আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়া এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের না জানিয়ে আকস্মিকভাবে ড্রোজার লাগিয়ে মাটি কাটার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পরিবারকে বাস্তুহারা করতে বসেছে রাঙামাটির সড়ক বিভাগ কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে কলাবাগান এলাকা পরিদর্শনে এসে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে সঠিক প্ল্যান উপস্থাপন না করে কলাবাগান এলাকায় চলমান সড়ক উন্নয়ন কাজ পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আপাতত স্থগিত রাখতে সংশ্লিষ্ট্য সড়ক বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছেন কাউখালী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শতরূপা তালুকদার।

এসময় তিনি বলেন, কোথায় রাস্তা! কোথায় এসে মাটি কাটা হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। তাই রাস্তা সংস্কারের সঠিক প্ল্যান উপস্থাপন করে পরবর্তীতে সড়ক উন্নয়নের কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে রাঙামাটি ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের উন্নয়ন কাজ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে কথা বলার পর সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাকে এমন নির্দেশনা প্রদান করেন।

এ সময় কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শতরূপা তালুকদার কলাবাগান এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেন। কথা বলার সময় ক্ষতিগ্রস্থরা তাদের বাড়ী ঘরের সকল কাগজপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেখান এবং তাদের কী কী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তার বর্ণনা দেন। এসময় ইউএনও স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে বলেন, জনগনের ক্ষতি করে সরকার কখনোই উন্নয়ন কাজ করবে না। জনগনের সঠিক সুরক্ষা রেখেই সরকার তার উন্নয়ন কর্মকান্ড করবে।

বেতবুনিয়া থেকে রাঙামাটি এবং ঘাগড়া-বড়ইছড়ি সড়ক মিলে সর্বমোট প্রায় ২৭০ কোটি টাকার পরিকল্পনায় এই সড়ক উন্নয়নের কাজ করছে রাঙামাটির সড়ক বিভাগ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, কলাবাগান এলাকার বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার ৪০ বছরের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে রাস্তা সড়ক বিভাগ যে রাস্তা তৈরী করছে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তীলে তীলে এই জায়গাকে বাস যোগ্য করে তুলেছি। ২০১৭ সালে পাহাড় ধ্বস ও বন্যার কারণে আমাদের ঘরের অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগ তখন আমাদের পাশে ছিলো না। আমরা ট্রাকে ট্রাকে মাঠি ফেলে সড়ক ও আমার বাড়ীঘর রক্ষা করছি। এই জায়গা গুলোতে ভাঙ্গন রোধে গাছ রোপন করেছি। বাঁশ বাগান করেছি যাতে রাস্তা ধ্বসে না পরে। কিন্তু সড়কের উন্নয়নের নামে আমাদের উচ্ছেদ করে মাঠ বানিয়ে ফেলেছে। এই অবস্থায় আমরা কোথায় যাবো। আমার কোন ছেলে নেই, অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ৭টি মেয়ে নিয়ে কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি। আমার লাগানো বাগান থেকে শাকসবজী, ফল মুল বিক্রি করে সংসার চালিয়ে ৫টি মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আরো ২টি মেয়ে আছে তাদের নিয়ে আমরা কোথায় যাবো। তারা রাতের বেলায় ট্রাক্টর দিয়ে মাটি কাটছে। মাটি কাটতে বাধা দিলে তারা বলছে মাটি চাপা দিয়ে দিবে। কোন প্রতিবাদ যাতে না করে তার জন্য। সড়ক জনপথ বিভাগের রাস্তা দখল করে আছো। আমরা হেডম্যানের বিরুদ্ধেও মামলা করবো।

ক্ষতিগ্রস্থ আব্দুল জব্বার বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে এই জায়গায় বসবাস করছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ রাস্তা বড় করতে করতে আমাদের নীচে নামিয়ে দিয়েছে। এখন রাস্তা সংস্কারের নামে আমাদের ফলজ বাগান, কেটে ফেলেছে। বাথরুম করবো তারও রাস্তা তারা রাখেনি। সকল বাথরুমের ফাইফ ও ট্যাংকী ভেঙ্গে দিয়েছে। আমরা এখন রাস্তা সংস্কারের নামে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।
ক্ষতিগ্রস্থ শিরিনা বেগম বলেন, তারা রাতের বেলায় মাটি কাটে। আমাদের কোন ক্ষতি হবে না হবে না বলে আমাদের সকল জায়গা কেটে ফেলেছে। রাস্তা রাস্তা সংস্কারের নামে খালের জায়গা বন্ধ করে দিয়ে মাঠ বানিয়ে ফেলেছে। কিছু বলতে গেলে তারা মামলার হুমকী দেখাচ্ছে। এই অবস্থায় আমরা প্রশাসনের কাছে এর আশু হস্তক্ষেপর কামনা প্রর্থনা করছি।

অপরদিকে স্থানীয় মুরুব্বী ও আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ জাফর আহমেদ বলেন, আমরা কখনোই উন্নয়নের বিপক্ষে নই। আমরা চায় উন্নয়ন হোক। কিন্তু জনগনের ক্ষতি করে সরকার কখনোই উন্নয়ন কাজ করে না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এই কাজ করছে। তারা ঠিকাদারের লাভ করতে জনগনকে কষ্ট দিয়ে সড়ক উন্নয়নের কাজ করছে। তিনি বলেন, প্রথমে আমরা শুনেছি রাস্তার ভাঙ্গন রোধে ওয়াল হবে। আমরা তাদের সম্মতি দিয়েছি। তারা রাস্তার কাজ শুরু করেছে কিন্তু দিনের পরদিন রাস্তা সংস্কারের নামে জনগনকে উচ্ছেদ করার পায়তারা করছে। এই এলাকার লোকজন দীর্ঘ ৪০বছর এই জায়গার উপর বসবাস করছি। এই জাগয়াটি স্থানীয় মৌজা প্রধান কর্তৃক বন্দোবস্তির জন্য সুপারিশও রয়েছে। এটা মৌজার জায়গা। কোন প্রকার নোটিশ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগ উন্নয়ন কাজের নামে জনগনকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করছে। তিনি সরকারের উন্নয়ন কাজ করতে হলে জনগনকে সঠিক ভাবে পুনর্বাসন করে রাস্তা সংস্কারের দাবী জানান। এদিকে উক্ত কাজে বাধা দিলে বা জায়গা থেকে সরে নাগেলে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের ওয়ার্ক এসিষ্টেন্ট নিরুপম চাকমা জানিয়েছেন, আমরা জনগনকে কোন ভাবেই কষ্ট দিতে চাই না। আমরা ১০ দিন আগে এসে বলে গেছি এখন কাজ করছি। তিনি বলেন, এখানে বিশাল ওয়াল দেয়া হবে। ১৯ মিটার বোরিং কওে ওয়াল দেয়া হবে। তাই এলাকাটাকে প্রস্তুত করতে হচ্ছে। সঠিক প্রস্তুত করা জন্য সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ যেমন অনুমতি দিয়েছে ঠিক সেই ভাবেই কাজ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে নিরুপম চাকমা বলেন, আমরা কাউকে কোনো হুমকি দেইনি। এছাড়া উক্ত কাজ শুরুর আগে স্থানীয়দের কোনো নোটিশও দেওয়া হয়নি বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •