সিবিএন ডেস্ক:

করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম মৃত্যু হয় গত ১৮ মার্চ। সেদিন রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছিল, মারা যাওয়া ব্যক্তির বয়স ছিল ৭০ বছরের বেশি। তিনি বিদেশফেরত ছিলেন না, তবে বিদেশ থেকে আসা এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি সংক্রমিত হয়েছিলেন। সংক্রমণের পর তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এছাড়া তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা ও হৃদরোগে ভুগছিলেন।

১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর পর করোনা সংক্রমণের আট মাসে এসে দেশে করোনায় মৃত্যু ছয় হাজার পার হয়েছে। সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত মোট মারা গেছেন (৫ নভেম্বর পর্যন্ত) ছয় হাজার ২১ জন। আর মোট মারা যাওয়াদের মধ্যে ষাট বছরের অধিক বয়সীদের সংখ্যাই অর্ধেকেরও বেশি।

তিন হাজার ১৪৫ জন, অর্থাৎ ৫২ দশমিক ২৪ শতাংশই ষাটোর্ধ্ব। এরপর রয়েছেন ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বয়সীরা, এক হাজার ৫৮৫ জন বা ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৭৪৭ জন, ১২দশমিক ৪১ শতাংশ; ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে রয়েছেন ৩৩০ জন, পাঁচ দশমিক ৪৮ শতাংশ; ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে রয়েছেন ১৩৭ জন, দুই দশমিক ২৮ শতাংশ; ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে রয়েছেন ৪৭ জন, শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং শূন্য থেকে ১০ বছরের মধ্যে রয়েছে ২৯ শিশু, শতকরা হারে শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ।

শুরু থেকেই চিকিৎসকরা বলে এসেছেন, বৃদ্ধ এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকবেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বন্ধ হয়ে যাওয়া বুলেটিনে এবং এর আগে হওয়া করোনা বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে ৬০ বছর বয়সী এবং যারা অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত, তাদের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিহিত করা হয়। তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার কথাও পরিবারের অন্য সদস্যদের বলা হয়।
করোনা টেস্ট (ছবি: ফোকাস বাংলা)

গত ২৭ আগস্ট কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি তাদের সভায় করোনার টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে। কমিটি বলে, প্রথমেই হয়তো দেশের সম্পূর্ণ জনসংখ্যার জন্য ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তাই উচ্চ ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ বাছাই করে পর্যায়ক্রমে ভ্যাকসিন প্রদান করা যেতে পারে।

‘একটা জেনারেশনকে আমরা হারাচ্ছি’ মন্তব্য করে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটাই হচ্ছে ইউরোপে বেশি মৃত্যুর কারণ। ইউরোপে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেশি। তারাই বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন এবং তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি। আমাদের দেশে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা তাদের তুলনায় কম থাকায় ইউরোপিয়ানদের চেয়ে আমাদের মৃত্যুহার কম। আবার আফ্রিকাতে আরও কম, সেজন্য মৃত্যুহারও কম তাদের। বয়স-একটি বিরাট ফ্যাক্টর। বয়স হলে শরীরের সব অর্গান দুর্বল হয়ে যায়। একইসঙ্গে তারা আগে থেকেই অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত থাকেন।’

প্রতিদিন যত মানুষ মারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ষাটোর্ধ্ব অথবা ৫১ থেকে বয়স শুরু হয়। এই অবস্থায় বৃদ্ধরা যেন ঘর থেকে না বের হন সেই অনুরোধ করে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তারা যেন হোম বাউন্ড (ঘর কেন্দ্রিক জীবনযাপন) থাকেন। বৃদ্ধ এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের জন্য পরিবারের মানুষদের পার্টিকুলার কেয়ার নিতে হবে। এছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই প্রজন্মকে বাঁচানোর।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেশে এলে যেন এই জনগোষ্ঠী আগে ভ্যাকসিন পায় সেজন্য পরামর্শক কমিটির থেকে সুপারিশও করা হয়েছে। তাদের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ঘোষণা করে এই কাজ করতে হবে।’

বয়স্কদের একেবারেই হোম কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। ছয় হাজার মানুষ মারা গেছেন, এর মধ্যে অর্ধেকই ৬০ বছরের বেশি। আমরা বলতে গেলে এই প্রজন্মকে করোনায় হারিয়ে ফেলছি-এই মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিন্ময় দাস। তিনি বলেন, বিশেষ করে যারা শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি রোগে আক্রান্ত তাদের হোম কোয়ারেন্টিনের ছাড়া ভাবাই যাবে না। একইসঙ্গে পরিবারের যারা প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছেন তাদের এই বৃদ্ধদের থেকে দূরে থাকতে হবে।

চিন্ময় দাস বলেন, ‘অনেকেই বলছেন, বৃদ্ধরাতো বাড়িতেই থাকছেন। কিন্তু বাড়ির অন্য সদস্যরা যারা বাইরে যাচ্ছেন তারা ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের সংর্স্পশে যাচ্ছেন কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তখন তাদের থেকেই ঘরে থেকেও তারা (বৃদ্ধ) সংক্রমিত হচ্ছেন। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে সেভাবে প্রচার নেই। বৃদ্ধদের থেকে দূরে থাকুন-এই একটি প্রচারই পারে তাদের সংক্রমিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে। নয়তো আমরা তাদের হারাতেই থাকবো।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •