আলমগীর মাহমুদ

`গরুর আদর লেখনে পুঁছনে , মানুষর আদর আইয়নে য নে’- গরু জিহ্বায় চেঁটে আদরের প্রকাশ ঘটায়। বাচ্চাকে আদরে লেহ্যে লেহ্যে দরদে সিঁথি তুলে। গরুর আদর লেহ্য আর জিহ্বার মুছায়। মানুষের আদর আসা যাওয়ায় । দেখা সাক্ষাৎ এ।

চাটগাঁইয়া প্রবাদের এই অমর সত্য ধারণ করে কাটিয়েছি জীবনের সিংহভাগ। ধারণ করা অমর সত্যগুলো এ যুগে এসে শক্তি হারিয়েছে। গোলায় সঞ্চিত ধন শক্তি হারালে অচলমুদ্রা হওন ছাড়া উপায় রয় না।

দিনে দিনে আমাদের প্রজন্মের মানুষগুলো বড়ই বেখাপ্পা বেয়াড়া, এনালগ তকমায় প্রযুক্তি নির্ভর হাইব্রীডের ফলন খাওয়া প্রজন্মের কাছে কেমন যেন অপ্রয়োজনীয় যুগোপযোগী নয় ভাবে ভাবেই ।

তাদেরকে আমরা কোন মতেই বুঝাতে পারছিনে ‘বাবারা’ তোরা যে হাইব্রিড মজার পেঁপে খাস এর চেয়ে স্বাদের রূহ তৃপ্ত করতে পারা প্রাণ জুড়ানো দেশী পেঁপে আছে। তারা ভিয়েতনামী বেশী ফলনওয়ালা চায়। মজা নয়। তাদের এককথা মজার চেয়ে উন্নয়ন দরকার ।

এমন চিন্তায় তারা আজ বাড়ির উঠানে ফুলবাগান করতে নারাজ, আলু ক্ষেত করতে চায়। তাদের এককথা লাভেই জীবন ” LOVE ” এ নয়। প্রজন্মের এমন চিন্তায় সমাজ জীবনে অনেক স্বাদের মজার অমূল্যের বিষয় আজ শরীফা ফলের মত বিলুপ্ত প্রায়।

আমাদের ভাল লাগা মন্দলাগা শাসন, হিত, মংগল, কোনটিই তাদের মনপুত নয়। আমাদের নিয়ে কেমন যেন এক অজানা বিরক্তি বিরক্তি। তাদের এক ভাবনা গোগুল ইউটিউবের মত মুরুব্বি ফেইজবুকের মত সাথী রইলে কি আর লাগে কঁ-ন!

তাদের কোনমতেই বুঝানো যাচ্ছে না মা, বাবা, ওস্তাদ মুরুব্বির আর্শীবাদ পৃথিবীর পরম সম্পদ। মানব মনে দুখ, মজলুমের বদদোয়া, অভিশাপ, হিরোশিমা নাগাসাকির ভয়াবহতাই উপহার দেয় জীবনে। তারা শুনে চুপ রয়, ভাবে মনে হয়, বুঝছে, চলবে। মোবাইলের দেখায় সব ভুলে।

আমাদের ছেলেবেলায় পরিবার ছিল বড় পাঠশালা। সকালে ফজরের নামাজে মা’ দূ’ভাইকে ক’বার ডাকল উঠতে কাতুমাতু করলেই মা’, কোন কথা ছাড়াই মেহেদী গাছের ডাল চালিয়ে বেতের কাজ করিয়েছে ।

নামাজে ছাড়ের ক্ষেত্রে উনি ছিলেন যমের মত কড়া । এমন মাইর যেন উনি আমাদের চিনেনইনা। সন্ধ্যায় মাগরিব আজানের সাথে সাথে বাড়ি ফিরতে হতো হেরফেরে বেতের ভয়। আজ মা’ নাই মাইর গালিরও কেউ নেই।

ফজরের আজান, মাগরিবের আজানে কঁ-ন লায় না নামাজের সময় হয়েছে। ঠিক সময় বীজ বূনলে সঠিক ফলন মেলে বার মাস । অভ্যাসেরও যে অভ্যাস লাগে। সারাজীবনের সঞ্চয়ে আজ মা’ র বেতটিই আরাধ্য স্নেহমাখা ভয় যেখানে নেই সেখানে কেমনে জমবে অমূল্য!

পথ চলতে মুরুব্বি দেখলে রাস্তার সাইড দিয়ে চলা, আদাব, নমস্কার, সালাম দিয়ে বিনয়াবনত দে্হসৌষ্ঠব । উচ্চক্লাসের জনকে বড় জনের মত সন্মোধন, শ্রদ্ধা করা। পথে ঘাটে কেউ কোন অন্যায় করে বসলে কার ছেলে বড় কথা নয় যে কেউ মুরুব্বি দাঁড়িয়ে তার কানমলা, চড়, ভয়ভীতিতে শাসন করে যেত।

বাড়ির মুরুব্বিরা শুনলে আবার ভয়ভীতিতে বুঝানো হতো তুই কার ছেলে? কোন বংশের? এই আচরণ গোষ্ঠীর ইজ্জত গেল। আমরা মুখ দেখাই কেমনে। আমরা নত হয়ে কান ধরে শপথ করে কইতাম আর কোনদিন এমন হবে না বাবা!

আমাদের প্রজন্মের মানুষগুলো ঠিক এমনভাবে পুরো গ্রামের ময় মুরুব্বিকে শিক্ষক ভেবে ভেবে বড় হওয়া। আজকালকার প্রজন্ম কি তার ছিটেফোঁটাও সামাজিক নিগড় পেয়েছে?

আমাদের প্রজন্ম আজ তাদের ময় মুরুব্বি বাবা, মামা, চাচা। আমরা কি চাইলেও পারছি তুই আজানের সাথে সাথে বাসায় ঢুকলি না কেন? মসজিদ মন্দিরে, ঘরে নৈতিকতার পিলার ধর্মীয় শিক্ষার তালিমের সবক কড়াকড়িতে আদায় করতে? আমার ছেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে সে কি খেয়ালে রাখছি!

তারা তারাই থাকুক আমরা হবার প্রয়োজন নেই। তাদের যৌক্তিক আচরণ যে সমাজজীবনে বড্ড প্রায়োজন আমাদের! যদি প্রশ্ন রাখেন মাস- সাব আপনার কাম কি! উত্তরটা বেরসিক… “উজানস্রোতে জীবন তরী চালাওন!”….

লেখক : বিভাগীয় প্রধান , সমাজবিজ্ঞান বিভাগ , উখিয়া কলেজ, কক্সবাজার।
[email protected] com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •