জিয়াবুল আলম


বাংলাদেশ একটি laissez Faire রাষ্ট্র। একটি আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মূল উপাদান চারটি। যেমন জনসমষ্টি, সরকার, নিদিষ্ট ভূখন্ড এবং সার্বভৌমত্ব। আবার একটি গণতান্ত্রিক সরকারের তিনটি উপাদান রয়েছে। যেমন আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। এই বিভাগগুলোর সাংবিধানে বর্ণিত বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া কোন একটি অচল হলে দেশের গণতন্ত্র অচল। তবে বিভাগগুলো আলাদা হলেও প্রত্যক বিভাগের মধ্যে একটি ক্ষমতার ভারসাম্য ণীতি বিদ্যামান রয়েছে।যাকে আইনের ভাষায় check and balance বলা হয়।

শাসন বিভাগকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে আবার বিভিন্ন স্তরের শ্রেণী বিভাগ বিদ্যামান রয়েছে। যেমন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। প্রশাসনিক স্তরে ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে সর্ব নিম্ন স্তর। কিন্ত শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং গ্রামীন উন্নয়নের জন্য এই ইউনিয়ন পরিষদ অত্যান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ।
কারণ আমরা অনেকে উন্নয়ন বলতে শুধু মাত্র রাস্তাঘাত এবং সরাইখানা নির্মাণ ইত্যাদিকে বুঝি। কিন্তু উন্নয়নের তিনটি অংশ যেমন.
১অবকাঠামোগত উন্নয়ন
এখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বলতে রাস্তাঘাট এবং সরাইখানা নির্মাণ ইত্যাদিকে বুঝায়।
২।মৌলিক চাহিদাগত উন্নয়ন।
মৌলিক চাহিদাগত উন্নয়ন বলতে সাংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে যে ৫ টি মৌলিক চাহিদার কথা বলেছে। সেই চাহিদাগুলো জনগণকে যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৩।মৌলিক অধিকারগত উন্নয়ন
মৌলিক অধিকারগত উন্নয়ন বলতে আমাদের সাংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে ২৬… থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত যে ১৮ টি মৌলিক অধিকারের কথা বলেছে, সেই অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করা।
যখন উন্নয়নের তিনটি অংশ সাধারণ জনগণের নিকট সমান্তরাল ভাবে পৌছে দিতে সক্ষম হবে, তখন সার্বিকভাবে উন্নয়ন হিসাবে ধরে নেওয়া যাবে।এই বিষয়গুলো ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে জনগণের নিকট সহজ ভাবে পৌছে দেওয়া সহজ।

কিন্ত অপ্রিয় হলেও সত্য যে আজকে আমাদের গ্রামীন পর্যায়ের প্রশাসনিক স্তরে উন্নয়ন বলতে শুধু মাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বাকী দুটি অনুপস্থিত। যাহা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।কারণ আজকে আমরা চেয়ারম্যান পদবি ধারণ করে গ্রাম আদালতকে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এক প্রকাশ ক্ষমতার অপব্যাবহারের সামিল।
আমরা যদি দেশের মূল আইন সাংবিধান এবং আইনেরণীতি পর্যালোচনা করি দেখতে পায় যে আসলে চেয়ারম্যানকে ক্ষমতা অপব্যাবহার রোধের জন্য দেশের প্রচলিত আইন সংশোধন করা দরকার। কারণ একজন চেয়ারম্যান একই সাথে বিচারক এবং একই সাথে চেয়ারম্যানের পদ ধারণ করা সংবিধান সম্মত নহে। আমাদের সাংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে কোন ব্যাক্তি একই সাথে দুটি পদ ধারণ করতে পারেনা।
তাছাড়া গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান নির্বাচিত প্রতিনিধি। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি বিচারক হিসাবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা স্বাভাবিক The principal of natural justice এর পরিপন্থী। কারণ আইনের ভাষায় সাধারণ পক্ষপাত তিন প্রকার। যেমন ১ pecuniary bias 2. Personal 3. official bias
Rule Against the bias যার অর্থ হচ্ছে কোন ব্যাক্তি তার নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিচারক হতে পারবেনা অথবা সিধান্ত গ্রহনকারী কতৃপক্ষ নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত হবেন। অর্থাৎ principle Against the bias or interest হচ্ছে এই ণীতির সুর। এই ণীতি বিশ্লেষণ করলে আমরা তিনটি maxim এর অয়িত্ব খুজে পায়।যেমন
১ কোন ব্যক্তি তার নিজের বিষয়ে বিচারক হতে পারবেনা
২ শুধু সুবিচার করলে হবেনা। সুবিচার করার বিষয়টি প্রকাশ্য সন্দেহ মুক্ত প্রমাণ করতে হবে
৩ বিচার ও বিচারক এবং সকল প্রকার প্রমাণাধি হতে হবে সন্দেহ মুক্ত
স্বাভাবিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি বিচারকের আসনে বসলে personal bias হওয়ার সম্ভাবণা অনেক বেশি। এখানে ব্যাক্তিগত কিংবা personal bias কতগুলোরবিশেষ পরিবেশ পরিস্থিতিতে উদ্ভব ঘটে। এই ক্ষেত্রে বিচারক যে কোন পক্ষের আত্মীয় বা বন্ধু কিংবা কোন পক্ষের সাথে ব্যাবসায়িক সহযোগিতা থাকতে পারে। এতে কোন পক্ষের সাথে রাগ, ঝগড়া, ক্ষোভ বা ব্যাক্তিগত শত্রুতাও থাকতে পারে। কারণ অনেক সময় চেয়ারম্যান সাহেবকে নির্বাচনে সহযোগিতা কিংবা ভোট দিতে অনিহা প্রকাশ করলে, অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রু হয়ে ওঠে। এই বিষয়গুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধি বিচারকের আসনে বসলে পক্ষপাত অবলম্বন করতে পারে স্বাভাবিক ভাবে।এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে ন্যায় বিচার হতে পারেনা। কারণ ন্যায় বিচারের নীতি সম্পর্কে Lord Harman বলেন, স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের ণীকি কি রকম? সে সম্পর্কে আমি বলব প্রথমে যে ব্যক্তির বিরোদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাকে অভিযোগে প্রকৃতি সম্পর্কে অবিহত করা।দ্বিতীয়ত তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং তৃতীয় বিচার বিভাগ যাকে সৎ বিশ্বাসের বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে সেই দিকে লক্ষ্য রাখাই হচ্ছে ন্যায় বিচার।গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান যেহেতু নির্বাচিত প্রতিনিধি। সুতরাং তার পক্ষের ব্যক্তির উপর পক্ষপাত হতে পারে স্বাভাবিক । তাই এখানে গ্রাম আদালতের বিচারক সৎ থাকা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

আমি আগে বলেছি নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি করতে গিয়ে নির্বাচনের চেয়াম্যান সাহেবকে কে ভোট দান করেছে কিংবা পরবর্তী নির্বাচনের বিজয়ী হওয়া কিংবা উভয় পক্ষের সমর্থন আদায়ের লক্ষে বিচার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে পারে।সুতরাং নির্বাচিত প্রতিনিধি দিয়ে বিচারের আশা করা মানে গুড়ে বালি দেওয়া ছাড়া আর কিছু হতে পারেনা।

তবে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ইউনিয়ন পরিষদের মত পঞ্চায়েত ব্যাবস্হা চালু আছে। সে খানে কিছু নির্বাচিত প্রতিনিধি বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে পারে না। বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য আলাদা ভাবে অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়।যার ফলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের গ্রামীন পর্যায়ে প্রশাসনির স্তর অনেকট ফলপ্রসূ হয়েছে।
তাই গ্রাম আদালতের বিচার সুষ্ট ভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বিচারকের আসনে না বসিয়ে, গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি লক্ষ্যে একজন আইন শিক্ষায় শিক্ষিত এবং যোগ্যতার সম্পন্ন ব্যাক্তিকে বিচারক নিয়োগ দেওয়া।
বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হচ্ছে কিনা এই বিষয়ে তধারিকের ব্যাবস্হা করা।
সর্বোপরি দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচনের সুযোগ না দিয়ে, পূর্বের ন্যায় স্ব স্ব প্রতীকে নির্বাচন করা।কারণ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৯ এ-এর সর্বশেষ সংযোজনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে চলেছে। বর্তমান যুগে, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলি প্রায়শই শান্তির হুমকি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে চালিত হয়, আমরা এই রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের আদালতের রায় প্রদানের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ হবে বলে আশা করা যায় না।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে নতুন উদ্ভাসিত দ্বিধা অবশ্যই আমাদের সংবিধানের চেতনার বিরোধিতা করে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের আদালতের কক্ষে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য পরিণতিগুলি আইনের শাসনের পবিত্রতা বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আশা করা যায় না।
পরিশেষে উপরোক্ত সমস্যা গুলো সার্বিক বিবেচনা করে আইনের সংশোধন করলে স্হানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের প্রতি আরো আস্হা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের আস্হাপূরণ করতে সক্ষম হবে ও আইনের শাসন যুগ যুগ ধরে সমুন্নত থাকবে।


লেখক : আইনজীবী, চট্টগ্রাম আদালত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •