প্রেস বিজ্ঞপ্তি :

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য কক্সবাজার যেমন বিখ্যাত, তেমনি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার বসতি, মাদক চোরাচালানসহ নানাক্ষেত্রে এই পর্যটন জেলাটি আলোচিত-সমালোচিত। এরকম গুরুত্বপুর্ণ জেলাটিতে প্রথম ( গত মার্চ মাসে) যখন করোনা থাবা শুরু হয়, তখন মানুষজন ছিলেন প্রচন্ডরকম আতঙ্কে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানসহ বিশ্বের ভিন্নি দেশে তখন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এরকম অস্বাভাবিক একটি পরিস্থিতিতে এলাকার সাধারণ মানুষকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য মুল্যবান জীবনকে তুচ্ছ করে মাঠে নেমেছিলেন কিছু মানুষ। আমরা তাঁদের বলছি, করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারির যোদ্ধা। এই যোদ্ধাদের মধ্যে আছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর, আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

আজ ৪ নভেম্বর ছিল দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর ২২তম প্রতিষ্টাবার্ষিকী। প্রতিবছর এই দিবসটি জমকালো অনুষ্টানের মাধ্যমে পালিত হয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা দিনটিকে স্মরণ করেন ভালো কিছু কাজ করার মাধ্যমে। কিন্তু করোনাকাল বলে এবার জন্মদিনটি অন্যভাবে পালন করা হয়। করোনাকালে যাঁরা নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে মাঠে নেমে অসহায় মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারির যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের পক্ষ থেকে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের প্রতি ফুলেল শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা স্মারক করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজ ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭২ জনের। এরমধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৯৩ জনের।মারা গেছেন ৮১ জন। কিন্তু কাযকর উদ্যোগ ও নানা তৎপরতার কারণে এ জেলায় প্রাণহানীর সংখ্যা অনেকটা কম ছিল। প্রাণহানীর তুলনায় সুস্থতার হার ছিল অনেক বেশি। যেমন আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ৫৪৫ জন ( ৮৭.৫২%) এবং মৃত্যু ৮১ জন ( ১.৫৬%)। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন অফিস, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনী, কক্সবাজার পৌরসভা, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়ন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, করোনা সহায়তা তহবিল ইত্যাদি।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তারা করোনা মহামারির শুরু থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। ত্রাণতৎপরতার পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাজারপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, লকডাউন, রেডজোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সথেষ্ঠ ছিলেন। করোনা রোগীর চিকিৎসায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিও, এইচডিও ইউনিট চালু, সৈকতের একটি হোটেলে ২০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার চালুর ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। তাঁর এই অবদান কক্সবাজারবাসী ভুলবেনা।

সকাল ১০টায় তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা হিসাবে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের হাতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারক তুলে দেন প্রথম আলো কক্সবাজার আঞ্চলিক অফিস প্রধান সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানা। এসময় জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানার সঙ্গে ছিলেন, প্রথম আলো বন্ধুসভা কক্সবাজার জেলা শাখার সহ-সভাপতি ফারিয়াল মৌমিতা পুষ্পি, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক উন্মে সাদিয়া হোসেন সিকদার, উপ-সাংগঠনিক সম্পাদক ফাহিম কুদ্দুস প্রিয়, বন্ধুসভা কক্সবাজার সিটি কলেজ শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রেশমি সুলতানা, প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান ও চকরিয়া বন্ধুসভার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মুরাদ প্রমূখ।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, কাজের স্বীকৃতি পাওয়া গেলে যেকোনো মানুষ মানবিক কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার সাহস পান। প্রথম আলো নীরবে সেই সাহস যোগানোর কাজটি করেই চলেছে। ২২তম প্রতিষ্টাবার্ষিীকিতে ভালো একটি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক প্রথম আলোর সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ঠদের ধন্যবাদ জানান।

এরপর শুছ্ছো ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারকদ তুলে দেওয়া হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ফাহমিদা বেগমের হাতে। করেনার মহামারিতে পরিস্থিতি যখন চরম ভয়াবহ, বাবার লাশের পাশে যখন ছেলে কিংবা পরিবারের সদস্যরা যেতে সাহস করতেন না, ঠিক সেসময় জীবনকে তুচ্ছ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের নেত্বেত্বে মাঠে সক্রিয় ছিলেন একাধিক নারী-পুরুষ দল। তাঁরা ঝড় বৃষ্টি, রাত-দিন তুচ্ছ করে ৫৭ জন করোনা রোগীর দাফন কাফনের ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন। যা মানুষের কাছে দৃষ্ঠান্ত হয়ে থাকবে। তাঁদের এই অবদান মানুষ কোনোদিন ভুলবেনা।

এই মানবিক কাজের স্বীকৃতি দিতে প্রথম আলো হাজির হন ফাহমিদা বেগমের দপ্তরে। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ উপ-পরিচালক ফাহমিদা বেগমের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রথম আলোর শুভেচ্ছা ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারক। এসময় তিনি আবেগ ধরে রাখতে পারেননি, চোখ দিয়ে বিসর্জন দেন কয়েক ফোটা আনন্দাশ্রু।

দুপুরে কাজের স্বীকৃতি দিতে প্রথম আলো দলটি যান কক্সবাজার পৌরসভা কাযালয়ে । করোনাকালে পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডে ৪০জন স্বেচ্ছাসেবী করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা প্রায় ৩ হাজার মানুষের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং তাদের সুস্থ করার উদ্যোগ নেন। কারোনা সংক্রমণরোধে মাঠে ময়দানে কাজ করতে গিয়ে পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান নিজেও করোনায় আক্রান্ত হন। এই অসামান্য ত্যাগের জন্য মেয়র মুজিবুর রহমানের কাছে প্রথম আলোর শুভেচ্ছা ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

এরপর প্রথম আলোর শুভেচ্ছা ফুল ও কৃকজ্ঞতা সনদ তুলে দেওয়া হয় জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামানের হাতে। সম্প্রতি কক্সবাজারে যোগদানের পর তিনি নিজেও করোনা আক্রান্ত হন। করোনা মহামারি শুরুর সময় থেকে পুলিশ বাহিনী আইনশৃংখলা রক্ষার পাশাপাশি করোনা সচেতনতা ও মানবিক সহায়তায় ভুমিকা রাখে।

করোনাকালীন সময়ে জীবনকে তুচ্ছ করে মাঠে ময়দানে সক্রিয় ছিলেন সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমকর্মীরা। কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়ন নিজস্ব তহবিল থেকে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে ১৯ লাখ টাকার অনুদান ও ত্রাণসহায়তা দিয়েছে। এর স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথম আলো কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের চৌধুরীর হাতে শুভেচ্ছা ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কেন্দ্রিয় সদস্য ও দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার পরিচালনা সম্পাদক মো. মুজিবুল ইসলাম।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনুপম বড়ুয়া, সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল ফোরকান আহমেদ, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং এর দায়িত্বরত কক্সবাজার পৌরসভা আওয়ামীলীগের সমন্বয়ক ও পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. নজিবুল ইসলাম, করোনা সহায়তা তহবিলের সমন্বয়ক ইমরুল কায়েস চৌধুরী, নজরুল ইসলাম ও আজিম নিহাদের হাতেও অনুরূপ প্রথম আলোর শুভেচ্ছা ফুল ও কৃতজ্ঞতা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

লকডাউন চলাকালীন দেশের প্রথম রেডজোন ঘোষণা করা হয় কক্সবাজার পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডে। এসময় আওয়ামীলীগের ১৮০ জন স্বেচ্ছাসেবী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লকডাউন ও রেডজোন বাস্তবায়ন করেন। পরে ৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে করোনায় আক্রান্ত প্রায় ৫০০ জনের সংস্পর্শে আসা ১ হাজার ৩০০ জনকে শনাক্ত করে সুস্থ করা হয়।

করোনা মহামরির শুরুতে কক্সবাজারের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ যখন দিশেহারা, বাঁচার জন্য একমুঠো খাবার জুটছিলনা, ঠিক তখনই তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনের নেতৃত্বে সমাজের কিছু ভালো মানুষ করোনা সহায়তা তহবিল গঠন করেন। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ওই তহবিলে অর্থসহায়তা দেন। তহবিলে জমা সর্বমোট ১৪ লাখ টাকার ত্রাণসহায়তা প্রদান করা হয় দুই হাজার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে। এই কাজের স্বীকৃতি দিতেও ভুলেনি প্রথম আলো।

প্রথম আলো কক্সবাজার আঞ্চলিক অফিস প্রধান সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানা বলেন, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে প্রথম আলো এবার বিশেষ এই উদ্যোগটি নিয়েছে। করোনাকালীন সময়ে যাঁরা নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়ে অসহায় মানুষের জীবন রক্ষায় সম্মুখসারির যোদ্ধার ভুমিকায় লিপ্ত ছিলেন, সমাজের মানুষ তাঁদের ভুলেননি, ভুলবেন না। প্রথম আলো সমাজের সেই সাধারণ মানুষের পক্ষ হয়েই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের স্মরণ করলো ফুলেল শুভেচ্ছা আর কৃতজ্ঞতা দিয়ে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •