অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন


আমাদের দেশে বিকৃত ইতিহাস পরিবেশনের জন্য ইংরেজদের দোষ দেওয়া হলেও তাদের কূটনৈতিক জ্ঞান ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারার কথা অস্বীকার করা যায় না। তারা বুঝেছিলেন, ইতিহাস ভেজাল দিয়েই ভারতবাসীকে অন্ধকারে রাখা সম্ভব, এবং উদ্দেশে ইতিহাস-স্রষ্টা মুসলিম জাতির অক্লান্ত পরিশ্রমের রচনা-সম্ভব আরবী, ফারসী ও উর্দু ইতিহাসগুলোর প্রায় প্রতেকটি অধ্যয়ন, গবেষণা ও অনুবাদ করতে তারা যে অধ্যবসায় ও পরিশ্রমশীলতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা অনস্বীকার্য এবং উল্লেখযোগ্য।

তেমনি কিছু ইতিহাস বিকৃতির কথাইি আমি লিখতে বসেছি। আমরা জানি ইংরেজ প্রভু ও তাদের পোষ্যপুত্রের দল প্রায় সমস্ত আদর্শ মুসলিম রাজা বাদশাহদের চরিত্রেই কলঙ্কের বিষাক্ত ইনজেকশান প্রয়োগ করেছেন, এমনকি অনেক স্থানে পবিত্র ইসলামের উপরেও নির্মম আঘাত হেনেছেন। প্রথমে উল্লেখ করতে চাই মোগল বাদশাহ মোহাম্মদ বিন তুঘলককে নিয়ে।

চারটি কারনে মুহাম্মদ বিন তুঘলককে ইতিহাসে পাগল, নিষ্ঠুর এবং খামখেয়ালীর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে।

১. রাজ্যজয়ের পরিকল্পনা।

২.রাজধানী দেবগিরিতে স্থানান্তরকরণ।

৩.দোয়াব এলাকায় করভার স্থাপন।

৪.তাম্র মুদ্রার প্রচলন।

ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনী লিখেছেন,খোরাসান অভিযানের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ বিন তুঘলক ৩৭০০০০ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে অবশেষে এই পরিকল্পনা ত্যাগ করেন, তাতে তাঁর বাস্তব জ্ঞানের অভাব ও অদূরদর্শিতার পরিচয় মেলে। বারণী সাহেবের লেখা পক্ষপাতদুষ্ট।তিনি তার রচনায় কেন খোরাসান জয়ের পরিকল্পনা ত্যাগ করা হয়েছিলে তা লিখেননি।পারস্য এবং মিশরের মধ্যে মনোমালিন্যের কারনে এই পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছিলো।পরে পারস্যের আবু সায়্যিদ ও মিশরের আন নাসিরের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে উঠে।তাই বাধ্য হয়ে মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁর পরিকল্পনা ত্যাগ করেছিলেন। এক্ষেত্রে  তুঘলকের অদুরদর্শিতা নয় শান্তিকামী মানুষের পরিচয় ফুটে উঠে। তাছাড়া দেশের প্রজাবৃন্দের এক বিরাট অংশ যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিল।

দেবগিরীতে রাজধানী স্থানান্তরের কথাটি নিয়ে তার চরিত্রে কলঙ্কের কালি ছিটানো হয়েছে। ইবনে বতুতা যেভাবে চমৎকার তুলি দিয়ে উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন তাতে সত্যতার লেশমাত্র নেই।তিনি বলেছেন দিল্লীর লোকজনকে শাস্তি দেবার উদ্দেশ্যেই তিনি রাজধানি পরিবর্তন করেছিলেন।কিন্তু এই উক্তি ভিত্তিহীন। আসল কথা হচ্ছে পিতার শাসনকালে বরঙ্গল অভিযানে নিযুক্ত থাকার সময় মুহাম্মদ বিন তুঘলক দাক্ষিনাত্যের বিপজ্জনক সমস্যার গুরুত্ব উপলদ্ধি করেছিলেন্। তাই সিংহাসন লাভের পরেই এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিনি দৌলতাবাদ নামক একটি রাজধানী স্থাপন করতে প্রয়াসী হন।দেবগিরি ছিল দাক্ষিনাত্যের কাছাকাছি সুদুর দিল্লির চেয়ে অনেক নিকটবর্তি। তাছাড়া মোঙ্গল আক্রমনের ব্যাপারটির প্রতি তাঁর এই পরিকল্পনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ১৩২৭ এবং ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দে  দুটি সংস্কৃত অনুশীলন লিপি হতে জানা যায় সুলতান সাধারণ প্রজাবর্গ অথবা হিন্দুদের রাজধানী ত্যাগ করতে আদেশ দেননি। দিল্লি কখনো জন পরিত্যক্ত ছিলনা এবং তার রাজধানীর মার্যাদা হারায়নি। তাছাড়া ইবনে বতুতার উক্তি সঠিক হলে ১৩২৯ খ্রি:  মুলতানে যে বিদ্রোহ হয়েছিল তার বিরুদ্ধে এক বিরাট শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গঠন করা ঐ জনশুন্য দিল্লি থেকে সুলতান কিভাবে সংগ্রহ করেছিলেন! তিনি রাজধানী পরিবর্তন করেননি, শাসনকার্যের সুবিধার জন্য শাসন কার্যের সুবিধার জন্য দৌলতাবাদকে ২য় রাজধানী হিসাবে রুপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন।

প্রশ্ন থেকে যায় ইবনে বতুতা খ্যাতনামা ঐতিহাসিক হয়েও কেন ইচ্ছাকৃতভাবে কেন মুহাম্মদ বিন তুঘলকের উপর এই অঘটন ঘঠালেন।কারন ইবনে বতুতা ভারতবর্ষে এসে সুদীর্ঘ ৮ বছর মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অধিনে দিল্লীতে চীফ জাস্টিসের পদে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন এক অমার্জনীয় অপরাধ করে বসেন যার বিচার সুলতানকেই করতে হয়। বিচারে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। কারামুক্তির পর যদিও বতুতা সুলতানের প্রীতি ফিরে পেয়েছিলেন,তথাপি শাস্তির কথা ভুলতে পারেননি। তাই তাঁর পুস্তকে সুলতানের প্রতি অবজ্ঞা ঘৃনাকে তিনি ‍কিছুতেই চাপা দিতে পারেননি। তাছাড়া বিভিন্ন অলীক জনশ্রুতিকে তিনি তাঁর ইতিহাসে মুল্যায়ন করেছেন।

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্রে নিষ্ঠুরতার আর এক দিক দোয়াবে দশ গুন বিশ গুন করবৃদ্ধি করে করে জনগনকে ভিক্ষুক হতে বাধ্য করেছিলেন।ইংরেজরা এই ব্যাপারটিকে আরো রং লাগিয়ে মুহাম্মদ বিন তুঘলকে এর সাথে বদনামে জড়িয়ে ফেলেন। উল্লেখ্য জিয়াউদ্দিন বারনী কখনো সম্রাটের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। আসল ঘটনা খলজী বংশের পতনের পর দোয়াবে অভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলার কারণে অনেক বছর কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। মুহাম্মদ বিন তুঘলক আলাউদ্দিন খলজী অপেক্ষা কম হারে পূর্ব আরোপিত করের পুণ:প্রবর্তন করেন মাত্র। যেমন আমাদের দেশে দু তিন বছরের অনাদায়কৃত কর এক সাথে আদায় করার নিয়ম রয়েছে। কৃষিপ্রধান দেশ দোয়াবে একসময় পর পর সাত বছর অনাবৃস্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের মতো এক সাহসি নেতা পীড়িত প্রজাদের খাদ্য দান, ঋনদান, কূপ খনন, চাষের বীজ ইত্যাদি প্রদান করে জনকল্যাকামী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন। কথিত আছে দাতা হাতেম তাই এবং অন্যেরা একবছর যা দান করতেন, তিনি একবারেই তা করেছেন। ডা: ইশ্বরিপ্রাসাদের মতো ঐতিহাসিক বলেছেন , প্রায় একযুগ স্থায়ী মারাত্মক দুর্ভিক্ষ তাঁর রাজত্বের গৌরব অনেকটা বিনষ্ট এবং প্রজাগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।তারা তাঁকে নীরো এবং ক্যালিগালের মতো নিস্ঠুর, দানব অভিহিত করেছিল।দূভিক্ষ প্রতিকারের তাঁর চেস্টাকে তারা মুল্যায়ন করেন নাই।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকে স্বর্ণ রৌপ্যের পরিবর্তে তাম্র মুদ্রার প্রবর্তন করেছিলেন।মি: টমাসের মতে তিনি ছিলেন‘Prince of moneyers’ অর্থাৎ তঙ্কা নির্মাতার রাজা’।তাঁর প্রবর্তিত মুদ্রা নতুনত্ব এবং গঠন বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে দৃস্টান্তস্বরুপ।

মোট কথা মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের সামগ্রিক জীবনী আলোচনা করে আমরা নি:সংকোচে বলতে পারি, তিনি একজন আদর্শ বাদশাহ, উন্নত চরিত্র সাধক,অসাধারন বক্তা এবং অতুলনীয় দাতা ছিলেন। বাদাউনী বলেছেন, পান্ডিত্য ও প্রতিভায় মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন “সৃষ্টির বিস্ময়”।তাঁর সময়ে হিন্দু প্রজারা সুলতানের উপর ভালো ধারণা পোষন করতেন। চৌদ্দ শতকের শেষের দিকে কবি বিদ্যাপতি ঠাকুরের “পুরুশা পরিশকা’তে মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অত্যন্ত প্রশংসা করা হয়েছে।১৩২৭ খ্রি: শ্রী রাধারাণী ব্রাহ্মণের বই এ মুহাম্মদ বিন তুঘলককে “হীরা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁকে সাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।(Catalogue of theDelhi Museum of Archaeology: J,p Vagel Calcutta 1908 p 29)আজায়েবুল আসফার গ্রন্থের ২য় খন্ডে সুলতান মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের হিন্দু মুসলমান ঐক্যের প্রয়াস ও উদারতার বহু প্রমান পাওয়া যায়।ঐ গ্রন্থ হতে জানা যায় রতন নামে জনৈক হিন্দুকে তিনি সিন্ধু প্রদেশের গভর্ণর নিযুক্ত করেন।

এমনিভাবে এই মহাপন্ডিত হাফেজে কোরআন মুহাম্মাদ বিন তুঘলক তাঁর হিন্দু মুসলমান ঐক্যের মিলন গড়ে তুলে ইতিহাসে চির অমর হয়ে আছেন। কিন্তু দু:খের বিষয় সাধারণ ইতিহাসে তিনি আজ তার সম্পুর্ন বিপরীত।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •