ট বিবাদী উপজেলা নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও তিন স্বনামধন্য ব্যবসায়ীসহ ৫জনের নাম রেখে কথিত মিথ্যা চাঁদাবাজীর ধারাসহ আদালতে প্রতিবেদন দেন।

ভুক্তভোগি বিবাদীরা জানান, ফৌজদারী এ অভিযোগটি তদন্তকারী কর্মকর্তা বাদীর সাথে গোপন আতাতের মাধ্যমে তড়িগড়ি করে বিজ্ঞ আদালতে মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেন। যা সরেজমিনে তদন্ত করলে এর কোন ধরণের সত্যতা পাওয়া যাবেনা।

উল্লেখিত অভিযোগে বিবাদী জেসমিন হক জেসি চৌধুরী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট নিয়ে উপজেলা নারী ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি জনপ্রিয় নারী নেত্রী ও উপজেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। অপর ৩জন বিবাদী স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী এবং একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক দোকান কর্মচারী রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বাক্ষীদের কাছ থেকে লিখিত কোন ধরণের জবানবন্দী না নিয়ে স্বাক্ষীদের নামে ভিত্তিহীন জবানবন্দী দেখিয়েছেন। যা ইতিমধ্যে ৬জন স্বাক্ষীর মধ্যে ৩জন স্বাক্ষী যথাক্রমে আবু শামা পিতা নজির আহমদ, আলমগীর পিতা মৃত আবুল কালাম ও শেফায়েত হোসেন পিতা মৃত তরিক আহমদ প্রকাশ্যে বিবাদীদের পক্ষে এবং কোন ধরণের চাঁদাবাজী কিংবা ঘটনা ঘটেনি মর্মে স্বাক্ষী ও বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে এফিডেভিট সহকারে বক্তব্য দেবেন বলে জানান।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাদী ও বিবাদী পক্ষের মধ্যে জমি-জমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসলেও থানা সেন্টার এলাকায় বাদীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও চাঁদাদাবীর মতো কোন ঘটনা ঘটেনি।

বিবাদিপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী নুর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি জায়গা-জমির বিরোধের পূর্বশত্রুতার জেরধরে আদালতে অভিযোগটি করেছেন।

এদিকে আল মদিনা রাইচ মিলটি বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ায় প্রতারণা ও আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক নুর হোসেন, তাঁর স্ত্রী জন্নাত আরা, ম্যানেজার আবুল হাশেম ও সহকারি ম্যানেজার জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে তিনটি মামলা করেছেন ভুক্তভোগী তিনজন ধান ব্যবসায়ী। তাদের অভিযোগ, মিল চালু থাকার সময় তাঁরা বিপুল পরিমাণ ধান বিক্রি করলেও তাদের টাকা না দিয়ে মিল মালিক ও ম্যানেজাররা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। বর্তমানে মামলাগুলো আদালতে চলমান আছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ধান ব্যবসায়ীরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •