দিনুর আলম


আহমদ শফি হুজুর যেদিন বলেছিলেন ‘নারী তেঁতুলের মতো, তেঁতুলের মতো’ মূলত সেদিন থেকেই সংখ্যাগরিষ্ট জন ওনাকে চিনেন। সেদিন থেকে অনেকেই ওই একটি কথা দিয়ে ওনার আদর্শ, ওনার আমলনামা নিজ থেকে তৈরি করে নিয়েছিলেন। শফি হুজুরের বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও যারা নারীকে আদতেই তেঁতুল মনে করে তারাও বীরদর্পে ঝাপিয়ে পড়লেন তাঁর উপর। দেশের পাগল আর গুটিকয়েক মোল্লা ছাড়া বাকি সবাই নারীর অধিকার রক্ষায় ফেসবুক ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন।
ওই বক্তব্য আমিও নিজ থেকে প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু শফি হুজুরকে প্রত্যাখ্যান করিনি।
কারন কাউকে মুখের কথায় প্রত্যাখ্যান করায় তেমন কিছু হয়না এবং করাও যায়না আসলে।
‘শক্তির ধ্বংস বা বিনাশ নেই কেবল রূপান্তর হয়।’ মানুষ মাত্রই শক্তির আঁধার। শফি হুজুরের ব্যক্তিগত এবং দলীয় শক্তিকে আপনি নানা ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন,মন চাইলে আপনি সে শক্তিকে অপশক্তিও বলতে পারেন, কিন্তু অপশক্তিকেও আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। সেই থেকে শফি হুজুর অনেকের কাছে ফোবিয়া হয়ে উঠলেন। মূলত তারা ব্যক্তি শফি হুজুরকে নয় বরং তাঁর দল হেফাজত অর্থেই শফি হুজুরকে জানতেন এবং মানতেন। শাপলা চত্বর কাহিনীর পর এই ফোবিয়া আরো গেঁড়ে বসলো এক শ্রেণির মনে। আওয়ামিলীগকে যারা সুবিধাবাদী বলে মুখে ফেনা তুলে তারাও শাপলা চত্বরের অ্যাকশন নিয়ে মহাখুশি! তাদের অনেক দিনের খায়েশ মিটেছে যে, মোল্লাদের শক্তমতো পেঁদানি দিয়েছে।
এই ঘটনায় দুই শ্রেণির মানুষের নগ্ন উল্লাস দেখেছিলাম প্রথমত যারা নিজেদের সেকুলারিস্ট বলে দাবি করে তারা আর কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। যারা সভা সমাবেশ করতে না পারায় দিনরাত সরকারের মা-বোনকে রেহাই দিচ্ছেনা তারাও শাপলা চত্বরের মহা সমাবেশ নিয়ে নাখোশ ছিলেন। এই নাখোশ হওয়ার কারন যতটা না সমাবেশের বিশৃঙ্খলা তারচেয়ে বেশী দোষপর ছিল এই সমাবেশ মোল্লাদের। শফি হুজুর ফোবিয়া তারা মন থেকে মুছতে পারেনা।

মোল্লারা সমাবেশ করলে বাংলাদেশ বাংলাস্থান হয়ে যাওয়ার আশংকা করেন তারা। কোনো এক মা বোরকা পরিধান করে হাতে ব্যাট তুলে নিলে এরা তাঁকে আফগানী মা বলে ওই মায়ের জাতীয়তা খারিজ করে দেন। এরা নিজেদের সেকুলারিস্ট হিসেবে জাহির করেন। এদের কাছে ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম,মঙ্গল শোভাযাত্রা পবিত্র কিন্তু দাঁড়ি-টুপি, মহররম, তাজিয়া মিছিল এসব অপবিত্র।
এদের কাছে যতটা না ভয়ঙ্কর পুরোহিত, ভান্তে, ফাদার তাঁর চেয়ে হাজার গুণ ভয়ঙ্কর মোল্লা।
সফেদ পাঞ্জাবি -পায়জামা আর মুখে দাঁড়ি হয়ে উঠে জঙ্গী চিহ্ন। তার উপর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী কিংবা মোল্লা হলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়।
শফি হুজুর ফোবিয়া আলাদা কোনো ফোবিয়া নয়। যে বিশ্বাসে এরা পুরোহিত, ভান্তে, ফাদার অপেক্ষা মোল্লাকে অধিক ভয়ঙ্কর মনে করে ঠিক একই বিশ্বাসে আহমদ শফি তাদের কাছে ফোবিয়া। এদের মূলত আমি সেকুলারই বলি তবে আরো একটি অতিরিক্ত উপাধি যোগ করে বলি টাউট সেকুলারিস্ট।
চোখ বন্ধ করে যারা একটি শক্তিকে অস্বীকার করতে চায়, একটি মতাদর্শকে বাতিল করতে চায়, একটি ধর্মকে হামেশা ভয়ঙ্কর বলে চালাতে চায় এদেরকে এর চেয়ে ভালো উপাধি দিতে অক্ষম আমি।
নারীকে কেবল শরীর সর্বস্ব কি শুধু শফি হুজুর সংজ্ঞায়িত করেছেন? আর কেউ করেনি? তখন টাউট সেকুলারিজমমের চেলারা এটাকে সাহিত্য বলে গ্রহণ করেছে। তো আহমদ শফি তো সাহিত্যিক নয় তাই তাঁর বয়ান সাহিত্য বিবর্জিত, নীরস শব্দ চয়ন এবং সরাসরি আক্রমন। তেঁতুল সমাচারের পর তসলিমা নাসরীন কলম ধরেছিলেন এবং লিখেছিলেন ‘ অনেকেই তো আপেলের মতো, কমলার মতো, ডাবের মতো বলেছিল, লিখেছিল তখন তো কারো সমস্যা হয়নি আর আহমদ শফি তেঁতুলের মতো বলায় সবাই রি রি করছে।’ অথচ আজ তসলিমা নাসরীন ও আহমদ শফীকে নিয়ে ভক্তদের ভালোবাসার আগুনে জ্বলে পুড়ে আহত হয়ে সুর পাল্টালেন।
আমি বলবো এই যে একপেশে সমর্থন এটাই মূলত আহমদ শফি ফোবিয়া। এই ফোবিয়া কেবল টাউট সেকুলারিস্টদের বৈশিষ্ট্য।

কেউ কেউ লিখেছেন আহমদ শফি একজন পরাজিত জেনারেল। হ্যাঁ জেনারেল বৈকি! তবে সফল জেনারেল। ৮৬ সাল থেকেই গতকাল পর্যন্ত তিনি সফল জেনারেল। তাঁর মতো দীর্ঘ সময়ের সফল জেনারেল বাংলাদেশে আরেকটা ছিলনা। জেনারেল তো আপনাদেরও ছিল তারা তো বেশী দিন ঠিকতে পারেনি, সর্বোচ্চ এক দশক। আহমদ শফি এবং তার মুরিদরা যে মতাদর্শ লালন করে তাতে এরকম দীর্ঘ জেনারেলগিরি সম্পূর্ণ জায়েজ। এখন যা হয়েছে তা মূলত নয়া জেনারেল বনে যাওয়ার খায়েস যাদের হয়েছে তাদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে।
হাটহাজারীর বিশৃঙ্খলা দেখে যারা মুচকি হেসেছে তারা আহমদ শফির মৃত্যুতেও খুশি হয়েছে বৈকি! কিন্তু তাঁর জানাজায় উপস্থিতি দেখে তাদের ধুতি খসে পড়েছে। যে ছাত্র-শিক্ষকরা তাঁকে অবরুদ্ধ রেখেছিল, স্লোগান দিয়েছিল তারাই হুজুরকে শেষবার দেখার জন্য আবার স্লোগান ধরেছে। ওই সব শিক্ষাক-শিক্ষার্থীসহ তাঁর লাখ লাখ ভক্ত হাটহাজারি পূর্ণ করেছে।
উস্কানিদাতা আপকামিং জেনারেল কেঁদেছেন কী না তা জানার সুযোগ হয়নি, তবে হাটহাজারী কেঁদেছে, কওমী জনতা কেঁদেছে।
যার যার কর্মের হিসাব সে দেবে উপরওয়ালাকে। উপরওয়ালা, শাহ আহমদ শফির নাজাতের ব্যবস্থা করুন, আমীন।


লেখক :  শিক্ষার্থী কক্সবাজার আইন কলেজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •