আকতার চৌধুরী

তার নামটা মনে নেই । ৯০ এর দশকের যে কেউ দেখলেই তাকে চিনবেন। টিভি নাটক , সিনেমা বা বিজ্ঞাপনের বদৌলতে তার যথেষ্ট পরিচিতি ছিল।

আমি তখন র‌্যাংগস এ চাকরী করি। কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট বিজয় সরণীর মোড়ে হোটেল হলিডের নিচে এ শো রুমটি । কক্সবাজারের প্রথম শো রুম এটি। উপরে হোটেল। প্রায়ই স্যুটিং পার্টি এসে এখানে থাকত। তখনো কলাতলী হোটেল মোটেল জোন হয়নি। সে কারণে অনেক স্টারও এই এলাকার হোটেলগুলোতে থাকত।

প্রথম দিন কেউ একজন এসে আমার সাথে পরিচয় করে দিয়েছিল। তারপর থেকে দেখি সে আমার শো রুমে এসে বসে থাকত। টিভি দেখত।

ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসতে বলে প্রথম দিন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সে উল্টো আমাকে আশ্বস্ত করলো চেয়ার ভাঙ্গবেনা ! অটবির চেয়ারে সে বসে দিব্যি ডানে বায়েও ঘুরছিল। কিন্তু সবসময়ই টেনশন করতাম এই বুঝি চেয়ার ভেঙ্গে পড়ল।

যখনই তার শ্যুটিং থাকতনা আমার কাছে চলে আসত। কেমন জানি তার সাথে আমার একপ্রকার ভাব জমে যায়।

বেশী কিছু খেত না । কলা বিস্কিট হালকা নাস্তা । একদিন দুপুরের আমার একজনের ভাতও শেয়ার করে খেলাম দু’জনে । তারপরও সে অস্বাভাবিক মোটা । পরে জেনেছিলাম এটা তার রোগ। চিকিৎসারও অনেক খরচ । পোষাতে টুকটাক অভিনয় অফারে চলে আসে কক্সবাজার ।

সে পথে ঘাটে হাটতে পারে না মোটা শরীর নিয়ে । কোথাও গেলেও শান্তি নাই । টোকাইরা পেছনে লেগে থাকে। ঠাট্টা ,মশকারি , কটুক্তি , গায়ে হাত দিয়ে দুষ্টুমিতে সে অতিষ্ঠ ছিল। একদিকে মোটা শরীরের যন্ত্রণা , আরেকদিকে মানুষের অবজ্ঞা । কোথাও শান্তি নেই ।

কয়েকদিন পরে সকালে আবার এলো শো’রুমে।
বলল, আজ চলে যাব । সবাই ছবি তুলছে আমার সাথে , আপনি তুলবেন না ?
ছবি তুলে আমাকেও দিবেন।
আরো বলল,এ ক’দিনে সবাই আমাকে নিয়ে অনেক ঠাট্টা মশকারা করছে ।
আপনি কোনদিন করলেন না । তাই আপনার এখানে এসে বসে থাকতাম!

আজ সত্যি ভাল লাগছে , সেও আমাকে আপন মনে করেছিল। তার দুর্বলতার সুযোগ আমি নিই নাই।

অনেকদিন পর শুনেছিলাম , আমার সেই মোটা বন্ধুটি আর বেঁচে নেই । বন্ধুটির আত্মার শান্তি কামনা করছি। কিন্তু তার সাথে তোলা ছবিগুলো আমার কাছে স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে ।

যেখানে একজন মোটা মানুষের সাথে একজন পাতলা মানুষের ক্ষণিকের বন্ধুত্বের কাহিনী মনে করিয়ে দেয় – কারো দুর্বলতার সুযোগ নিতে নেই, কাউকে অবজ্ঞা করতে নেই।


লেখক: সম্পাদক , কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •