কাফি আনোয়ার:
শেফালী পাল। ৭৫ ছুঁই ছুঁই বয়সেও ক্লান্তিহীন। সাহসিকা রণাঙ্গিনী, পত্রিকাওয়ালী, একজন হকার। সকলের প্রিয় শেফালী মাসী। কক্সবাজার জেলার বৃহত্তম বাণিজ্যিক উপশহর ঈদগাঁহ বাজারের অলিগলি, পথে-প্রান্তে উদায়াস্ত খবরের কাগজের বোঝা হাতে নিরন্তর ছুটে চলা এক অবলা সরলা পুরাঙ্গণা।

কাঁধে-পিঠে দায়িত্বের ভার। সংসারের বোঝা, নাতি-নাতনীর বোঝা, বিধবা পুত্রবধুর বোঝা, নিজের বয়সের বোঝা, খবরের কাগজের বোঝা নিয়ে কলুর বলদের মত জীবনের ঘানি টানতে টানতে এসে দাঁড়িয়েছে জীবন সায়াহ্নে। তবুও শেফালীর ঘাড় থেকে যেন বোঝা নামে না। নামতেও চায়না।

পোড়খাওয়া জীবনের তাগিদ মেটাতেই পথে পথে অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছে পত্রিকা বিক্রির ফেরি। বার্ধক্যে নুব্জ শরীর । অভাবের টানাপোড়েন আর মাথায় কষ্টের ঝাঁপি। শীর্ণ ও রোগাক্লিষ্ট দেহ আর যেন চলেনা । জীবনের চাকা ঘুরতেও চায় না আর। তবু অস্থিচর্মসার কব্জির মোচড়ে প্রতিদিন শেফালীকে ঘুরাতে হয় সংসারের জগদ্দল সেই চাকা।

ঝড় কিংবা বৃষ্টি, চৈত্রের খরতপ্ত রৌদ্র কিংবা শীতের কনকনে শৈত্য প্রবাহেও বিশ্রামের ফুরসৎ নেই তার। এ যেনো কবি সুকান্ত ভট্টাচায্যের সেই দৃশ্যকল্প

” ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজেছে ঘামে, জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে “।

করুণা কিংবা দাক্ষিণ্যের ক্ষুন্নিবৃত্তির বদলে স্বনির্ভর ও সম্পন্ন আত্মমর্যাদার মহান দারিদ্রই শেফালীর কাছে চির সত্যম-শিবম-সুন্দরম। নিয়তি নয়, দুঃখ জয়ের জীবনব্রতে আরাধ্য পুজারী হয়েই শেফালী কাটাতে চায় জীবনের বাকীটা সময়। স্বপ্ন,প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার পৌণঃপুনিক অবিভাজ্য জীবনবোধে খেদ নেই, ক্ষোভ নেই। নেই দুঃখশোকের ব্যথিতবেদনা । আত্মশাঘায় আত্মার অনির্বাণ শুদ্ধতায় নশ্বর ইহধাম ত্যাগ করতে পারলেই যেন তার সকল মুক্তিদ্বার খোলে যাবে, এই বিশ্বাসেই চলছে শেফালীর যাপিত জীবনের অন্তিমকাল।

মধ্যযৌবনেই সিঁথির সিঁদুর মুছে গেছে তাঁর। বিধবার তিলকে রাজটীকা হয়ে উঠেছিল একমাত্র পুত্র স্বপন। সর্বস্ব দিয়ে টেনেছে নিস্তরঙ্গ জীবনের বৈঠা। অকুলপাথার পাড়ি দিয়েছে, বিধবাব্রতে সামলে নিয়েছে ঘরকন্নার অযাচিত সমীকরণ।

একমাত্র অবলম্বন পুত্র স্বপনকে ঘিরে বেড়া উঠা স্বপ্নগুলি রাঙানোর কোন কমতি রাখেনি। বিলিয়ে দিয়েছে জীবন আর যৌবনের সকল স্বাদ-আহ্লাদ। স্বপনকে পড়ালেখা শিখিয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্তের সর্বোচ্চ নাগালে।

পড়তে পড়তে সংবাদপত্রের নেশায় সেই স্বপনই একদিন শিক্ষিত হকার হয়ে হাল ধরে শেফালী সংসারে। বিয়ে করে সংসার সাজায় স্বপন। ঘর আলোকিত করে নাতি নাতনী আসে শেফালীর সংসারে। পুত্র,পুত্রবধু আর নাতি-নাতনী নিয়ে বেশ চলে যাচ্ছিল শেফালীর একান্নবর্তী সংসার।

অতপরঃ হঠাৎ একদিন, সেই পুত্র স্বপনও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমাল। শেফালীর সোনার সংসারে পুনশ্চঃ নেমে এল দূর্যোগের ঘনঘটা। দুঃখের কালনিশিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো শেফালীর পরিবার। স্বপনের রোজগারে ঘুরে দাঁড়িয়ে উঠা সংসারে দিনে দিনে দানা বাধঁতে শুরু করে অমানবীয় অভাবের ঘূর্ণাবর্ত। পুত্র স্বপনের প্রয়াণ শোকবিহবলতা কাটিয়ে উঠার আগেই শুণ্য উনুনে হাড়ি চড়াতে শেফালী ফের পরিধান করলেন জীবনযুদ্ধের শিরাস্ত্রাণ ।

দয়া- দাক্ষিণ্যে কিংবা করুণার আর্দ্রতায় ভিজেনি পুত্রশোকাতুর বিধবা শেফালীর কপর্দকহীন দুই হাত। সেই শূণ্য দু’হাতে তুলে নিলেন সংবাদপত্র। তুলে নিলেন সংসারের জোয়াল-লাঙল-ঘানি। অচল চাকা সচল হলো। পেল গতি। সেই গতিতেই বেড়ে উঠে স্বপনের দুই সন্তান।

গত ২০ বছর ধরে পত্রিকার বোঝা হাতেই এই দোকান থেকে সেই দোকান, পথ থেকে ফুটপাথে, জনবহুল জংশন কিংবা ব্যস্ততামুখর স্টেশনে স্টেশনে চলছে শেফালীর এই পত্রিকাফেরী।

অনেক ক্রেতা সহানুভূতি জানায়, সহৃদয়ে হৃদয়ঙ্গম করে শেফালীর প্রতি সমব্যথি হয়ে উঠে। অপার বিস্ময়ে শুনতে চায় এই ফেরারী জীবনের গল্প। এমনটাই বলছিলেন শেফালী ।

বলা না বলায়, স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় কালেভদ্রে যাপিত জীবনের ভারাক্রান্ত খণ্ডচিত্রগুলি কখনো গল্প , কখনো পাওয়া না পাওয়ার উপাখ্যান হয়ে উঠলেও শেফালীর জীবন যেন সিন্ধুহিলোলে ভাসমান নিরাশার ভেলা। কখনোবা মনে হতে পারে অ্যান এপিক জার্নি অব লাইফ।

সদ্য এইচএসসি পাশ করা নাতনীর জন্য চলনসই একটা কর্মসংস্থান আর নাতির জন্য একটা ব্যাটারীচালিত অটোবাইক জায়-জোগাড় করে দেয়ার আশায় কাটছে শেফালীর দিনগুলি। এই ক্ষুদ্র অপূর্ণতাটুকু পূর্ণ করেই তিনি অনন্ত মহাকালের স্রোতে মিশে যেতে যান। পবিত্র আত্মার পরিতৃপ্ত প্রশান্তি নিয়ে মর্ত্যের অগস্তযাত্রায় বিলাতে চান অপার্থিব স্বর্গের প্রসাদ।

ক্ষয়িঞ্চু এই সমাজের প্রতিটি কৌণিক দুরত্বে বিত্ত-বৈভব হাসিলের অসমপালা। মানুষের মনোবিত্তের শেকলে প্রতিনিয়তই শৃঙংখলি হচ্ছে বিত্তের বাহার। পথেঘাটে হর-হামেশাই চোখে পড়ে শতশত প্রসারিত হাতের ভিক্ষার নৈবেদ্যথালা। আত্মমর্যাদার মুল্যবোধ সংক্রমিত মানবিক বিকারে বাহুগ্রস্ত।

প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে বিত্তের বলয়ে নিগৃহীত হচ্ছে মানূষের স্বতশ্চল মনাচার। সেখানে কেবল একজন শেফালীই পথে পথে আত্মমর্যাদাশীল জাতির কলংক তিলকে আদর্শের প্রতিভূ হয়ে সগৌরবে মাথা তুলে আছে। শিখিয়ে যাচ্ছেন কর্মই ধর্ম, আত্মমর্যাদারক্ষাই জীবনের পবিত্র সৌন্দর্য্য। সমাজের প্রতিটি শিরে শেফালীর মত শোভা পাক আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার শিরাস্ত্রাণ।একজন শেফালীর আত্মত্যাগ,কর্মোদ্যম, নৈতিক দৃঢ়তা, স্বনির্ভরতার সংকল্প,আত্মমর্যাদাবোধের দীপ্ত প্রেরণা ও পরার্থ কল্যাণময়তায় আলোকিত হোক সমাজের প্রতিটি অন্ধকূপ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •