শিপন পাল


গীতায় বর্ণিত আছে, “সত্ত্বঃগুণ রজঃ ও তমোঃগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয়, রজোগুণ তমঃ ও সত্ত্বগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয় এবং তমোগুণ রজঃ ও সত্ত্বঃগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয়। বিবেকভ্রংশ, নিরুদ্যমতা, কর্তব্যের বিস্মরণ এবং মোহ বা বুদ্ধি বিপর্যয়Ñএই সকল লক্ষণ উৎপন্ন হয় তমোগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে।
আমাদের মধ্যে ঠিক সেই রকমটাই হয়েছে, যা সম্পূর্ণ তমোগুণের প্রভাব। বিগত বৎসরগুলোর দুর্গাপূজার যে নিয়মটা চালু হয়েছে তাতে মনে হয় করোনাকালেই হবে সাত্ত্বিক দুর্গাপূজা। এই জন্য দুর্গাপূজাকে সাত্ত্বিকতার রূপ দিতে করোনা আমাদের জন্য আর্শীবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অতীতে পূজামন্ডপগুলোতে আতসবাজি ও ফটকাবাজি ব্যবহার, রিমিক্স/ডিজে গানের ছড়াছড়ি, সাউন্ডের উচ্চশব্দ, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা লক্ষ্যনীয় ছিল। পূজারীর চেয়ে ডিজে/রিমিক্স/নোংরা গান পছন্দকারী গুটিকয়েক উৎশৃংখল দুর্বৃত্তদের লক্ষ্যনীয় ছিল প্রচুর। এগুলো কোনটাই দুর্গাপূজার অংশ নয়। গুটি কয়েক দুর্বৃত্তদের কারণে দুর্গাপূজা, দুর্গা উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই অনিয়মটি যেন আস্তে আস্তে নিয়মে ধাবিত হচ্ছিল। সনাতনী সম্প্রদায়ের অনেকেই দুর্গাপূজার পরিবর্তে দুর্গা উৎসবগুলো বন্ধ করার পক্ষেই ছিল। কিন্তু বাঁধ সাজে ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা পড়াবে কে?’।

ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস; করোনাকাল দুর্গাউৎসবের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এটা অবশ্যই জগৎ জননী, মহামাতৃকা, সর্বব্যাপিণী, সর্বস্বরূপিণী দেবী মাতার আর্শিবাদ। করোনাকালে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইতিমধ্যে পুজোকালীন সময়ে করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্্যাপন পরিষদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে পুজো সীমিত করার জন্য, আতসবাজি ও ফটকাবাজি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য, রিমিক্স/ডিজে গানের ছড়াছড়ি বন্ধ করে ঢাক-ঢোল-কাসা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য, সাউন্ডের উচ্চশব্দ, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা না করে সাত্ত্বিক পুজো করার জন্য।

আমাদের বিবেকভ্রংশ হচ্ছে, নিরুদ্যমতা বেড়ে চলছে, কর্তব্যের বিস্মরণ হচ্ছে এবং মোহ বা বুদ্ধি বিপর্যয় হচ্ছে তমোগুণের প্রভাবে। এজন্য আমারা দুর্গাপূজাকে দুর্গাউৎসবে পরিণত করে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছি। আমাদের উচিৎ দ্বিতীয় কোন পক্ষ আমাদের দোষ বা ত্রুটি না ধরার আগে সংশোধন হওয়া। যাতে করে আমাদের পূজোয় কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে। পরে গিয়ে আমাদের যাতে প্রতিবাদ করতে না হয়। তাই; আমাদের উচিৎ করোনাকালকে সামনে রেখে সাত্ত্বিক পূজোর প্রতি ধাবিত হওয়া। তমোগুণের প্রভাবে উৎশৃংখল উৎসবে সামিল না হয়ে সাত্ত্বিক পুজোর প্রতি মনোনিবেশ করা।

কিছু কাজ থাকে নির্র্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই করতেই হবে। তাই করোনাকালকে সামনে রেখে আমাদের উচিৎ দুর্গাপুজোর নামে দুর্গাউৎসবকে ঢেলে সাজানো। অপ-সংস্কৃতি যেন আর বাড়তে না দেয়া হয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের মাধ্যমে এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট পূজা মন্ডপে কিছু পরিমাণ অনুদান দেয়া হয় প্রতি বৎসব। উৎশৃংখল এবং দুর্গাপূজার সাত্ত্বিকতাকে যারা ব্যাহত করছে এবং যারা দুর্গাপূজাকে দুর্গাউৎসবে পরিণত করছে তাদের যেন যেকোন ধরণের ত্রাণ/অনুদান থেকে বিরত রাখা হয়। প্রয়োজনে সকল সংগঠন মিলে এবং প্রত্যেক সমাজ কমিটির মাধ্যমে এসব উৎসবগুলো যাতে ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠতে না পারে সেজন্য কঠোর হস্তে দমন করা হয়। প্রয়োজনে এসব উৎসবগুলো যেনো করার অনুমতি না পায় সেই ব্যবস্থাই করতে হবে।

সবচেয়ে বেশি ভাল হয় দ্বিতীয় কোন পক্ষ আমাদের উপর হস্তক্ষেপ না করার আগে যদি সংশোধন হই। যদি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করা হয় তবে এর দায় সকলের উপর পড়বে। আর সেক্ষেত্রে আমাদের সকলেরই খারাপ লাগবে এবং মনে হবে আমাদের উপর অনধিকার চর্চা করা হচ্ছে। তাই; সনাতনী সম্প্রদায়ের সকল অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের কাছে অনুরোধ পুজোর সাত্ত্বিকতা বজায় রাখার স্বার্থে করোনাকালকে আশীর্বাদ মনে করে সঠিক নিয়ম-নীতি অব্যাহত রাখার যেন পদক্ষেপ নেয়া হয়।

স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। তাই করোনকালে স্বাস্থ্য ঠিক রেখেই পুজো-অর্চনা করতে হবে। তাই; আমাদেরকে মন্দির/পুজা মণ্ডপে উপস্থিত সকলকে জীবানুমুক্ত থাকতে হবে, ভক্ত, পুরোহিত ও সকল দর্শনাথীকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে হবে, আতসবাজি ও পটকাবাজি ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে, রিমিক্স সংগীত থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকে ভক্তিমূলক সংগীতে ফিরে আসতে হবে, অতিরিক্ত সাউন্ড এবং মাইক যাতে পুজোর আরধনার ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে, সাত্ত্বিক পুজোর ব্যবস্থা করতে হবে, সন্ধ্যা আরতি সঠিকভাবে পালন করতে হবে, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুজো সাত্ত্বিকতার সাথে করা হচ্ছে কিনা তার জন্য জেলা ভিত্তিক একটি যেন মনিটরিং সেল গঠন করা হয়।

পরিশেষে জগৎ জননীর কাছে প্রার্থনা করছি যেন; তিঁনি সর্বভূতে বিরাজ করে আমাদের মধ্যে চেতনা, বুদ্ধি, শক্তি, লজ্জা, শান্তি, শ্রদ্ধা, দয়া ও মাতৃরূপে স্থিত থাকে। মহামাতৃকা, সর্বব্যাপিণী, সর্বস্বরূপিণী মায়ের কাছে এবারের পুজো যাতে সাত্ত্বিকতার সাথে পালন করার শক্তি দেন তার জন্য প্রার্থনা করছি এবং সকলকে শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

লেখকঃ সাংবাদিক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •