ফরিদুল আলম দেওয়ান , মহেশখালী :

সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেয়া সাধারণ ক্ষমা ও আত্মসমর্পণের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের ২শ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার জলদস্যুরা দস্যুতা সহ বিভিন্ন অপরাধ জগত ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলে অচিরেই উপকূলীয় এ অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইবে।
এমনটি আশা করছেন খোদ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী জনগণ। এ লক্ষ্যে সরকার ২০১৮ সাল থেকে জলদস্যু সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেয়ায় এ পর্যন্ত ৫ শতাধিক জলদস্যু সন্ত্রাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর হাতে প্রায় ৫ শতাধিক অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণ করে। যা দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণের উল্লেখযোগ্য অংশ। সর্বশেষ গতকাল ১২ নভেম্বর বাঁশখালীর সরকারি আলাওল কলেজ মাঠে র‍্যাব এর মাধ্যমে ৩৪ কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম সমুদ্র উপকূলের ১২ টি কূখ্যাত ডাকাত বাহিনীর ৩৪ জন জলদস্যু ৯০টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র,২ হাজার ৫৬ রাউন্ড কার্তুজ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। এ আত্মসমর্পণ কে এতদাঞ্চলের মানুষ উপকূলীয় এলাকায় সন্ত্রাস দমনে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।


উল্লেখ্য,গত ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রথম দফায় আলোচিত সাংবাদিক আকরাম হোসেনের মধ্যস্ততায় র‍্যাব-৭ এর সহায়তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও র‌্যাবের ডিজির উপস্থিতিতে মহেশখালীর আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ৫ টি বাহিনীর ৩৭ জনসহ ৪৩ জলদস্যু অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২য় দফায় ২০১৯ সালে ২২ নভেম্বর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় একযোগে মহেশখালীর কালারমারছড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করেন ১২টি সন্ত্রাসী বাহিনীর ৯৬ জন জলদস্যু ও অস্ত্রের কারিগর। এ সময় তাঁরা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৫৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৮৪ রাউন্ড গুলি, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন যন্ত্র জমা দেন। তাঁরা সবাই জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়ার জলদস্যু ও অস্ত্রের কারিগর।
জলদস্যুর আত্মসমর্পণের খবরে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকূল জুড়ে উপকূলীয় এলাকার জেলে পল্লীগুলোতে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

র‌্যাব-৭ সূত্রে জানা গেছে, সাগরের ত্রাস বাইশ্যা ডাকাত বাহিনীর তিনজন, খলিল বাহিনীর দুজন, রমিজ বাহিনীর একজন, বাদশা বাহিনীর তিনজন, জিয়া বাহিনীর দুজন, কালাবদা বাহিনীর চারজন, ফুতুইক্যা বাহিনীর তিনজন, বাদল বাহিনীর একজন, দিদার বাহিনীর একজন, কাদের বাহিনীর একজন, নাছির বাহিনীর তিনজন ও আরো কয়েকটি বাহিনীর ১০ জনসহ মোট ৩৪ জলদস্যু গতকাল বাঁশখালীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণ করে।


আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় কোনো জলদস্যু বা বনদস্যুর ঠাঁই হবে না। মন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড রয়েছে, প্রয়োজনে বিজিবি রয়েছে। আপনারা পালিয়ে বেড়াতে পারবেন, কিন্তু আস্তানা গড়তে পারবেন না। দস্যুবাহিনীর উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, আপনারা আত্মসমর্পণ না করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি হলে কি পরিস্থিতি হবে, তা আপনারাই জানেন।
যে যেখানে আছে, তাদেরকে খুঁজে বের করা হবে। তাই কঠোর পরিণতির আগে আত্মসমর্পণ করে ফেলুন। যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা সমুদ্র উপকূলে সকল দস্যুবাহিনী দমন করবোই।
যারা আত্মসমর্পণ করেননি তারা ভাববেন না, আপনাদের কিছু হবে না। আপনারা যা যা করছেন, সবই আমরা দেখছি, কোথাও পালিয়ে থাকতে পারবেন না। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন আগের চেয়ে অনেক দক্ষতা ও সক্ষমতায় পরিপূর্ণ।
তিনি বলেন, একসময় উপকূলের লোকজন এসব জলদস্যুদের কাছে জিম্মি ছিলো।


ধার করে হলেও দস্যুদের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করতে হতো। জেলেদের নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ২০১৬ সালের ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত মাস্টার বাহিনী আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দস্যুদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলের ৩২৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। এখন আমাদের উপকূলকে দস্যুমুক্ত বলছি না, তবে সংখ্যা অনেক কমে এসেছে।
মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের দস্যুদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আজও আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের কিছু আর্থিক সহায়তা করা হবে। তারা আজ প্রতিজ্ঞা করে গেলেন- এই অন্ধকার পথে আর যাবেন না, আলোকিত পথে আসবেন আর দস্যুতা করবেন না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •