এম.আর মাহমুদ 

জনপ্রিয় শিল্পী মান্না দে’র কণ্ঠে সে আলোচিত গানটি বার বার মনে পড়ে “তুমি কি সেই আগের মতই আছো নাকি বদলে গেছো, খুব জানতে ইচ্ছে করে।” আসলে গানটি মনে পড়ার কারণ পুলিশের বর্তমান কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে পুলিশ চরমভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খানের হত্যাকান্ডের পর টেকনাফের শামলাপুর পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক (বরখাস্তকৃত) লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সিংহপুরুষ হিসেবে খ্যাত (বরখাস্তকৃত) ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ বেশ ক’জন পুলিশ ও পুলিশের দায়েরকৃত মামলার ৩ সাক্ষী কারাগারে যাওয়ার পর থেকে পুলিশের রুটিন মাফিক কার্যক্রম ছাড়া দৃশ্যমান কোন অভিযান পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

মেজর সিনহা হত্যা মামলা কক্সবাজার র‌্যাব-১৫’র একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তদন্ত করে যাচ্ছে। এ মামলায় আটক সবক’জন আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু মামলার ২নং আসামী প্রদীপ কুমার দাশ ১৫ দিন রিমান্ডে থাকার পরও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়নি। কথায় আছে “বাইন মাছ সবসময় কাদায় থাকলেও গায়ে কোন কাদা লাগে না। সবসময় বাইন মাছ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে।” আসল কথা হচ্ছে মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খান হত্যার পর পুলিশ চরমভাবে বিতর্কিত হয়েছে। তবে এ ঘটনার দায় নির্দিষ্ট কিছু পুলিশের, পুরো পুলিশ বাহিনীর নয়। পুলিশের কাজ দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

কক্সবাজারের সদ্য বদলী হওয়া পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে কক্সবাজার জেলার সবক’টি থানা ইয়াবামুক্ত করবে। সে মোতাবেক পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে ইয়াবা বিক্রেতা ও পাচারকারীদের গ্রেফতারে অনেকটা কঠোর হয়ে কাজ শুরু করেছিল। এরই মধ্যে অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলী, প্রদীপ বাবু ও নন্দলাল রক্ষিতের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এসপি মাসুদ সাহেবের মহৎ উদ্যোগটি ভেস্তে গেছে। এক্ষেত্রে একটি কথা না বললে হয় না ‘একটি গাড়ীর সবক’জন যাত্রী পাগল হলেও সমস্যা হয় না, কিন্তু চালক পাগল হলে বিপর্যয় অনিবার্য।’ সীমান্ত হয়ে প্রতিদিনই কক্সবাজারের আনাচে কানাচে ইয়াবা ভাইরাল হয়ে পড়ছে। মাঝে মধ্যে সোর্সের সংবাদের উপর নির্ভর করে র‌্যাব ও বিজিবি বড় বড় ইয়াবার চালান জব্ধ করছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাচারকারী ধরা পড়ছে না। ইয়াবা জব্ধের ক্ষেত্রে র‌্যাব ও বিজিবিকে খাটো করে দেখার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তারাও ইয়াবা পাচার বন্ধে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে শুধু ইয়াবা ধরা পড়লে ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে এমনটা ভাবার কোন যুক্তি নেই। কারণ মূল পাচারকারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা বার বার রয়ে যাচ্ছে অধরা। মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খান হত্যাকান্ডের পর পুলিশ কর্তৃক ইয়াবা আটকের ঘটনা অনেকটাই দৃশ্যমান হচ্ছে না। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ উক্তিটি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। মানুষ বিপদে পড়লেই এগিয়ে আসে পুলিশ। দিন নেই রাত নেই পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতেই হচ্ছে। রাস্তার পাগলী মা হওয়ার জন্য যখন প্রস্রব বেদনার যন্ত্রণায় ছটফট করে তখনই পুলিশ এগিয়ে যায়। মহা সড়কে যখন বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটে তখনও পুলিশ সেখানে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে কৃপণতা করে না। করোনা মহামারী চলাকালীন বাংলাদেশ পুলিশ সত্যিকার অর্থে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। যা সর্বমহলেই প্রশংসিত হয়েছে। বিপদগামী ক’জন পুলিশের কারণে সমগ্র পুলিশ বাহিনী যদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন না করে তাহলে দেশের আমজনতার জানমালের নিরাপত্তা দেবে কে?

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের আইন শৃঙ্খলা সভায় পরিষদের একজন সম্মানিত সদস্য আক্ষেপ করে বলেছেন, বর্তমানে সীমান্ত পথে যে পরিমাণ ইয়াবা এনে মওজুত করেছে তা শেষ করতে ৫ বছর সময় লাগবে। তাহলে অকপটেই বলা ভাল সীমান্ত অরক্ষিত। আমরা যা দেখছি তা হচ্ছে “সোনা বাহিরে আচল ঢাকার মত”। না বলে উপায় নেই জেলার ৮টি থানায় বিভিন্ন মামলাভূক্ত পলাতক আসামীরা ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের দিকে পুলিশ এখন নজর দিচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা দুঃখ করে বলেছেন, কিভাবে অপরাধীদের আটক করব? ক’দিন পরেই আদালতে গিয়ে কোন না কোন অজুহাতে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। গত শুক্রবার বিকালে চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, লোহাগাড়া, চন্দনাইশসহ বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত একাধিক মামলার একজন পলাতক আসামী (খ্যাতিমান গরু চোর) মোটর সাইকেল যোগে চকরিয়া থানার সামনে রাস্তা দিয়ে চলে যেতে দেখে বেশ ক’জন সংবাদকর্মী হতভাগ হয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছে সত্যি পুলিশ মামলার ভয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে সাহস পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বলতে হয় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির একটি আলোচিত উক্তি “আমি তো অবাক, মৌচাকে কাক!” যাক আমরা শুধু পুলিশের দোষ খুঁজে বেড়াই। সহজে পুলিশের ভাল দিকগুলো জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে চাই না। এটা আমাদের কৃপণতা। পুলিশের সৎ, বিনয়ী ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা কর্মচারী “যেমনি আছে তেমনি সবাই যে আবার ধোয়া তুলসী পাতা তাও বলা যাবে না।” কক্সবাজারে সদ্য বিদায়ী পুলিশ সুপার একেএম মাসুদ সাহেব একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। হয়তো তিনি প্রদীপ বাবু ও লিয়াকত আলীর মত পুলিশদের অতি বিশ্বাস করতে গিয়ে বিধিবাম হয়েছে। এখানে না বললে হয় না হয়তো ইয়াবা পাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা আলোচিত ওইসব পুলিশদের দিয়ে চৌকস সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খানকে হত্যা করেছে। হয়তো তারা ভুলেও কল্পনা করেনি এ ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হবে। প্রদীপ বাবুরা মনে করত ‘যে বাঘ একবার নরম মাংসের স্বাদ পেয়েছে, সে বাঘ কখনও অন্য মাংস ভক্ষণ করতে চায় না।’ ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে ইয়াবা পাচার বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া সেই আলোচিত পুলিশ সুপার কক্সবাজার জেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন। নবাগত এসপি হাসানুজ্জামান সাহেব কক্সবাজারে বদলী হয়েছেন। তিনি শক্ত হাতে ৮ থানার কর্মকান্ড গতিশীল না করলে ইয়াবা পাচার, বিক্রি ও সেবন বন্ধ যেমন হবে না তেমনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বিজ্ঞ একজন পুলিশ সুপার; না হয় হাসানুজ্জামান সাহেবকে বর্তমান নাজুক অবস্থায় কক্সবাজারের মত জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ দিতেন না। উনার কাছ থেকে আমরা আশা করব জেলার পুলিশ অতীতের মত ইয়াবা পাচার রোধ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থা নিয়ে বিশ্বের নান্দনিক পর্যটন এলাকার সুনাম ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এ কারণে প্রিয় শিল্পী মান্না দে’র গানটি চ্যারিটি করে বলতে হয় “পুলিশ কি সে আগের মতই আছে, নাকি বদলে গেছে, খুব জানতে ইচ্ছে করে।”

 

এম.আর মাহমুদ, চকরিয়া।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •