খোরশেদ আলম


পূর্বে প্রকাশের পর…

(যাদের বয়স বেঁচে থাকলে নব্বই এর  কাছাকাছি হত, যাদের অবদান আছে কক্সবাজার শহরে এবং তাদের সন্তানদের অবদান আছে তাদের সম্পকে এ আলোকপাত)

আমি আমার পূর্ব পুরুষদের কথা বলছি

১। এডভোকেট নজীর আহমদ :  সেই সময়ের স্বনামধন্য আইনজীবী ও বিদ্যুৎসাহী ব্যাক্তি। হাসপাতাল সড়কে তার নিজ বাড়ী। তাঁর ছেলে এডভোকেট শাহনেওয়াজ আহমদ জাহাংগীর একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তি । তিনি কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন । পরে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে আইন পেশায় জীবন অতিবাহিত করেন । তিনি কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি’র দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ।
২। বিপিন বিহারী রক্ষিত : তিনি রায় বাহাদুর শ্রী বিপীন বিহারী রক্ষিত। লেখাপড়া এম.এ বি.এল । তিনি কক্সবাজার পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ।
পৌরসভা স্থাপিত হয় ১লা এপ্রিল, ১৮৬৯ সালে। বর্তমানে বইয়ের দোকান রক্ষিত মার্কেটসহ আশেপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে তাঁর বাড়ী। তাঁর স্ত্রীর নাম জানকী বালা রক্ষিত । এক ছেলে মৃত সুধীর রক্ষিত ও নাতী উৎপল রক্ষিত চন্দনাইশে বসবাস করছে।  অন্য ছেলেমেয়ের বংশধরগণ চট্টগ্রাম ও দেশের বাইরে বসবাস করছে । রাজনীতিবিদ, নাট্য ও সংস্কৃতি ব্যাক্তিত্ব এডভোকেট তাপস রক্ষিতও এ বংশের উত্তরাধিকার।

৩। এডভোকেট জ্ঞানেন্দ্র লাল চৌধুরী : তিনি আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। প্রধান সড়কের আনন্দ ভবন তাঁর নিবাস। তিনি বিদ্যুৎশাহী ব্যক্তি, সংস্কৃতিবান ও নাট্য অভিনেতা ছিলেন। কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে পাকিস্তানীরা হত্যা করে । তার ছেলে এডভোকেট পীযুষ চৌধুরী স্বনামধন্য আইনজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক  ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতা ।

৪। আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান : তিনি এমন একজন সফল ব্যবসায়ী যিনি হ্যাচারী, কৃষি শিল্প , লবণ শিল্প, মৎস্য খামার ইত্যাদি প্রতিস্টার মাধ্যমে
কক্সবাজারের আগামী প্রজন্মের কাছে ব্যবসা ও বানিজ্যের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃস্টান্ত হয়ে আছেন। কক্সবাজার সদরের পুর্ব গোমাতলী, পোকখালী
ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি মেডিকেল কলেজের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ১৯৬১ সালে সাবেক মহিলা এমপি ছালেহা বেগমকে বিয়ে করেন। তিনি ১৯৬৫ সাল থেকে শুরু করে প্রথমে টেকপাড়ার তারাবানিয়ারছড়া ও পরে বাহারছড়ার সার্কিট হাউস রোডে স্হায়ীভাবে বসবাস শুরু করে । তার চার ছেলের মধ্যে প্রথম ছেলে লুৎফুর রহমান কাজল সাবেক সাংসদ ও নিরিবিলি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অন্যরা উক্ত গ্রুপের পরিচালক।
একমাত্র মেয়ে গৃহিণী ও মেয়ে জামাই ইন্জিনিয়ার সুজাউল আলম প্রতিস্টিত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান হোটেল নিরিবিলি
ও নিরিবিলি গ্রুপ প্রতিস্টা করে ব্যবসা শুরু করে। উল্লেখযোগ্য ব্যবসা’র মধ্যে অন্যতম লবণ শিল্প, কৃষি ও মৎস্য খামার, হ্যাচারী ও নার্সারী
শিল্প, ফিস ফিড মিলস, ফিস কালচার, এগ্রো কমপ্লেক্স, পোলট্রি ও লাইভস্টক শিল্প প্রতিস্টা, নিরিবিলি অরণ্য প্রতিস্টা করে অনন্য প্রতিভার
স্বাক্ষর রাখেন। বর্তমান প্রজন্ম এই গুনীব্যাক্তির চ্যালেঞ্জিং জীবন থেকে অনেককিছু নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে ।

৫। প্রফেসর মমতাজ উদ্দিন : তিনিও বাহারছড়ার স্হায়ী বাসিন্দা ও উচ্চ শিক্ষিত ভদ্র এবং ভালো মানুষ হিসেবে কক্সবাজারে পরিচিত।
তাকে মমতাজ স্যার হিসাবে সবাই চিনে ও সমীহ করে । তিনি কক্সবাজার সরকারী কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসাবে চাকুরী জীবন সাফল্যের সহিত শেষ করে অবসর গ্রহণ করে। তিনি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে । তিনি আমারও শিক্ষক এবং আত্নীয়তার সম্পর্কে ফুফা। তাঁর তিন ছেলে ও এক মেয়ে ।
বড় ছেলে জাহাঙ্গীর হাসান খুবই মেধাবী, সে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি’তে Stand করে । সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে সাফল্যের সহিত মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে এবং পরবর্তীতে দুটি বিদেশী ব্যাংক গ্রীন্ডলেজ এবং স্টান্ডার্ট চার্টার্ড ব্যাংকে দীর্ঘদিন সাফল্যের সহিত চাকুরী করে । অন্য দুই ছেলে জার্মানীতে স্হায়ীভাবে বসবাস করছে ।

০৫। নজির আহমদ : তিনি বাহারছড়া’র স্হায়ী বাসিন্দা । পেশায় সরকারী অফিসের কর্মকর্তা এবং সমাজে একজন ভাল মানুষ হিসাবে সুপরিচিত ছিল। তাঁর নয় ছেলে দুই মেয়ে । সবাই উচ্চ শিক্ষিত । তন্মধ্যে এডভোকেট ছালামতউল্লাহ , জাফর আলম, ডাঃ মাহমুদুর রহমান, বদিউল আলম, আহমদুল্লাহ ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নাম উল্লেখযোগ্য । দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তার দুই ছেলে ডাঃ মাহবুবুর রহমান ও বদিউল আলম সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসাবে অসীম বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করে দেশের মানুষকে স্বাধীনতার পতাকা উপহার দেয় । তাঁর ছেলে সদ্য মরহুম জাফর আলম একজন উচু মানের ও সুপরিচিত সাংবাদিক, অনুবাদক ও কবি । তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২৯ টির মত। বহু বিদেশী কবি, লেখকের বই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে আমাদের সাহিত্য তার হাতে সমৃদ্ধ হয় ।  ছোট সন্তান আবদুল্লা আল মামুন খুবই মেধাবী । সে
অস্ট্রেলিয়া থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করে এবং অস্ট্রেলিয়া’র সিডনি শহরে স্হায়ীভাবে বসবাস করছে । পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। অস্ট্রেলিয়াতে মামুন Ministry of Municipality and Environment -এ কাজ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের কাতারেও দীর্ঘদিন Public Work Authority ‘তে চাকুরীরত ছিল । সে ব্যান্ডদল সোলস’স এর প্রতিস্টাকালীন সদস্য এবং তার লেখা গান ” তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে ” , ” মুখরিত জীবনের চলার পথে ” বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে । সে আমার হাইস্কুল জীবনের বন্ধু ।
৬। জয়নাল আবেদীন : তিনি দীর্ঘদিন পুবালী ব্যাংকের ম্যানেজার ছিল । তিনি বাহারছড়া’র স্হায়ী অধিবাসী একজন উচ্চ শিক্ষিত লোক । চাকুরীর পাশাপাশি একজন ভাল ফুটবল প্লেয়ার তিনি দীর্ঘদিন কক্সবাজার স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলায় রেফারী হিসাবে সুনামের সহিত অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন ।
৭। আবদুল জলিল সওদাগর : তিনি বাহাছড়ার অধিবাসী জলু সওদাগর নামে সমধিক পরিচিত একজন সফল ব্যবসায়ী । তিনি বাহারছড়া সমাজ কমিটির প্রথম প্রতিস্টাতা সভাপতি । তিনি সততা, নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সাথে বাহারছড়া সমাজ কমিটি ও মসজিদ কমিটির অর্পিত দায়িত্ব সততার সহিত পালন করে যেজন্য সুনাম আছে ।
৮। নুর আহমদ মিয়া :  তিনি মধ্য বাহারছড়ার অধিবাসী । কক্সবাজার আওয়ামী লীগের প্রতিস্টাতা সদস্য ও আওয়ামী লীগের নিবেদিত
প্রাণ । তখনকার সময়ে কক্সবাজার পৌরসভার মেম্বার থাকাকালীন সময়ে অনেক জনহিতকর কাজ করেন ।
৯। ছালাম মিয়া  : ষাটের দশকের পর থেকে তিনি কক্সবাজার মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন সময় পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন । ইংরেজী সাহিত্যে লেটার মার্কস নিয়ে কৃতিত্বের সহিত রামু খিজারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রিত কক্সবাজার এয়ারপোর্ট, চকরিয়া এয়ারপোর্টসহ অন্যন্যা এয়ারপোর্টের সিভিল অফিসে চাকুরী করেন । তিনি পারিবারিক জীবনে নিঃসন্তান । তার কাছে ভাইয়ের সন্তানগণ নিজ সন্তানের মত ছিল। তারা হলেন কামরুল ইসলাম কাজল, সিরাজুল ইসলাম বাদল ও আযাদ ।
১০। সুলতান আহমদ : তিনি সুলতান মিয়া নামে পরিচিত ছিল। তিনি বাহারছড়ার স্হায়ী বাসিন্দা । পেশায় একজন তহশিলদার । তিনি শিক্ষানুরাগী একজন সফল সু-সন্তানের পিতা । তাঁর তিন ছেলের মধ্যে বড় সন্তান ডাঃ সরওয়ার হাসান, এডভোকেট কামরুল হাসান ও ডাঃ রফিকুল হাসান । তার বড় মেয়ের জামাই কক্সবাজার কলেজের  প্রিন্সিপাল মরহুম জি. এম. সলিমুল্লাহ ।
১১। আবুল বশর ড্রাইভার  : তিনিও বাহারছড়ার বাসিন্দা ।  তিনি বশর ড্রাইভার নামে পরিচিত । বঙ্গবন্ধু যখন আগরতলা মামলায় , নিরাপদ শহর কক্সবাজারে চলে আসেন। তখন এই বশর ড্রাইভার অসীম সাহসিকতার সহিত বঙ্গবন্ধুকে গাড়ী চালিয়ে ইনানী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। তার ছেলে দিল মোহাম্মদ কংফু- কারাতে অর্থাৎ মার্শাল আর্টে একজন স্বীকৃত ইয়াং গ্রান্ডমাস্টার ও বাংলাদেশ উসু ফাউন্ডেশনের ডাইরেক্টর এবং
চীনে অনুষ্ঠিত ১৬ তম এশিয়ান গেমসে উষু ক্রীড়াবিদ হিসাবে বাংলাদেশ দলের সদস্য হিসাবে যোগদান করে সুনাম অর্জন করে ।
১২। মৌলভী সুলতান আহমদ : মৌলাভী সুলতান আহমদ বাহাছড়ার স্হায়ী বাসিন্দা । তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পৌর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী ছিল। তিনি তখন মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম কমিটিরও সদস্য। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন কক্সবাজার পালিয়ে আসে তখন বঙ্গবন্ধুকে ইনানীতে নিয়ে যাওয়ার সাথী হয়ে ইতিহাসে তাঁর নাম লিখে যান। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কক্সবাজারের প্রায় সকল নেতৃবৃন্দ বার্মায় চলে যায় । তখন মৌলভী সুলতান আহমদ শহরের গোপন আস্তানায় থেকে কক্সবাজার আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
তখন উখিয়া ঘাট হতে বীর মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলম চৌধুরীর নিকট থেকে বুঝে নিয়ে ০৯/০৪/১৯৭১ ইংরেজী তারিখ সুলতান মৌলভী অসীম সাহসের সহিত অস্ত্র বোঝাই সাত ট্রাক যুদ্ধাস্ত্র চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের হাতে পৌঁছে দেন। তিনি জয়বাংলা বাহিনীরও উপদেষ্টা ছিলেন।
তিনি বাহারছড়া সমাজ কমিটির সেক্রেটারী, নবজাগরণ সমিতির সহ-সভাপতি, বাহারছড়া মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি হিসাবেও দীর্ঘদিন
দায়িত্ব পালন করেন। এই সাহসী কাজের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসে নিজের নাম লিপিবদ্ধ করে রাখে ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •