বাংলাট্রিবিউন:

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে যে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, সেটি দেখে ভালো লেগেছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দলের অনেকের। দলের অধিকাংশ সদস্য ভাসানচরের আবাসন প্রকল্পের অবকাঠামো দেখে সন্তুষ্ট। তবে সেখান থেকে ফিরে পুরো অভিমত প্রকাশ করতে চান রোহিঙ্গা নেতারা।

গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পৌঁছেছেন দুই নারীসহ চল্লিশ জন রোহিঙ্গা নেতা। ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবির থেকে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা ওই দ্বীপে পাঠানোর অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতিনিধি দলটির মঙ্গলবার ভাসানচর থেকে টেকনাফে ফেরার কথা রয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যায় ভাসানচর থেকে মুঠোফোনে রোহিঙ্গা নেতা মোস্তফা জানান, ‘সকাল ১০ থেকে দুপুর পর্যন্ত গাড়িতে করে ভাসানচর ঘুরে দেখেন তিনিসহ ৪০ জন রোহিঙ্গা নেতা। সাগরের বুকে জেগে ওঠা এই চরে গড়ে তোলা স্থাপনাগুলো ভালো লেগেছে। সেখানে শান্তির পরিবেশ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘শুরুতে তাদের খাদ্য গুদাম দেখানো হয়। তবে সেটি খালি ছিল। এরপর আশ্রয় সেন্টার, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, খেলার মাঠ ও কবরস্থানসহ মাছ চাষের পুকুর পরিদর্শন করেন। এছাড়া সেখানে বিভিন্ন প্রকার সবজির বাগানও দেখেছেন তারা। পাশাপাশি সাগরের তীরে কেওড়া বাগান দেখে অনেকে মুগ্ধ হয়েছেন। সব মিলিয়ে যদি বলি, (রবিবার পর্যন্ত) সরকারের গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পগুলো খুবই চমৎকার লেগেছে। কাল (সোমবার) পুরো প্রকল্প দেখে বিস্তারিত বলা যাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাসানচর দেখতে যাওয়া আরেক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘চার ঘণ্টা ভাসানচর ঘুরে দেখেছি আমরা। যা দেখেছি সবই ভালো লেগেছে। এখানে আমাদের খুব ভালো আপ্যায়নও করা হচ্ছে। তবে সাগরের বিষয়টিতেই মনে একটু ভয় লেগেছিল। কালও ভাসানচর ঘুরে দেখানো হবে আমাদের। ঘোরার এক ফাঁকে সেখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। তবে সেখানে তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে সেটি বলতে রাজি হননি এই রোহিঙ্গা নেতা।

ভাসানচরে রোহিঙ্গা নেতাদের প্রজেক্টরের সাহায্যে ভিডিও ডক্যুমেন্টারি দেখানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে অবগত করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে হাতিয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) গোলাম ফারুক বলেন, ‘রবিবার দুপুরে ভাসানচর ঘুরে দেখেন কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দল। এ সময় তাদের আনন্দিত দেখা গেছে। এছাড়া ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তারা দেখা করেন। তবে তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে সেটি আমরা বুঝতে পারিনি।’

উল্লেখ্য, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পাঠাতে আগ্রহী বাংলাদেশ সরকার। এজন্য রোহিঙ্গা নেতাদের একটি দলকে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় গত শনিবার টেকনাফ থেকে ভাসানচরে নিয়ে আসে সরকার। প্রতিনিধি দলটি চট্টগ্রাম হয়ে শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ভাসানচরে পৌঁছায়। তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে কী কী ধরনের ব্যবস্থা রেখেছে তা বর্ণনা করা হয়। এরপর তাদের দিনভর পুরো এলাকা ঘুরিয়ে দেখানো হয়। আগামীকাল সোমবারও তারা পুরো প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখবেন। এরপর আগামী মঙ্গলবার তাদের টেকনাফের ক্যাম্পে ফিরে যাওয়া কথা রয়েছে।

এই পরিদর্শনের সঙ্গে জড়িত সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচর পরিদর্শন করছেন। তাদের সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখানো হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এতে তাদের আগে থেকে যে ভীতি কাজ করছিল সেটা কেটে যাবে এবং রোহিঙ্গা নেতারা দেখে এসে অন্যদের বোঝাবেন। এর ফলে তারা ভাসানচর যেতে রাজি হবেন।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা সাগরপথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এমন ৩৬১ জনকে গত মে মাসে এনে রাখা হয়েছে ভাসানচরে।

রোহিঙ্গারা যাতে স্বাধীনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন সেজন্য এই দলের সঙ্গে কোনও এনজিও বা শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি রাখা হয়নি। গণমাধ্যমকর্মীদেরও এই সফরে রাখা হয়নি। রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য কেবল আরআরআরসি কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তা সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছেন।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় ভাসানচরের জন্য নেওয়া প্রকল্পের খরচ ৭৮৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি টাকা বাঁধের উচ্চতা ১০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৯ ফুট করা, আনুষঙ্গিক সুবিধা বৃদ্ধিসহ জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের জন্য ভবন ও জেটি নির্মাণে খরচ হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •