শাহিদ মোস্তফা শাহিদ:
টানা দশ দিনেও রহস্যের জট খুলেনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার পাহাড়ি জনপদ ঈদগড়ের সন্তান চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের তরুণ শিল্পী জনি দে রাজ ও দিনমজুর মোহাম্মদ কালু খুনের ঘটনা। আটক হয়নি কোন আসামী, উদ্ধার হয়নি ডাকাত দলের ব্যবহৃত কোন অস্ত্র। এ নিয়ে খুনের শিকার পরিবার, আত্মীয় স্বজন,শুভাকাঙ্ক্ষী, ভক্ত, অনুরাগী, বন্ধু বান্ধব, শিল্পীসহ সর্বস্তরের জনগণের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। জনি দে রাজ ও মোহাম্মদ কালুর হত্যার ন্যায় বিচার নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয় । ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও কোন ধরনের ক্লো উদঘাটন করতে না পারায় হতাশা বিরাজ করছে সর্বমহলে। আদৌ আসামি আটক কিংবা অস্ত্র উদ্ধার হবে কিনা তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে বিরাজ করছে হতাশা । পুরো চট্টগ্রাম কক্সবাজারে অব্যাহত রয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশ,মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা। ঈদগড়ে পালিত হয়েছে সকাল সন্ধ্যা হরতাল। এতকিছুর পরও কেন জড়িতদের ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন প্রশ্ন করেন এলাকবাসী৷ এদিকে পুত্র শোকে বার বার অজ্ঞান হয়ে পড়ছে জনি দে রাজের বাবা-মা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেকে হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছে জনির পরিবার। অপরদিকে দিন মজুর মোহাম্মদ কালুকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার ছেলে সন্তান ও পরিবার। সরেজমিনে ঈদগড় গিয়ে জনি দে রাজের ভক্তদের সাথে কথা বললে তারা জানান, জনি দে ছেলে হিসেবে অত্যন্ত ভদ্র, নম্র। কারো সাথে কোনদিন খারাপ আচরণ কিংবা তর্ক করেছে বলে আমাদের জানা নেই। সে সনাতন সম্প্রদায়ের ছেলে হলেও সকল ধর্মের মানুষের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালবাসা, সম্মান, সৌহার্দ্য , স্নেহাশিস।সবার সাথে মিলেমিশে থাকত জনিসহ তার পরিবার। এলাকাবাসী জানায়, টানা দশ দিনেও রহস্যের জট না খোলা এবং কোন ধরনের ক্লো উদঘাটন না হওয়া কিসের লক্ষণ তা বুঝে উঠতে পারছে না। একই কথা জানালেন স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আলমগীরও। সূত্রে জানা যায়,পাহাড়ি জনপদ রামু উপজেলা ঈদগড়, গর্জনিয়া, জোয়ারিয়ানালা, কচ্ছপিয়া,রশিদ নগর,পার্বত্য জেলা বান্দরবানের বাইশারী ইউনিয়নের বিস্তৃত জনপদে রয়েছে বন বিভাগের হাজার হাজার হেক্টর পাহাড়ি বনাঞ্চল। রয়েছে বিশালকার ৩/৪ শতাধিক পাহাড়। নিরাপদ জোন হিসেবে এই পাহাড়ি জনপদ ও জঙ্গলকে বেচে নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা পাহাড়ে আস্তানা গড়ে তুলে সড়কে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, অস্ত্রের কারখানা তৈরী করে পুরো চট্টগ্রামসহ দেশে পাচার করত। গত বছর দুয়েক আগে পাহাড়ের স্ব ঘোষিত রাজা আনাইয়া ডাকাতসহ তার আরো ২ সহযোগী গণপিটুনিতে মারা গেলে অনেকটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ডাকাতি ও অপহরণ। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা পুলিশের বড় ধরনের রদবদল আনা হলে সুযোগ বুঝে আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠে। গত ৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ ডাকাত চক্রটি ঈদগাঁও ঈদগড় সড়কে যানবাহন ডাকাতি করে আসছিল। সর্বশেষ শিল্পী জনি দে রাজ ও দিনমজুর মোহাম্মদ কালুকে খুন করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রামসহ পুরো কক্সবাজারের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। জনি দে রাজ খুনের ঘটনায় করা মামলার সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করলেও কাউকে আটক করতে না পারায় এক ধরনের ব্যর্থতাও বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা আরো বলেন, এতো বড় বিস্তৃত জনপদের পাহাড় থেকে ডাকাত ধরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তার মধ্যে পুলিশের সদস্যরা সবাই নতুন। এখনো তারা অনেক কিছু চিনে না। সেক্ষেত্রে এলাকার সচেতন নাগরিক, জনপ্রতিনিধি, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ডাকাত দলের সদস্যদের সহযোগিতায় পাহাড়ে অভিযান চালালে অনেকটা সুফল আসত বলে মনে করেন তারা। এলাকাবাসী আরো জানান, রামু উপজেলার ঈদগড়ের কলিম উল্লাহ ডাকাত, রশিদ নগরের আবদু রহমান প্রকাশ ডাকাত কানাইয়া, হেলাল প্রকাশ চিকইন্না ডাকাত, ইসলামাবাদ ইউনিয়নের গজালিয়ার তারেক, শফিদের ধৃত করলে জনি দে রাজ ও দিনমজুর মোহাম্মদ কালু হত্যার রহস্য বের হতে পারে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা বরাবরই বলে আসছে তারা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের ধরতে কাজ করছে। ঈদগড়ের বাসিন্দা আবুল কাসেম, ফজলুল হক, আবদু মালেকসহ অনেকেই জানান, যে সড়কে ডাকাতের গুলিতে স্বয়ং পুলিশ সদস্য মারা গেলেও অধ্যবধী কোন আসামী আটক করতে পারেনি, সেক্ষেত্রে জনি দে রাজ ও দিনমজুর মোহাম্মদ কালুর খুনের ঘটনাটি কেমন হবে তা বোধগম্য নয়। তারা মামলাটি র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিববিআই)কে দিয়ে তদন্ত করলে খুব সহজে ক্লো উদঘাটন সম্ভব হবে বলে মনে করেন তারা।কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন সংস্থা গুলোর সদস্যরা কক্সবাজারের জন্য পুরাতন। তারা অনেক কিছু চেনে, এবং জানে। পুরাতন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছে, পাহাড়ের এ ডাকাত গুলোকে আটক করতে হলে প্রথমে ড্রোন ব্যবহার করতে হবে, তাও কাজ না হলে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে শনাক্ত করতে হবে, সকাল ৮ টা থেকে রাত পর্যন্ত সড়কে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করতে হবে, স্থায়ী একটি পুলিশ ক্যাম্প অথবা বিজিবি, এপিবিএনের ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে৷ পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অঞ্চলে অগণিত পাহাড় রয়েছে, সাথে হরেক প্রজাতির প্রাণী, গাছগাছালিও আছে। এসবের ক্ষতি না করে প্রতি বছর বছর পাহাড় গুলো পরিষ্কার, গাছের ডালপালা কেটে পেললে ডাকাত দলের আস্তানা সহজেই দেখা যাবে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন তারা।
উল্লেখ্য, গত ৮ অক্টোবর ভোরে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা আজমীর মঞ্জিলের মাজারে গান করে ভোর ৪ টার দিকে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস যোগে ঈদগাঁও বাসস্ট্যান্ডে নামেন জনপ্রিয় আঞ্চলিক গানের শিল্পী জনি দে রাজ ও তার বাবা তপন দে। সকাল ৮ টার দিকে বাসস্ট্যান্ড থেকে জনি দে রাজসহ আরো পাঁচজন নারী পুরুষ মিলে ঈদগড়ের সিএনজি যোগে বাড়ি ফেরার পথে হিমছড়ি ঢালা নামক স্থানে পৌছলে ডাকাতদল সংকেত দিয়ে গাড়ীটি থামানোর চেষ্টা করে।এসময় ডাকাত দলের সদস্যরা চলন্ত অবস্থায় গাড়ি চালককে লক্ষ করে এক রাউন্ড গুলি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে উপর্যপুরী কোপাতে থাকে। সে সময় ধারালো কুড়ালের কোপটি শিল্পী জনি দে রাজের চোখের উপর কপালে পড়লে ঘটনাস্থলের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে দ্রুত ঈদগাঁওস্থ একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই সাথে আহত হওয়া দিনমজুর মোহাম্মদ কালুকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে অবস্থা আশংকাজনক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুইদিন পর মৃত্যু বরণ করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •