আবদুল হাকিম (মাসুম)
সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায়-মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না। মানুষ নানাবিধ কারণে- অকারণে, সময়ে-অসময়ে একে অপরের সহযোগিতার প্রয়োজনবোধ করে থাকে। প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষকে থাকতে হয় সমাজবদ্ধভাবে।

আর এই সমাজবদ্ধতাই হলো মানুষের জীবন মান উন্নয়নের এক শুভ পরিণতির নাম, পরস্পর কল্যাণকামিতার নাম। তাই সমাজে বসবাসরত সবাইকে হতে হয় পরস্পর কল্যাণকামিতার গুণে গুণান্বিত। যার সামষ্টিক পরিণতি বয়ে আনবে সামাজিক শান্তি আর শান্তি । সবার জন্য মানবাধিকার থাকবে সমুন্নত । কিন্তু এই মানবাধিকার বান্ধব সামাজিক শান্তির চিরস্থায়ী ফর্মূলা কি?

সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ সেরা জীব। এই সেরা জীবের জন্য প্রয়োজন সেরা নীতি ও পদ্ধতি। তাই সৃষ্টির চিরন্তন প্রয়োজনে সমাজের সকল মানুষের স্রষ্টা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন সেই আকাংখিত মানবাধিকার বান্ধব সমাজ বিনির্মাণের চিরস্থায়ী ফর্মূলা ।

মহান আল্লাহ্ বলেন, “আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদেরকে ন্যায়-নীতি, কল্যাণকামিতা ও আত্মীয় স্বজনদেরকে দান করার হুকুম দেন এবং অশ্লীল- নির্লজ্জতা , পাপকাজ ও অত্যাচার- সীমালংঘন করতে নিষেধ করেন । তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পারো।”
( সূরা নহল- ৯০)

চিরস্থায়ী ফর্মূলা :
উপরোল্লিখিত কুরআনের আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী তিনটি মানবাধিকার বিষয়ে সমাজের সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে :

প্রথমত : ন্যায়-নীতি । সমাজের সবাইকে সব ব্যাপারে ন্যায়-নীতি অবলম্বন করতে হবে । সমাজের সবাই একই ন্যায়-নীতির অধিকার সংরক্ষণ করে । কাউকে খাটো করে দেখা যাবে না। সমাজের নেতৃবর্গ সাধারণ জনগণের প্রতি, জনগণ নেতৃত্বের প্রতি এবং সবাই পরস্পরের প্রতি ন্যায় ও সুবিচার নীতি অবলম্বন করবে । এ ন্যায়-নীতির দাবী হলো এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার পূর্ণ সততার সাথে আদায় করা ।

দ্বিতীয়ত : কল্যাণকামিতা। সবাই একে অপরের কল্যাণকামী। পরস্পর পরস্পরের ভাল কামনা করবে। পরস্পরের প্রতি উত্তম ব্যবহার করবে। কোন অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলেও মাফ করে দেয়ার মানসিকতা থাকবে। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা থাকবে । সর্বোত্তম ব্যবহার করার নীতি অবলম্বন করবে। একটি সুন্দর সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় সমাজের জন্য এ কল্যাণকামিতা প্রয়োজন । যেখানে থাকবে পরোপকার, সদাচারণ, ভাল ব্যবহার, সহানুভূতি, ভালবাসা, দয়া, ক্ষমা, অপরের প্রতি অগ্রাধিকার, পরস্পরের সম্মান-মর্যাদা রক্ষা, অন্যকে তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি দেয়া এবং নিজের অধিকার আদায়ের বেলায় কম নেয়া। এটা ‘ন্যায়-নীতি’ এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ । ‘ন্যায়-নীতি’ যদি সমাজকে কটুতা ও তিক্ততা থেকে বাঁচায়, তাহলে ‘কল্যাণকামিতা’ তার মধ্যে সমাবেশ ঘটায় মিষ্ট মধুর স্বাদের ।

তৃতীয়ত : আত্মীয় স্বজনদেরকে দান করা। সমাজে নিজ নিজ আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নেওয়া। সমাজে যারা বিত্তশালী তাদের সম্পদে গরীব আত্মীয় স্বজনদের হক রয়েছে । গরীব আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নেওয়া, রোগে-শোকে, বিপদে-আপদে, সহযোগিতার হাত আগে বাড়িয়ে দেওয়া এটা বিত্তশালীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা । এই দায়বদ্ধতা কেউ এড়াতে পারেন না। দায়বদ্ধতা হলো, অভাবে পড়লে অর্থ-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করা, দৈহিক সেবা করা, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিপদে পড়লে শান্তনা দেয়া এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করা।

মানবাধিকার বিরোধী তিনটি বিষয় থেকে সবাইকে কঠোর ভাবে বিরত থাকতে হবে :

প্রথমত : অশ্লীল-নির্লজ্জতা। সব রকমের অশালীন, নোংরামী, ঘৃণ্য, কদর্য ও নির্লজ্জ কথা ও কাজ । যে সব কথা ও কাজকে সবাই মন্দ ও খারাপ মনে করে। সমাজ যে সব কথা ও কাজকে স্বীকৃতি দেয় না। যা সমাজে অশ্লীলতা ও বেহায়া- বেলেল্লাপনা বৃদ্ধি করে, যা দ্বারা সমাজ কলুষিত হয়, এ ধরনের সব উপায় উপকরণ ও পথকে কঠোরভাবে বন্ধ করে দিতে হবে।

আর কৃপণতা, ব্যভিচার- উলংগপনা, চুরি-ডাকাতি, মাদকদ্রব্য, জুয়া, ভিক্ষাবৃত্তি, গালিগালাজ, কটু ব্যবহার, মিথ্যা অপবাদ এবং মিথ্যা অপপ্রচার থেকে সবাইকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত : পাপকাজ । সব ধরনের পাপকাজ ও অসৎ কাজ । এমন সব অসৎ কথা ও কাজ যা মানুষ সাধারণভাবে খারাপ মনে করে ও চিরকাল খারাপ বলে আসছে । যার মধ্যে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কর্মগত ও চরিত্রগত যাবতীয় অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে । যা সাধারণত ফৌজধারী অপরাধ হিসাবে গণ্য । এ সমস্ত অপরাধ মানুষের মৌলিক মানবীয় গুণাবলীকে ধ্বংস করে দেয় । এর থেকে সমাজের সবাইকে অনেক দূরে থাকতে হবে।

তৃতীয়ত : অত্যাচার- সীমালংঘন। যা সাধারণতঃ শক্তিমানদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে । অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ। কারোর উপর অন্যায় জুলুম বাড়াবাড়ি, যে বাড়াবাড়ি পরস্পরের মধ্যে হানাহানি, মারামারি ও রক্তপাত সংঘটিত করে । দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, শক্তিহীনের উপর শক্তিমানের অন্যায় নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার, দলীয় নেতৃত্ব ও সমাজপতিদের অন্যায় বাড়াবাড়ি, এ সব সীমা লঙ্ঘনমূলক অপরাধ থেকে শক্তিমানদেরকেই আন্তরিকতার সাথে বিরত থাকতে হবে ।

উপসংহার : শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের বাসোপযোগী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে উপরোক্ত ফর্মূলার চেয়ে সুন্দরতম নীতি আর হতে পারে না। যা বাস্তবায়ন হলে সমাজে হানাহানি তো থাকবেই না উপরন্তু মামলা দায়ের করার মত কোন ভিকটিমকে খোঁজে পাওয়া যাবে না। যার প্রতিশ্রুতিতে রাতের বেলায়ও ঘরের দরজা খোলা রেখে প্রশান্ত চিত্তে সমাজের সবাই ঘুমোতে পারবে। তখন থাকবেনা চুরি ডাকাতির ভয়, থাকবেনা ধর্ষণ ও গুম-খুনের ভয়।

তাই সমাজের সবাইকে উপরোক্ত ফর্মূলার আলোকে মানবাধিকার বান্ধব সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসা উচিত।

আবদুল হাকিম (মাসুম)
মানবাধিকার কর্মী
কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •