cbn  

অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন


মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত একটি অবমাননাকর কাহিনী হলো আলীবাবা ও চল্লিশচোর।এক কাহিনী আরব্য উপন্যাসের অংশ নয়। যদিও অনেকে তাই মনে করে থাকেন। বাবা শব্দটি আরবী নয়। এটি হলো তুর্কী শব্দ। আলীবাবা ও চল্লিশ চোর কাহিনীর প্রধান নায়ক হলেন আলী।তাঁর স্ত্রীর নাম ফাতেমা ও পুত্রের নাম হাসান। আর সেই গল্পের অতি ধুর্ত মুচির নাম হলো মুস্তফা এবং ধুর্ত চাকরানীর নাম হলো মুরজানা। আলীর ধনী ভ্রাতার নাম হলো কাসেম। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলো নেওয়া হয়েছে নবী পরিবার বা আহ্‌লে বায়াত থেকে।

দরিদ্র আলী,ফাতিমা, এবং হাসান নামগুলোর ইঙ্গিত স্পষ্ট। মুরজানা , মুস্তফা ও কাসেম নাম দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে বিবি আয়েশা রা: ও হযরত মোহাম্মদ সা: কে এবং ধনী হযরত ‍উসমান রা: কে কাহিনীতে আলী এবং কাসেমকে দেখানো হয়েছে ভাই হিসেবে। বাস্তবে হযরত আলী রা: এবং হযরত উসমান রা: ভায়রা ভাই। এ উপন্যাসটি আহলে বাইয়াতদের নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্বক রচনা। ব্যঙ্গ রচনাটি সুস্পষ্ট না করার উদ্দেশ্যে তিনটি চরিত্রকে প্রচ্ছন্ন করা হয়েছে। কাসেম শব্দটিও নবী পরিবারের। হযরত হাসানের এক পুত্রের নাম ছিল কাসেম রা:।

হযরত আলী রা: জীবনের সাথে চোর ডাকাতের সঙ্গে কোন ঘটনা নেই, যেমন আছে হযরত আবদুল কাদের জীলানীর রা: জীবনে। মুসলমানদের মানসিকতা এমনভাবে ওয়াস করা হয়ে গেছে যে, হযরত আলী রা: এর পরিবারের প্রতি এমন ব্যাঙ্গাত্বক কাহিনী ও মুত্তাকী, পরহজেগার মুসলমানের মনে কোনো রুপ ভ্রুকুটি বা বিরক্তির সৃষ্টি করে না।

বিত্তশালী বড়লোকরা তাদের অনুগ্রহপুষ্ট দরীদ্র গোলামকে আদর করে হারামজাদা বলে ডাকে। বহুত বড় বড় সাহেব তার কৃপার্থীজনকে ‘ এই হারামজাদা এদিকে আয়’ সে তো খুশীতে টগবগ হয়ে যায়। অমুসলমানদের প্রবর্তিত সুদী ব্যবস্থায় উৎপাদিত হারাম দ্রব্য ভোগ করতে করতে এবং তাদের সাহায্য রিলিফ এইড খেতে খেতে আমাদের আত্মমার্যাদাবোধ এমনভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে যে, নবী পরিবারের তীব্র অবমাননায়ও আমাদের অচেতম মনে কোন চেতনার সৃষ্টি হয়না।

আলীবাবা ও চল্লিশচোরের ন্যায় বিংশ শতাদ্বীতে রচিত হয়েছে আর এক ঘৃন্য বই হলো সালমান রুশদী বিরচিত ‘স্যাটানিক ভার্সেস’বা শয়তানের পদাবলী।এ বইটিতে নবী পরিবার ও মুসলিম ঐতিহ্যকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। তবে এ ব্যঙ্গ হয়েছে অনেক বেশী সুস্টষ্ট এবং প্রত্যক্ষ।এ বইতে চরিত্র নাম ও রুপকগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেই লেখক ছাড়েনি বরং চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। আলীবাবা এবং চল্লিশচোরের নাম, রুপক এবং কাহিনী ক্লাসিক নৃত্য ভারত নাট্যমের মতো।এর মধ্যে রুপবতী নৃত্য শিল্পী নৃত্যের ভঙ্গীতে দর্শককে লাথি দিয়ে যাচ্ছে।কামাতুর দর্শক নৃত্যে শিল্পকলায় এতো মুগ্ধ যে , বামা শিল্পীর পদাঘাতকে পদাঘাত বলে ভা্বতে পারছে না। স্যাটানিক ভার্সেস লেখক নৃত্যশিল্পীর ভঙ্গিতে নয় অহংকারি জমিদার বা ডাকাতের মতো এসে এমন ভাবে পাঠককে পদাঘাত করে। পাঠক শুধু মর্মাহত হননা এবং জমিদারের পদাঘাতে অপমানিত,ডাকাতের বলপুর্বক ধর্ষনে ধর্ষিতা শুধু অশ্রুপাত করেন না তার শোণিত প্রবাহ সৃষ্টি হয়। সালমান রুশদীর স্যাটানিক ভার্সেসে দেখানো হয়েছে মক্কার বেশ্যাগন তাদের নাম প্রচার ও অধিকতর খদ্দের পাওয়fর লক্ষ্যে উশৃংখল মোমিনগনের নাম ধারন করতো। অমুসলিম বিশ্ববরেণ্য এ পুস্তকে মক্কা নগরীর সবচেয়ে আকর্ষনীয়া সুন্দরী বেশ্যার নাম দেওয়া হয়েছে আয়েশা।(নাউজুবিল্লাহ)। হেরা গুহায় জীবরাইল আসতেন এবং গুহার নীরবতায় সমকামীদের মতো আচরন করতেন। এ ধরনের কথা শুধু প্রতিকি বা ছদ্ধনামে নয় বরং সুষ্পষ্ট নামে ব্যক্ত হয়েছে।বহু বিকৃত রুচির পরিচয় এ পুস্তকে আছে।নবী প্রেমে আমরা প্রতিদিন দরুদ পাঠ করি, মিলাদের অনুষ্ঠান করি, সিরাত সেমিনার করি। কিন্তু সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে আমাদের জিহাদী মনোভাব কতটুকু?

আমাদের নবী সা: যদি পিতা ছাড়া আল্লাহর কুদরতে জন্মগ্রহন করতেন তাঁর সম্মন্ধে পাশ্চাত্য জগতের ধারনা কিরুপ হতো। মুসলিম বুদ্দিজিবিরা তা কি কল্পনা করতে পারেন?কি দৃষ্টিতে, কি অনুভুতিতে, কি অভিব্যক্তিতে,পাশ্চাত্য দুনিয়া সে অবস্থায় আমাদের মহানবী সা: কে চিত্রিত করত। অবশ্য মহানবী সম্পর্কে বিশ্বের মুসলিমগত যত পুস্তক রচনা করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী রচনা করেছেন খৃষ্টানরা। খ্রিষ্টান লেখকদের কয়েকজন মহানবী সা: সম্মন্ধে যেসব প্রশান্তিমুলক বাক্য লিখেছেন তার খবর আমরা খুব কমই জানি।

বহু আমেরিকান নাগরিকের মহানবী সা: সম্পর্কে ধারনা ঐরুপ যেমন আমাদের ধারনা শিব এবং শ্রীকৃষ্ণ সম্মন্ধে।(নাউজুবিল্লাহ্‌)।যদিও পাশ্চাত্যবাসীরা আমাদের মহানবী সম্মন্ধে এতসব অকল্পনীয় মিথ্যার অবতারনা করে থাকে।কিন্তু কোন হযরত ঈসা আ: হযরত মরিয়ম সম্মন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষন করেন না। বরং তা ঈমান পরিপন্থী বলে বিশ্বাস রাখে।অথচ পাশ্চাত্য লেখকরা আমাদের মহানবী সা: এবং তাঁর পরিবার সম্মন্ধে হাজার নয় লক্ষ লক্ষ অপবাদমুলক পৃষ্ঠা রচনা করেছেন। যাদেরকে জনগন শ্রদ্ধা ও সম্মানের সহিত দেখে তাদের সম্মান সংরক্ষনের জন্য পাশ্চাত্য দেশসমুহে ব্লেসফেমী আইন প্রণীত আছে।এ ব্লেসফেমী আইনের আওতায় রাজপরিবারের সদস্যও পড়ে।ধরুন যুক্তরাজ্যে কেউ এমন পুস্তক রচনা্ করলো যাতে রাজকন্যা এনি,মারগারেট, রাজকুমারী এ্যানী, ডায়ানাকে বেশ্যা হিসাবে চিত্রিত করা হয় এবং রানী এলিজাবেতকে চিহ্নিত করা হয় বেশ্যার সরদারনী হিসেবে। এ ধরনের লেখক এবং প্রকাশকের শাস্তি হবে ব্রিটেনে ব্লেসফেমী আইনে। সেখানের লেখকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবেনা।মুসলিম দেশে কোন লেখক যদি এ ধরনের পুস্তক রচনা করে সে দেশের সংগে যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে।সালমান রুশদীর লেখায় বিশ্ব মুসলমানের হৃয়ানুভুতি যতই আহত হউক না কেন স্যাটানিক ভার্সেস জাতীয় পুস্তকের লেখকগন পাশ্চাত্য দুনিয়ায় তাদের পবিত্র মানবাধিকার ভোগ করবে, তারা দুনিয়ার ইতিহাস , ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিত্ব সম্মন্ধে কুৎসামুলক যত প্রবন্ধই রচনা করুকনা কেন।

উসামা বিন লাদেন কেনিয়ায় মার্কিন দুতাবাস আত্রমন করেছে। বা লিবিয়ার নাগরিক স্কটলেন্ডের লকারবীতে পানাম বিমান উড়িয়ে দিয়েছে…….. এর কোন প্রত্যক্ষ প্রমান নেই।আছে কেবল সন্দেহ। এজন্য যুক্তরাজ্য লিবিয়ার বিরুদ্ধে একযুগব্যাপী অর্থনৈতিক ,বানিজ্যিক এমবার্গো এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।উসামা বিন লাদেনের আশ্রয়কারী দেশ আফগানীস্থানের বিরুদ্ধে ঐ একই এমবার্গো জারি করা হয়েছে।সালমান রাশদী যে স্যাটানিক ভার্সেস লিখেছে, এটি সন্দেহ নয় বাস্তব।কোনো মুসলিম দেশকি সালমান রুশদীর অভিভাবক কোনো দেশের বিরুদ্ধে এমবার্গো বা বানিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে?অন্য কোন মুসলিম রাস্ট্র কি তা করেছে?হতে পারে মুসলিম রাস্ট্র প্রধান গন যুক্তরাস্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের নিরাপদ আশ্রয় ও ভিক্ষা বন্ধের ভয়ে ভীত। কিন্তু মুসলিম রাস্ট্রের কতজন শায়খ, মুফতি অথবা উলেমা মজলিস কি এরকম কোন ফতোয়া জারি করেছেন।

পাশ্চাত্য দুণিয়ার মুসলিম নাগরিক এবং রাস্ট্রপ্রধানগন সালমান রুশদীকে একজন মানুষ মনে করে তার মানবাধিকার আছে।একজন ইসলাম বিদ্দেষী মানুষের মানবাধিকার প্রশ্নে তারা এত সচেতন কিন্তু বিশ্বের ১২০ কোটি মুসলমান কি তাদের নবী সা: এবং নবীর পত্নীদের বেইজ্জতিতে ব্যথা বিধুর এবং সচেতন?পাশ্চাত্য দুনিয়ার মানুষ মানবাধিকার সম্মন্ধে সচেতন। তারা বিশ্বের ১২০ মুসলিম মানুষকে মানুষ মনে করে যে, তাদের আবেগ অনুভুতি এবং তাদের মান ইজ্জতের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভুতিশীল? তাদের দৃষ্টিতে একজন সালমান রুশদি ১২০ কোটি মুসলমান অপেক্ষা অধিকতর মার্যাদার অধিকারী। লক্ষ কোটি হাঁস মুরগীর অধিকারের তুলনায় একজন মানুষের মুল্য অবশ্য্ই বেশী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •