জিয়াবুল আলম


আমরা জানি একটি সরকারের তিনটি অর্গান। যেমন আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগ। একটি আধুনিক সভ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনটি বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অপরসীম। কারণ একটি বিভাগ ছাড়া অন্যটি কখনো কল্পনা করা যায় না। তবে পৃথিবীতে যতগুলো কল্যান মূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তার পিছনে মূল লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে মানুষের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই স্বীকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আইন বিভাগ কখনো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা৷ তবে মানুষের অধিকার কি এই সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারে একমাত্র আইন বিভাগ। সেই বর্ণনাকৃত অধিকার সুপ্রতিষ্ঠা কিংবা বাস্তবে রুপ দিতে পারে আমাদের স্বাধীন বিচার বিভাগ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাধীন বিচার বিভাগ আবশ্যক। কারণ স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া কখনো রাষ্ট্রে শান্তি শৃঙ্খলা আনায়ন করা যায়না। এখানে আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে তিনটি বিষয়কে বুঝি। নিম্নলিখিত তিন ধরনের স্বাধীনতাকে অন্তর্ভূক্ত হবেঃ
(ক) বিচারকদের নৈতিক স্বাধীনতা (Substantive Independence of the Judges)
(খ) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (Personal Independence); এবং
(গ) সমষ্টিগত স্বাধীনতা (Collective Independence)

আন্তর্জাতিক বার এসােসিয়েশন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সর্বনিম্ন মান নির্ণয় করতে বলেন
“In the discharge of his judicial function a judge is subject to nothing.এখানে উপরোক্ত তিনটি স্বাধীনতা ব্যাখ্যা দেওয়া হল।যথা
(ক) বিচারকদের নৈতিক স্বাধীনতা অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করার মনােবলকে নৈতিক স্বাধীনতা বলা হয়।

(খ) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিচারকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলতে আইন ও শাসন বিভাগের সকল প্রকার হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকাকে বােঝায়। বিচারকদের কর্মের শর্তাবলী, বেতন ও সুবিধাদি কোন অবস্থাতেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

আন্তর্জাতিক বার এসােসিয়েশন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সর্বনিম্ন মানদন্ড নির্ণয় করতে গিয়ে বিচারকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেছেনঃ

“It means that the terms and conditions of judicial service are adequately secured so as to ensure that individual judges are not subject to executive control”.

(গ) সমষ্টিগত স্বাধীনতা ঃ
বিচারকদের সমষ্টিগত স্বাধীনতা কথাটি সর্ব প্রথম ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক বার এসােসিয়েশন কর্তৃক বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সর্বনিম্ন মানদন্ড তৈরী করার সময় ব্যবহৃত হয়। এরপর Montreal Declaration 1983 ও বিভিন্ন কনফারেন্সে সমষ্টিগত স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সমষ্টিগত স্বাধীনতা বলতে সমগ্র বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক তথা প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতাকে বােঝায়। অর্থাৎ বিচার বিভাগের সকল ব্যবস্থাপনা, কর্মচারীদের নিয়ােগ, সুবিধা ও অপসারণ সংক্রান্ত যাবতীয় শর্তাবলী, বার্ষিক বাজেট সব কিছুর উপরে উক্ত বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। নির্বাহী বিভাগ যেন বিচার বিভাগের কোন ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ খাটাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক সময় সরকার সরাসরি বিচারকার্যে হস্তক্ষেপ করতে না পেরে বিচার বিভাগের কর্মচারীদের ও বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে।
একটি রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের মধ্যে উপরোক্ত বিষয়গুলো যখন বিদ্যামান থাকবে তখন বিচার বিভাগে অয়িস্ত সংকট নয় বলে ধরে নেওয়া হবে।
যাইহোক আমি লেখাটি এই জন্য লেখলাম। সম্প্রতিক দেশে ব্যাপক হারে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যু দন্ড। এই ভাবে আইনে একমাত্র শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া মানে বিচারকদের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতাকে খর্ব করা।কারণ বিচারক তার বিচার কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে মানব কল্যানে তার ব্যাক্তিগত চিন্তা চেতনা থাকতে পারে। কারণ একজন বিজ্ঞ বিচারক তার স্বাভাবিক বিচার কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে সাক্ষ্য, জেরা, যুক্তিতর্ক আইনে বর্ণিত সাপোটিভ দলিলাদি পর্যবেক্ষণ করে রায় প্রধান করে থাকেন। যদি অপরাধ সন্দহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়, তখন বিজ্ঞ বিচারক আইনে বর্ণিত শাস্তি প্রধান করে। তবে অপরাধের ন্যাচার অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করে থাকেন। উদাহারণস্বরুপ মনে করি একটি হত্যা মামলায় কোন আসামীকে অভিযুক্ত করা হল, মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা গেলা মামলা আসলে culpable homicide। এই ক্ষেত্র বিজ্ঞ আদালত দন্ড বিধির ৩০২ ধারায় শাস্তি প্রধান না করে, ৩০৪ ধারায় শাস্তি প্রধান করে থাকেন। কারণ যদিও অভিযোগ গুরুতর কিন্ত মামলার স্বাভাবিক চূড়ান্ত পর্যায়ে বিচারক বুঝতে পারলেন হত্যা মামলার আসামী হত্যায় অভিযুক্ত নয় কিন্ত কালপেবল হোমোসাইড নামক অপরাধ সংঘটিত করেছে।এই ক্ষেত্রে শাস্তি ১৮৬০ সালের ৩০২ এর পরিবর্তে ৩০৪ হয়।যদি এই বিকল্প বিধান না থাকলে তখন বিচারকে আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ৩০২ এর শাস্তি প্রধান করতে হত।এই ক্ষেত্রে বিচারকের চিন্তা চেতনা উন্মেষ হতনা। তখন সাংবিধানের বর্ণিত আইনের চোখে সমান এবং বিচারকের চিন্তা ও বিবেকের স্বধীনতা লঙ্গিত হত। একজন বিচারক তার বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক স্বাধীনভাবে সম্পাদন করাই একমাত্র লক্ষ্য। এর বিপরীত কেউ যদি কোন মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করা হলে আমাদের সাংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ক এবং ৯৪( ৪)সমর্থন করেনা।

উপরোক্ত উদাহারন এই জন্য দিলাম অনেক সময় ধর্ষণ মামলায় সাক্ষী প্রমাণে দূর্বলতা থাকার কারণে সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে আইনে বর্ণিত লঘু দন্ড হতে পারে। এই ক্ষেত্রে যদি ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যু দন্ড হয়ে থাকে তাহলে বিচারক তার নিজ বিবেচনার শাস্তি প্রধান করতে পারেনা। তাকে তখন একমাত্র শাস্তি মৃত্যু দন্ড দিতে হয় বা হত। যার ফলে স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের ণীতি বাধা হতে পারে। কারণ এই ক্ষেত্রে এই লেখার বর্ণিত বিচারকের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা ব্যাহত হতে পারে।
তাছাড়া আইন করে অপরাধ দমন করা যায়না। কারণ আজকের যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সালে। তার আগের দন্ড বিধি ১৮৬০ সালের ৩৭৬ ধারায় ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবৎজীব্বন বা ১০ বৎসর নির্ধারিত ছিল। প্রায় ১০০ বৎসর পর সরকার ধর্ষণ নামক ঘৃণিত অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন -১৯৯৫ পাশ করেন। প্রায় ৫ বৎসর পর আইনটি বাতিল করে ২০০০ সালে আবার তৎ সম্পর্কিত নতুন আইন পাশ করেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পূর্বে চেয়ে ধর্ষণ বন্হ গুণ বেড়ে গেছে। তাই বলতে গেলে বলতে হয় আইন পাশ করেও ধর্ষণ বন্ধ করা যায়নি।
যাইহোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনে হয় সংবিধানের বর্ণিত অনুচ্ছেদ ২১, ২৭,২৮,৩১,৩৬ অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়তো বা ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যু দন্ড বিধান করতে যাচ্ছে। তবে আমাদের প্রচলিত আইনে কিছু দুর্বলতার কারণে অনেক সময় ভিকটিম ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।এই প্রসঙ্গে আমার কিছু পরামর্শ হচ্ছে,
১ আমাদের সাক্ষ্য আইনের ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যখন বলাৎকার বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা। ধর্ষণের অভিযোগে সাধারণত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়।এই ক্ষেত্রে এই ধারার কারণে মামলার ভিকটিম ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ।
২।বর্তমান প্রস্তাবকৃত আইনে মৃত্যু দন্ডের পাশাপাশি লঘু দন্ডের বিধান রাখা।
৩।ধর্ষনে বিচার আলাদা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করা। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আছে। কিন্ত প্রকাশ্য ট্রাইব্যুনাল হওয়া কারণে ভিকটিমের গোপনীয়তা থাকেনা। ভিকটিমের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য একটি সংরক্ষিত স্হানে ট্রাইব্যুনালে ব্যাবস্হা করা। যদিও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে আদালত প্রকাশ্য হওয়ার কথা বলা আছে। তবে সংবিধানের ২৯ (৩)ও ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে বিশেষ বিধি বিধান পাশ করা যায়।
৪।যদি আসামীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দন্ড দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে দন্ড প্রাপ্ত আসামী জেলে ফাসি না দিয়ে প্রকাশ্য স্হানে ফাসিতে জুলানোর ব্যাবস্হা করা। এই ক্ষেত্রে শাস্তির ভয়ে এই ধরণের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকবে
৫।ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা
৬।স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৭।মক্তব শিক্ষার প্রতি জোড় দেওয়া সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর গ্রামীন পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাবস্হা বৃদ্ধি করা


লেখক : আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জর্জআদালত , Email: Ziahbul.alam06@gmail .Com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •