খোরশেদ আলম


( যারা আজ বেঁচে থাকলে নব্বই বছরের উর্ধ্বে বয়স হত, যারা এই শহরে অবদান রেখেছে এবং যারা এই শহরের কিন্তু তাদের সন্তানদের কোন নাকোন অবদান আছে তাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস)

আমি আমার পুর্ব পুরুষদের কথা বলছি

১। এডভোকেট মোহাম্মদ আলী :  তিনি দক্ষিণ টেকপাড়া’র স্হায়ী বাসিন্দা।  চট্টগ্রাম কাজেম আলী হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সহিত এন্ট্রান্স পাশ করেন । ভাল ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার কারণে চট্রগ্রাম কলেজে ইন্টরভিউ ব্যতিরেকে এবং উপস্থিত না থাকার কারণেও ভর্তি দেন । কলকাতা কারমাইকেল প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ব্যচেলর (বি.এ) ডিগ্রি অর্জন করেন । পরে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন করে কক্সবাজার বারে পেশাজীবনে প্রবেশ করেন। প্রতিদিন  ফজর নামাজের পর সুমধুর কন্ঠে কোরআন তেলোয়াত করতেন – পথচারী নীরবে দাঁড়িয়ে কোরআন পাঠ শুনত ।
তিনি একাধারে কবি, সংগীতশিল্পী, গায়ক ও গান রচয়িতা ছিলেন যেজন্য কলিকাতা অবস্থানকালে গায়ক অতুল প্রসাদ, ডি এল রায়, কবি নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও যোগাযোগ ছিল । কক্সবাজারের স্বনামধন্য সংগীত শিল্পী, চট্টগ্রাম বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী রায়হানউদ্দীন
তাহার সন্তান ।
২। মোজাফফর আহমদ : তিনিও দক্ষিণ টেকপাড়া’র অধিবাসী একজন শিক্ষিত ব্যাক্তি । পেশায় কোর্টের একজন পেশকার ছিলেন। তখনকার আমলে সব ছেলে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন । তিনি ছিলেন বিনয়ী এক ভদ্রলোক । আইনজীবী জনাব আবুল কালাম আজাদ তাহার সন্তান যিনি একাধারে কবি, লেখক ও সুবক্তা । তদোপরি একজন নিরেট ভাল মানুষ ।
৩। মোহাম্মদ সিরাজ : তিনি প্রথম জীবনে বন বিভাগে ফরেস্ট কর্মকর্তা হিসাবে চাকুরী জীবন শুরু করেন, পরবর্তীতে কক্সবাজার পৌরসভায়ও
চাকুরী করেন। কক্সবাজার কলেজের প্রফেসর ও বর্তমানে হার্ভার্ড কলেজের প্রিন্সিপাল জনাব সিরাজুল মোস্তফা তাহার সন্তান ।
৪। ওহিদুল আলম : ওহিদুল আলম, মধ্য টেকপাড়া’র সন্তান । তিনিও উচ্চ শিক্ষিত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেন । তিনি কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন । তিনি একজন সাহিত্যিক ছিলেন। তাহার ছেলে এডভোকেট জুবায়ের ।
৫। আমেনা খাতুন  :  ব্রিটিশ পিরিয়ডে একজন শিক্ষিত, সম্পদশালী ও দানশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহিলা । তিনি নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য টেকপাড়া আমেনা বেগম সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সমস্ত জমি দান করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টি তার নামেই প্রতিস্টিত।
৬। আবদুল হাকিম :  তিনি মধ্য টেকপাড়া’র অধিবাসী একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, অধদা নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত । তিনি পেশাগত জীবনে সরকারী চাকুরী করতেন ফোর্ড ডিপার্টমেন্টে । তিনি নারী শিক্ষার প্রতি এতই উৎসাহী ছিলেন যে, নিজের পাঁচ মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করেন এবং সবাই স্কুল শিক্ষিকা । বড় মেয়ে উম্মে হাবীবা খানম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেইসময় কক্সবাজার শহর থেকে নারী হিসাবে প্রথম মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং শিক্ষকতা পেশায় কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও বালক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন ।
৭। মুবিনুল হক : তিনি ফজল করিম কন্ট্রাক্টরের ছেলে এবং কালামিয়া কন্ট্রাক্টরের ছোট ভাই ছিলেন। তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার। তিনি টেকপাড়া মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করতেন। তিনি টেকপাড়ায় স্হানীয় সমাজের সমাজপতি ছিলেন দীর্ঘদিন ।
৮। এডভোকেট জহিরুল ইসলাম : তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কক্সবাজার আওয়ামী লীগের সম্মুখসারীর প্রধান নেতা ছিলেন । তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও বাকশাল কায়েম হওয়ার পর গভর্নর পদ অলংকৃত করেন । তিনি ছিলেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও তুখোড় বক্তা । মগনামার অধিবাসী হলেও তিনি পরিবার পরিজন আত্নীয়স্বজন নিয়ে টেকপাড়া’র বইল্যাপাড়ায় স্হায়ীভাবে বসবাস করেন । তাহার বড় ছেলে জাহিদুল ইসলাম বর্তমানে ব্যাংকের উচ্চ পদে আসীন । মেঝ ছেলে রাশেদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের নেতা এবং বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট দলের
অধিনায়ক মুমিনুল হকের নানা ।
৯। ডাঃ হৃদয় রন্জন দে : সবাই উনাকে চিনেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হিসাবে । তিনি দীর্ঘজীবি ছিলেন খুব সম্ভবতঃ নব্বই বছরের অধিককাল
পর্যন্ত গরীব দুঃখী জনগণকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন । দীর্ঘ সময় সুস্বাস্হ্য থাকার অন্যতম কারণ ছিল প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত সমুদ্রে হাটতেন যা সবার অনুকরণীয় হওয়া উচিত । আমিও হাঁটতাম বিধায় ওনাকে পথের সাথী বলতাম। ব্যাংকিংয়ে দেখেছি, কিভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
সঞ্চয়ের যে অদম্য প্রয়াস তাও সবার জন্য উদাহরণ । তিনি আমাকে পুত্র স্নেহে আদর করতেন যেহেতু তাহার বড় সন্তান স্বনামধন্য আইনজীবী এডভোকেট সুভাষ চন্দ্র দে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
১০। মৌলভী ফরিদ আহমদ চৌধুরী : মৌলভী ফরিদ আহমদ সম্পর্কে কক্সবাজারবাসী বৈচিত্র্যপুর্ণ জীবনের অধিকারী হিসাবে জানেন। তিনি কলকাতা বোর্ডের অধীনে সম্মিলিত মেধাতালিকায় এন্ট্রান্স (এসএসসি) পরীক্ষায় ২য় স্হান অধিকার করেন। কর্মজীবনে ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজে ইংরেজীর অধ্যাপণা করেন । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে লেখাপড়া করেন ও ১৯৪৮ সালে ডাকসুর সহ-সভাপতি ছিলেন । ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৫৮ সাল তার প্রচেষ্টাায় কক্সবাজার ফুটবল একাদশ ঢাকা আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবকে ২ – ১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তীর্ণ হয়। তখন রোমে অনুষ্টিত অলিম্পিয়াডে পাকিস্তানের পক্ষে হকি দলের নেতৃত্ব দেন । তিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ।
এছাড়াও তাহার ২  ছেলে  সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট খালেকুজ্জামান (মরহুম) ও  ইঞ্জিনিয়ার সহিদুজ্জামান কক্সবাজার-রামুর সংসদ সদস্য ছিল।
১১। ডাঃ মুবিনুল হক : কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তখনকার এম,বি,বি,এস ডাক্তার এবং তিনি সিভিল সার্জনও ছিলেন । তিনি স্হায়ীভাবে হাসপাতাল সড়কে বসবাস করতেন। ডাক্তারী পেশা যে সেবা তা তিনি বাড়ী বাড়ী গিয়ে রোগীর চিকিৎসাতো দিয়েছেন সংগে আবার নিজ উদ্যোগে দেখতেও গেছেন। আজকে যারা ডাক্তার তার এই সকল আদর্শ অনুসরণ করা একান্ত জরুরী।
১২। আবদুল কাদের : কক্সবাজার হাইস্কুলের সহকরী প্রধান শিক্ষক পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাদের স্যার হিসাবে সমধিক পরিচিত । শিক্ষাগত যোগ্যতা বি.এ, বি. এড, এম.এ, খুবই মেধাবী শিক্ষক, শিক্ষা ক্যাডারে বিসিএস । ভাল ফুটবল প্লেয়ার এবং ফুটবলে রেফারীর দায়িত্বও পালন করেন। কক্সবাজার হাইস্কুল সরকারীকরণে তাঁহার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি গুনিজন সম্বর্ধনা পান ।
১৩। দেব ব্রত বাবু  :  দেব বাবু স্যার হিসাবে তিনি সবার কাছে সুপরিচিত ছিলেন । পশ্চিম বংগের সন্তান। কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে আমাদের শহর কক্সবাজারে চলে এসে স্হায়ী বাসিন্দা হিসাবে জীবন যাপন করেন। তিনি কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন । অনেক ছাত্র – ছাত্রী তার কাছে তালিম নিয়ে গান শিখেন। তিনি অত্র অঞ্চলে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারে যথেষ্ট অবদান রাখেন ।
১৪। এডভোকেট নুর আহমদ : মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের সামনের সারির  নেতার মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তখন তিনি কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় পরিষদ সদস্য (M.N.A) ছিলেন। সত্যিকার অর্থে দেশ ও দলকে ভালবেসে যে কয়জন নেতা মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে অবদান রেখেছে তার মধ্যে এডভোকেট নুর আহমদের অবদান অনস্বীকার্য । তিনি একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তিনি আইন পেশায় খ্যাতি লাভ করেন। বর্তমানে তাহার পুত্র সোহেল আহমদ বাহাদুর কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

১৫। বাদল দাশ  : কক্সবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পূর্ব পার্শ্বে উনার স্হায়ী নিবাস । তিনি কক্সবাজার পৌরসভার দীর্ঘ সময়কাল বিভিন্ন টার্মে কমিশনার ছিলেন । তিনি হিন্দু সম্প্রদায়েরও একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন ।
১৬। মোহাম্মদ আলী মিয়া : তিনি হাসপাতাল সড়কের একজন বাসিন্দা । আদী বাড়ী কক্সবাজার শহরের গোদারপাড়া । ১৯৫২ সনে কানুনগো পাড়া কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। পরে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে Graduation ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিছুদিন বৃটিশ বার্মা অয়েল কোম্পানিতেও চাকুরী করেন। পরে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন এবং মহকুমা আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতির দায়িত্ব ও থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । কক্সবাজার জেলা ঘোষিত হলে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন ও কক্সবাজার চেম্বারের প্রতিস্টাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। তিনি ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পের সামনে মোহাম্মদ আলী মার্কেটের স্বত্বাধিকারী। তাহার বড় সন্তান রাশেদ মোহাম্মদ আলী ও মোরশেদ মোহাম্মদ আলী কক্সবাজারে পরিচিত মুখ ।

যে কোন ভুল যদি চোখে পড়ে জানানোর জন্য বিনয়ের সহিত অনুরোধ করছি ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •