অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন


আভিধানিক ও নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী মানে আদিবাসিন্দা। আদিবাসী শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Indigenous people। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। আদিবাসী শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ indigenous যার অর্থ the people regarded as the original inhabitants of an area (Oxford Advanced Learner’s Dictionary) .বুৎপত্তিগতভাবে আদিবাসী শব্দটির অর্থও অভিনব। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান মনে করেন.“The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil”এখন প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের অধিবাস তারা কি ভূমিপুত্র হিসেবে দাবি করতে পারে? যদি না পারে তাহলে তারা আদিবাসী হয় কীভাবে? জাতিসংঘ এযাবৎকালের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের পুঞ্জিত জ্ঞানকে নস্যাৎ করে যেন আদিবাসী নামের এক উদ্ভট (প্রায়োগিক বিচারে) শব্দ আবিস্কার করেছে। প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের অধিবাস তারা কি ভূমিপুত্র হিসেবে দাবি করতে পারে? যদি না পারে তাহলে তারা আদিবাসী হয় কীভাবে? জাতিসংঘ এযাবৎ কালের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের পুঞ্জিত জ্ঞানকে নস্যাৎ করে যেন আদিবাসী নামের এক উদ্ভট (প্রায়োগিক বিচারে) শব্দ আবিস্কার করেছে|

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত- Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107), আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) , এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.
এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention . অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।- Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)– এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’’. অর্থাৎ একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ্র উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)- ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্য দিকে Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- – ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়।

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলের বিভিন্ন জায়গায় যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করেন তারা আদিবাসী কিনা সে বিতর্ক বেশ পুরনো।সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন, যেটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২%।আদিবাসী শব্দটি নিয়ে যখন বিতর্ক আর অস্বস্তি, সেই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’।

কিন্তু পার্বত্য চট্ট্রগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে বসবাসকারী ১৩ টি উপজাতির সবাই বহিরাগত ও অভিবাসিত।পার্বত্য চট্রগামে ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরো ১৬ টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে। তারা কখনোই শোষণ – বঞ্চনার কিংবা ধর্মীয় কারনে নিগৃহীত হবার অভিযোগ তোলেনি।

যে কোন বিবেকবান মানুষের বিবেচনায় জনসংহতি সমিতি তথাকথিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের যে দাবী করছে তার অন্য নাম স্বাধীনতা।তারা তাদের জাতি সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাচ্ছে।অথচ তারা কোন জাতি নয়।এদের প্রভু বিৃটিশ সরকার তাদেরকে “উপজাতি” বলে চিহ্নিত করে গেছে।এদের পুর্ব পুরুষরা কেউ এর বিরোদ্ধে কথা বলেনি।চাকমা – লারমাদের চৌদ্দপুরুষরা কখনই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের নামে বাংলাদেশের বিরোদ্ধে যুদ্ধে নামেনি।আমাদের সম্পদ নিয়ে লারমারা শিক্ষিত হয়ে আমাদের বিরোদ্দে যুদ্ধে নেমেছে।বিশ্বাসঘাতক কাকে বলে?

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সমুহের আনাগোনা শুরু হয় ষোল শতক থেকে। এ সময়ে আসামের মিজোরাম থেকে কুকি নামের উলঙ্গ জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। এদের অনেকে এদিক সেদিক বিচরন করে ফিরে যেত।কিন্তু কেউ কেউ বসতি গড়ে, যাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজও বিদ্যমান। একই সময়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী খাগড়াছড়ি এলাকায় বন কেটে বসত গড়ে এবং জুম চাষ শুরু করে। ১৬৬০ এর দিকে অর্থাৎ সতের শতকের মাঝামাঝি চাকমাদের একটি দল আদিবাস আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে রামু থানার অদুরে সাময়িক অবস্থান নেয়। তারা পরে আরও গহিন অরণ্য আলী কদমের দিকে এবং রাঙামাটির দিকে যায় স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য। মগ বা মারমা জনগোষ্টীর অভিবাসন ঘটে ১৭৮৪ দিকে প্রায় একই সময়ে বোমাঙদের ও আগমন ঘটে।মোটামুটিভাবে বলা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ক্ষুদ্র জাতিসত্বা সমুহের অধিবাস তাদের অভিবাস হয়েছিল ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তৃতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী ‘ত্রিপুরা’। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। কথিত আছে সেখানকার রাজরোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্রতর অংশ স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়ে এখানে এসেছে। সেটাও বেশি দিনের কথা নয়। এর বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে আরও আটটি ক্ষুদ্র জাতি। তাদের কোনো কোনোটি চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদেরও পূর্ব থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাদের পৃথক নৃতাত্ত্বিক সত্ত্বা দৃশ্যমান।

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইনবলেন:‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

সরকার মনে করে বাংলাদেশে এক শ্রেণির মানুষ ‘আদিবাসী’ শব্দটির মাধ্যমে বিতর্ক উসকে দিতে চায়।আদিবাসী বিতর্কের মাঝে একটি বিশ্ব রাজনৈতিক চাল আছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম।তিনি বলেন, যারা নিজেদের এককালে উপজাতি হিসেবে দাবি করতেন, তারাই এখন বিদেশে গিয়ে নিজেদের আদিবাসী পরিচয় দিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চালায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, “A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

চাকমাদের কল্পিত গৌরব নিয়ে আজগুবি ইতিহাস রচনাকারী বিরাজ মোহন দেওয়ান “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত” শীর্ষক গ্র্ন্থে চাকমাদের আদি বাসস্থান তথা শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে চাকমা ঐতিহাসিকগণ চম্পাপুরী বা চম্পক নগর রাজ্যের যে ফিরিস্থি দিচ্ছেন তার পিছনে কোন ঐতিহাসিক প্রমান নেই। বিরাজ মোহন কমপক্ষে ভারতের ৫ টি স্থানের নাম চম্পক নগর বলে উল্লেখ করেছেন।

বস্তুত: চাকমারা একটি অজ্ঞাত স্থানের পাহাড়ী যাযাবর জাতি, যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভুখন্ডে আশ্রয় নিয়েছিল।আবার বিভিন্ন ভুখন্ড হতে বিতাড়িত হয়েছিল।চাকমা বুদ্ধিজীবিদের মতে তারা কখনো হিমালয়ের পাদদেশে, কখনো ত্রিপুরায় কখনো সিলেটে কখনো বার্মায় বসবাস করেছিল।সুতরাং চাকমারা বাংলাদেশের আদিবাসী নয়, বরঞ্চ আশ্রিত, বহিরাগত।একথা বিরাজ মোহন স্বীকার করেছেন। “ব্রক্ষ রাজশক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চাকমারা সেখানে শক্তিহীন হয়ে পড়ে এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানবিক কারনে চট্টগ্রামস্থ সুবেদারের অনুমতি সাপেক্ষে সর্ব প্রথম তৈনছড়ি নদীর তীরে বসবাস শুরু করে।

ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে প্রাচীন মানচিত্র সেখানে বাঙালিরা সুপ্রাচীন কাল থেকেই বসবাস করতো। এর বাইরেও মোগল আমলে, ব্রিটিশ আমলে বাঙালিদের সেখানে গমনের ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে ১৯০০ সালের শাসন বিধি পাস হওয়ার পর বাঙালিদের আর সেখানে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ ছিল না। পাকিস্তান আমলে উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধের কাজ করার জন্য প্রচুর সংখ্যক সেনা সদস্যও বাঙালিকে সেখানে পুনর্বাসন করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মুখের উপর তাদের দাবিনামা ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘লারমা বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। তোরা কি মনে করেছিস, তোদের সংখ্যা ৪-৫ লাখ। প্রয়োজনে পনেরো, বিশ লাখ বাঙালি পাঠিয়ে তোদের উচ্ছেদ করে দেবো। …তোরা সব বাঙালি হয়ে যা।’ দলিলপত্র ঘাটলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলের মতো করে সেসময়ও বাঙালি ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ভারতের অভ্যন্তরে শান্তিবাহিনীর প্রশ্রয় নতুন পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেরালো যুদ্ধ শুরু করে। তাছাড়া ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যখন ভারত ভাগ হয় তখন পার্বত্য প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ও বান্দরবানে বার্মার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে পতাকা বেশ কিছুদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উড়েছিল। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রেয়োদাদ রায় প্রকাশিত হবার পর ২১ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই পতাকা নামিয়ে ফেলে। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফের রায়ের পরও পাহাড়িরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে।এ প্রেক্ষাপটে বাধ্য হয়েই জিয়াউর রহমানকে অতিরিক্ত সৈন্য ও বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রেরণ করতে হয়েছিল।তাই সেনাবাহিনী এদেশের রক্ষক। সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনী সমূহ দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে। এখানে দুস্কৃতিকারীদের দু’টি গ্রুপ হয়ে গেছে তারা নিজেরা নিজেরা মারামারি হানাহানি করছে। প্রায় প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে, রক্ত ঝরছে। সন্তু লারমা গ্রুপ আর মানবেন্দ্র লারমার গ্রুপ শান্তিচুক্তির পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধ করছে।

এখানে একটা্ কথা না বললে নয়, পশ্চিমা শক্তি তাদের দেশে রেড ইন্ডিয়ানদের রাগাতে চাচ্ছেনা। কারন এতে হিতে বিপরিত হতে পারে। তাই তারা তৃতীয় বিশ্ব নিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছে। আমাদের মতো দেশে ঐ সন্তুদের গ্রুপ কে বিভিন্ন এনজিও কাজে লাগাচ্ছে। এমন কি এই সেদিন দেখলাম ভারতে চাকমারা চট্টগ্রামকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করতে চাইছে।

এ অস্থিরতা এবং এদের রক্ষা করতে সেখানে সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। তাছাড়া এখানে আমাদের সীমান্ত আছে। এটা বিচ্ছিন্নতাবাদপ্রবণ এলাকা। এখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।সুতরাং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সংবিধানের অধীনেই সেনাবাহিনী এখানে থাকবে। যত সংখ্যক প্রয়োজন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যা করা দরকার করবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ভারত তার ১৪ লাখ সেনা সদস্যের ৬ লাখই কাশ্মীরে রেখেছে, ৪ লাখ রেখেছে উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। সেদেশে এ নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না। অথচ বাংলাদেশের বিদেশি মদদপুষ্ট একশ্রেণীর মিডিয়া এ নিয়ে হৈচৈ করে। এখান থেকে সেনাপ্রত্যাহর বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

প্রতি মাসেই একাধিক আন্তর্জাতিক টিম পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করে কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের কথা শোনার কোনো আগ্রহ নেই তাদের। এমনকি সক্রিয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও মিশনারী সংস্থাগুলোরও গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাহাড়িদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, ও অর্থ নিয়ে ঘুরছে ইউএনডিপি, এমএসএফ, ড্যানিডা, ডিএফএইডি প্রভৃতি। কিন্তু গুচ্ছ গ্রামের বাঙালিদের নিয়ে কোনো প্রকল্প করলে অর্থ দেয় না কোনো দাতা সংস্থা বা এনজিও। অর্থ পেলেও এমন এনজিও’র রেজিস্ট্রেশন দেয় না আঞ্চলিক পরিষদ। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে পাতার পর পাতা ভরে পাহাড়িদের দুঃখ কষ্টের কথা লেখা হলেও তার একটি শব্দও খরচ হয় না গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের জন্য। তারা যেন মানুষ নয়, তাদের যেন কোনো মানবাধিকার থাকতে নেই। তবে হ্যাঁ, যদি তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়, তাহলে প্রচুর টাকা মিলবে সে ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে এইসব মতলববাজ, একচোখা ও চক্রান্তকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। কারণ তাতে তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে।

পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না। উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারী ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয়। পাহাড়ে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সকল চাকরির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। জাতীয়ভাবেও চাকুরীতে ৫% কোটা তাদের জন্য। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে একই অবস্থা। বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও ও বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ ফাইভ পেয়েও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে এ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়িরা বুয়েট-মেডিক্যালে চান্স পাচ্ছে। নানা সুবিধায় ওদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির দ্বার অবারিত। কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালি শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে অর্ধেক বই পড়ে, বাকি অর্ধেক বইয়ের সরকারি বরাদ্দ নেই। মাদ্রাসা/স্কুলের বেতন দিতে হয় রেশনের চাল/গম থেকে। পাহাড়ের সরকারি চাকরি পাহাড়িদের একচেটিয়া অধিকার। গুচ্ছ গ্রামের একটি ২০ ফুট বাই ২০ ঘরে গরু বাছুরদের সাথে বাঙালীদের থাকতে হয়ে।কারন বাইরে গরু বাছুর রাখলে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চুরি করে নিয়ে যায়।পার্বত্য বাঙালিদের বঞ্চনার কথা লিখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে।

তথ্য সুত্র:

১:আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আ্ইনের ভূল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

২:পার্বত্য চট্টগ্রাম : স্বরুপ সন্ধান।– জয়নাল আবেদীন

৩: পার্বত্য শান্তি চুক্তি সংবিধান স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ত।

৪: উপজাতি নয় বাঙালীরাই আদিবাসী- প্রফেসর আবদুর রব

৫: বাংলাদেশ নাগরিকের রাস্ট্র: কোন আদিবাসীর নয়- অ্ধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •