শাহেদ মিজান, সিবিএন:

বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর প্রায় ৪ লাখ মানুষ; যাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য কক্সবাজার জেলা সদরের যাতায়াত করতে হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পণ্য পরিবহণ, রোগী পরিবহণ, অফিস-আদালত; এক কথায় অন্তত ৯০ শতাংশ কাজের জন্য মহেশখালীর মানুষকে প্রতিনিয়ত কক্সবাজার শহরে আসতে হয়। এর কারণ হিসেবে ধরা হয়; মহেশখালী অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী একটি উপজেলা হলেও অন্যান্য উপজেলার মতো প্রয়োজনীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিনিয়ত বঙ্গোপসাগরের প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার ভয়াল সাগর পাড়িয়ে মহেশখালী থেকে কক্সবাজার যাতায়াত করতে হয়। এ গেলো দুর্দশার প্রথম গল্প!

দ্বিতীয় গল্পটা বেশ করুণ! কারণ বছরের অধিকাংশ সময় যাতায়াতের এই নৌপথ থাকে বিপদসংকুল। জোয়ার-ভাটা এবং সামান্য দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতেও ভয়ংকর হয়ে উঠে এই নৌপথ। কিন্তু প্রাকৃতিক এই ভয়াবহতা মোকাবেলা করতে নেই ন্যূনতম ব্যবস্থা! প্রশাসনের উদাসীনতা এবং ঘাট কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা চলছে বছরের পর বছর। এভাবে দীর্ঘ সময় ধর ঘটে আসছে প্রাণহানিকরসহ নৌ-দুর্ঘটনা। এমন এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন কক্সবাজারের সম্পদ, সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের পিতা রফিক উল্লাহ। যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার মুক্তিসংগ্রাম কমিটির চারজনের একজন ছিলেন। এমন একজন মানুষকে হারিয়েও বোধহয় হয়নি এ যাবতকালের দায়িত্বশীলদের। এভাবে এই পথে নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে বহু মানুষের। প্রাণহানি না হলেও বোট ডুবি এবং মুখোমুখে সংঘর্ষের ঘটনা নিত্য ঘটে চলেছে। সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর বোট থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেলো তোফাইল মাহামুদ।

তথ্য মতে, মহেশখালী-কক্সবাজার নৌ-রুটের প্রধান সমস্যা নৌ চলাচলে চরম অব্যবস্থাপনা। মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কর-ঝক্কর বোট এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক দিয়ে বোট চলাচল, স্পীড বোট চালকদের প্রতিযোগিতামূলক বোট চালানো, লাইফ জ্যাকেট বিহীন যাত্রী পরিবহণ, বোট চলাচলের পথে জাল ফেলানো, ভাড়া এবং আচরণ নিয়ে বোট চালক ও ঘাটের দায়িত্বরত লোকজনের চরম দুর্ব্যবহার, লক্কর-ঝক্কর জেটিঘাট। এ সমস্যাগুলো নিত্যই ভোগাচ্ছে এই নৌপথের যাত্রীদের। এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছে মহেশখালীর মানুষ। বহু সরকার এবং বহু জনপ্রতিনিধি বদল হলেও দুর্ভোগের শেষ হয়নি! শুধু আশার বাণীটাই পাওয়া গেছে পুরোটা সময়!

ফেরির বাস্তবায়ন আর কত দূর: মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করতে ফেরি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো ২০১৬ সালে। ফেরি চালুর জন্য সম্ভাব্য সব কার্যক্রমও প্রায় সম্পন্ন হওয়ার কথা জানানো হয়েছিলো। এর অংশ হিসেবে ওই বছরের ১৮ জুলাই পরিদর্শনে এসেছিলেন নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের একটি বড় প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধিদল ফেরিঘাট স্থাপনের জন্য শহরের বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট, নুনিয়াছটা, ৬ নম্বর ঘাট, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, মহেশখালীর গোরকঘাটাসহ আটটি স্থান পরিদর্শন করেছিলেন। পরিদর্শন শেষে ওই দিন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় তৎকালীন যুগ্ম সচিব মো. নুর-উর রহমান জানিয়েছিলেন, এখানকার মানুষের দাবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রচেষ্টায় সরকার কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথে ফেরিঘাট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে পরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোনো একটি স্থান নির্ধারণ করে ফেরিঘাট স্থাপনের কাজ শুরু হবে। কিন্তু ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি!

বোট মালিক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: বহুকাল ধরে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথ বাণিজ্য করে বহু সম্পদের মালিক হয়েছে অনেকে। এ তালিকায় রয়েছে বোট মালিক, ইজারাদার, প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তি এবং ঘাটের দায়িত্বরত লোকজন। এই নৌপথের যাত্রীদের জিম্মি এবং সরকারি রাজস্ব মেরে দিয়ে এদের অনেকে হয়েছে ‘আঙুল ফুলে কলা গাছ’! এই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন এই নৌপথকে দুধ দেয়া গাভি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এমনকি বংশ পরম্পরায়ও তাদের দৌরাত্ম্য চলে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই নৌপথে যাত্রী পরিবহণের সাথে জড়িত এই সিন্ডিকেটটি চায় না ফেরি চালু হোক। ফেরি চালু হলে তাদের ‘টাকার খনি’ ফুটো হয়ে যাবে! সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও ফেরি চালু না হওয়ায় যাত্রীরা এই সিন্ডিকেটকে প্রধান দায়ী করছেন। সরকার যাত্রী পরিষেবা সহজ ও নিরাপদ করতে উদ্যোগ নিলেও এই সিন্ডিকেটটি এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে তদবির করে ফেরি চালুর কার্যক্রমকে স্তব্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অপসিন্ডিকেটটি ভেঙে না দিলে ফেরির স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না বলে মনে সচেতন মহল!

আর কত মৃত্যু?: মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথের দুর্ঘটনার ইতিহাসে হয়তো অমর হয়ে থাকবেন কক্সবাজারের সম্পদ, সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের পিতা রফিক উল্লাহ। যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার মুক্তিসংগ্রাম কমিটির চারজনের একজন ছিলেন। দুর্ঘটনা যদি এই মানুষটিকে কেড়ে না নিতো তাহলে তিনি কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধের মতো আরো অনেক অনেক অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি। এভাবে বহু মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে এই নৌপথের দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর বোট থেকে পড়ে গিয়ে নিখোঁজ এবং ২২ সেপ্টেম্বর সোনাদিয়ার চরে লাশ উদ্ধার হওয়া তোফাইল মাহামুদ। মেধাবী এই কলেজ ছাত্রও হয়তো দেশের জন্য, মানুষের অবদান রাখতে পারতেন। শুধু কি তাই? অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলো কত স্বজনকে সারাজীবনের হারানোর শূন্যতায় ডুবিয়ে দিয়েছে?

‘জীবন হাতে নিয়ে’ পারাপার!: বৈশ্বিক উঞ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে। সে কারণে সাগরের উত্তালতাও বাড়ছে। এভাবে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথের উত্তালতা বেড়েছে। গত ১০ বছরে এই উত্তালতা বেড়েছে অনেক বেশি। তাই বছরের অন্তত ৯ মাস উত্তাল থাকে এই নৌপথ। পূর্ণজোয়ারে এবং ভাটা টানের সময় ভয়াল উত্তাল থাকে সাগর। বাতাস বাড়লে এবং বৃষ্টি ও আবওহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হলেও ঝুঁকি বাড়ে। এসময় স্পীড বোট চলাচল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। ঢেউ থাকলে প্রতিটা মুহূর্ত আশঙ্কা থাকে। ঢেউয়ের তোড়ে স্পীডবোট প্রায় সময় উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। অনেক সময় তাল ধরে রাখতে না পারলেই উল্টে যায়। সকাল ১১ থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই ঝুঁকি বেশ মারাত্মক পর্যায়ে থাকে। তাই অনেকে এসময় ভয়ে চলাচল করে না। তবে যাদের জরুরী তারা পার হয় ‘জীবন হাতে নিয়ে’।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শ্রাবস্তী রায় বলেন, ‘মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে দুর্ঘটনা বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। একজন ছাত্রও মারা গেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। নৌ-দুর্ঘটনা রোধে যদি ফেরি চালুতেই সমাধান হয় তাহলে সেটা হওয়া উচিত। চলাচলকারীরা ফেরির দাবির তুলেছে। আজকে (২২ সেপ্টেম্বর) ইউএনওকে স্মারকলিপিও দিয়েছে। সেটা আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেয়া আহŸান জানাবো।’ তবে ২০১৬ সালের ফেরি চালুর প্রক্রিয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে জানান উপ-পরিচালক শ্রাবস্তী রায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •