নাজমুল সাঈদ সোহেল :

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা  বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হয়েছে । আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ নির্বাণ লাভের পর আষাঢ়ি পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা উৎসব পালন করেন। সেই থেকে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা বর্ষাবাস শেষে দিবসটি পালন করে আসছেন।তাই ভিক্ষু সংঘের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত শেষে আসে এ প্রবারণা তিথি।

প্রবারণা হলো আত্মশুদ্ধি ও অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের অনুষ্ঠান। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে এক মাস দেশের প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে শুরু হয় কঠিন চিবর দান উৎসব।

প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে চকরিয়া কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন বিহার অধ্যক্ষ ভদন্ত প্রজ্ঞা মোদিতা ভিক্ষু। এরমধ্যে রয়েছে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশ, মঙ্গলসূত্র পাঠ, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশিল ও অষ্টাঙ্গ উপসথ শিল গ্রহণ, মহাসংসদান, অতিথি আপ্যায়ন, পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পাঠ, আলোচনা সভা, প্রদীপ পূজা, আলোকসজ্জা, বিশ্বশান্তি কামনায় সম্মিলিত বুদ্ধোপাসনা, ফানুস ওড়ানো ও বুদ্ধকীর্তন।

বৌদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে চকরিয়া কেন্দ্রীয় জেতবার বুদ্ধ বিহারে বিকেল ৩টায় এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ফানুস উত্তোলন উৎসব উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের উদ্বোধক চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চকরিয়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ জিয়াউল হক ও সাংবাদিক মোহাম্মদ নাজমুল সাঈদ সোহেল।

প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব সম্পর্কে বিহার অধ্যক্ষ ভদন্ত প্রজ্ঞামোদিতা ভিক্ষু বলেন,বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। ‘প্রবারণা’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা, নিষেধ করা ইত্যাদি। ‘বরণ করা’ অর্থে বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবন পরিচালিত করার আদর্শে ব্রতী হওয়া, আর ‘নিষেধ’ অর্থে আদর্শ ও ধর্মাচারের পরিপন্থী কর্মসমূহ পরিহার করাকে বোঝায়। বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুসংঘ আপন আপন দোষত্রুটি অপর ভিক্ষুসংঘের নিকট প্রকাশ করে তার প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহবান জানায়। এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনাচারের প্রতিটি মুহূর্তে সচেতনভাবে ঘটিতব্য সর্ববিধ দোষকে বর্জন করে গুণের প্রতি আকৃষ্ট থাকার চেতনা সৃষ্টি করাই প্রবারণার উদ্দেশ্য। শ্রাবস্তীর জেতবনে অবস্থানকালে গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের পালনীয় হিসেবে এর প্রবর্তন করেন।
আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা পালিত হয়। প্রবারণার পর ভিক্ষুসংঘকে অধীত জ্ঞান প্রচারের জন্য গ্রামে-গঞ্জে যেতে হয়। এ সময় তাঁরা কল্যাণের বাণী প্রচার করেন, যাতে দেব-মনুষ্যসহ সব প্রাণীর কল্যাণ সাধিত হয়। এভাবে প্রবারণা শেষ হওয়ার পর প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে পালিত হয় কঠিন চীবর দান উৎসব।
প্রবারণা পূর্ণিমার অন্য একটি উৎসবময় দিক হলো ফানুস উত্তোলন। বৌদ্ধশাস্ত্রমতে বুদ্ধদেব আধ্যাত্মিক শক্তিবলে দেবলোকে গিয়ে মাকে ধর্মদেশনা করে এদিন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এ কারণে বৌদ্ধগণ প্রবারণা পূর্ণিমায় আকাশে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের প্রতীকরূপে ফানুস উত্তোলন করে। এ সংক্রান্ত আরেকটি কাহিনী হলো: সিদ্ধার্থ গৌতম কোনো এক সময় মাথার এক গুচ্ছ চুল কেটে বলেছিলেন তিনি যদি সিদ্ধিলাভের উপযুক্ত হন তাহলে এই কর্তিত চুল যেন নিম্নে পতিত না হয়ে ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী চুলগুচ্ছ আকাশে উঠে গিয়েছিল। তাই বুদ্ধের কেশধাতু পূজার স্মৃতিস্বরূপ আকাশে এই ফানুস ওড়ানো হয়। এ করণে আত্মবিশ্লেষণের শিক্ষা, মাতৃকর্তব্য পালন ও বিনয়বিধান অনুশীলনের বহুবিধ মহিমায় এই প্রবারণা পূর্ণিমা মহিমান্বিত। প্রতিবছর আশ্বিনী পূর্ণিমায় বৌদ্ধরা শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বুদ্ধপূজাসহ নানা পুণ্যানুষ্ঠানের। বাঙালি বৌদ্ধদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এ পূর্ণিমার আবেদন খুবই গভীর।
এ সময় বাংলাদেশ বৌদ্ধ বিহার সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি পরিমল বড়ুয়া, চকরিয়ার যত্নবান কেন্দ্রীয় বুদ্ধ বিহারে সভাপতি অনুপম বড়ুয়া , সাধারণ সম্পাদক বাবুল বড়ুয়াসহ মন্দিরের দায়িত্ব প্রাপ্তগন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বুদ্ধোপাসনাৱ লোকজন ও সুশীল সমাজেৱ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •