ড.আব্দুস সাত্তার,ওয়াশিংটন ডি,সি :


টিনেজার সময়টা খুবই ক্রিটিকাল। বাবা মা তাদের টিনেজার সন্তানদের নিয়ে অনেক সময় চিন্তায় পরে যান। এই সময় টিনেজার ছেলেমেয়েরা এমন কিছু কার্যকলাপ করে যা তাদেরকে আজীবন ভুগতে হয়। টিনেজার একটি ইংরেজী শব্দ। Teenager=Teen+ Age টিন হচ্ছে ইংরেজিতে যেসব সংখ্যার শেষে Teen রয়েছে অর্থাৎ 13,14,15 ,16, 17, 18, 19 তাই ১৩ থেকে ১৯ বছরের ছেলেমেয়েদেরকে টিনেজার হিসাবে ধরা হয়। আমাদের সমাজে বাবা মায়েরা টিনেজারদের তেমন গুরুত্ব দেয়না। বাবা মা মনে করেন ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে তাদের ভালো মন্দ তারা বুঝে নিবে। এই ভাবনাটা একেবারে ভুল। প্রতিটি বাবা মায়ের উচিত টিনেজার ছেলেমেয়েদের আলাদা যত্ন নেওয়া।

টিনেজার বয়স ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন এক জগত। এ সময় ছেলেমেয়েদের শরীরের নিঃসৃত যৌন হরমোনগুলো মন মেজাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এই সময় তারা নিজেদেরকে নায়ক নায়িকা ভাবতে থাকে। আর এই ভাবনা থেকেই তারা ফেইসবুক , টুইটার , হটসআপ, ভাইভার, ইমু , ভিডিও কল,,টিকটক ও ম্যাসেঞ্জার নিয়া সারাদিন কাটিয়ে দেয়। এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে রাত কাটিয়ে দেন। যার ফলে তাদের মাঝে প্রেমের নেশা পেয়ে বসে। বয়স টিন হওয়াতে প্রেমের সফলতা বাস্তবায়ন করার জন্য তারা জীবন বিলিয়ে দিতে চায়। তাই দেখা যায় বাবা মায়ের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে এমনকি তাদের সাথে বনিবনা হয় না।

টিন বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখে থাকে আর কোন কারনে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হলে অতি দ্রত তারা হতাশ হয়ে যান। আর এই হতাশা থেকেই তারা মাদক আসক্ত,যৌন কার্যকলাপ হয়ে আস্তে আস্তে অসুস্থতায় ভুগতে থাকে। এই সময় তাদের মাথা যন্ত্রণা নিদ্রাহীনতা ও পরিবারের লোকজনদের সাথে খারাপ ব্যাবহার এমনকি স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং বিভিন্ন ক্রিমিনাল কার্যকলাপ করে। অনেক টিন ছেলেমেয়েদের বেশী মানসিক চাপ নেবার ক্ষমতা থাকে না তাই দেখা যায় অনেক টিন আত্মহত্যা করতে চায়।

আমি অনেক টিন এজারদের কাছে জানতে চেয়েছি কি সমস্যা তাদের? উত্তরে টিনএজাররা অভিযোগ কেউ তাদের বোঝে না বা বুঝতে চায় না। সবাই চায় তাদের চোখের ইশারায় বা না বলার আগেই বাবা মা তাদের চাওয়া পাওয়া বুঝে ফেলুক। অনেকেই বলেছে তাদের বাবা মা Back-dated.বাবা মা নাকি 1932 সালের ফোর্ড মডেল 18 আর তারা নিজেরা নাকি BMW M3 মডেল!! সবচেয়ে বেশী মাকে নিয়ে তাদের হাজারো অভিযোগ। তারা নাকি তাদের বন্ধুদের বাবা মায়ের মত স্বাধীনতা দেয় না, নিজের ইচ্ছামত ঘুরতে দেয় না, খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে,সব ব্যাপারে খবরদারী করে,বারবার পড়তে বলে,ঘুমাতে যেতে বলে রাত ৯টায়, শুধু তাইনয় নতুন নতুন মুভি ও প্রিয় তারকাদের কনসাট গুলো দেখতে যেতে দেয় না। এমনকি তাদের পছন্দের জামা কাপড়,চুল কালার বা চুল বড় করলে দুনিয়ার বানী শুনিয়ে দেয়। এই সব কিছুই টিনএজারদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।

প্রতিটি বাবা মার ইচ্ছে তাদের ছেলে/মেয়ে স্কুলে ভালো রেজাল্ট করবে। সবার যোগ্যতা যে সমান হয় না একথা অনেক বাবা মা মানতে নারাজ। তাদের মতে ঐ ছেলে/মেয়ে যদি ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারে তবে তাদের ছেলে/মেয়ে কেন পারবে না? বাবা মায়ের কাছে একটা প্রশ্ন রাখা যায় ‘ক্লাসের সব ছেলের বাবা মা যদি একই কথা বলে তবে ক্লাসে
সেকেন্ড,থার্ড হবে কে? আর কোন বাবা মায়ের ছেলে লাস্ট হবে? কিছু কিছু বাবা মা তাদের সন্তানের জন্মের আগেই ঠিক করে রাখে তাদের সন্তান ডাক্তার বা ইজ্ঞিনিয়ার হবে। তাদের উদ্দেশ্য সাধু এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের সন্তানের যোগ্যতার দিকটিও তো দেখা উচিত। কতটুকু তাদের সামর্থ্য এটা ভুলে গেলে চলবে না। ছোটবেলা থেকে বাবা মায়ের চাপ খেতে খেতে বেশিরভাগ টিনএজার ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়ে। যখন তারা দেখে তাদর নিজস্ব ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না তখন অনেক টিনএজার ফেটে পড়ে বিদ্রোহ করে আবার অনেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই গুটিয়ে যাওয়া টিনএজারদের ভেতর সর্বদা একটা ভীতি কাজ করে। এতে করে তাদের স্বাভাবিক জীবনধারা ও মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ভয়ের কারণে তারা তাদের স্বাভাবিক যোগ্যতাটুকুও হারিয়ে ফোবিয়া’য় ভুগতে থাকে।

অনেক বাবা-মা টিনদের যথাযথ সময় দিতে পারে না। বেশিরভাখ সময়ই এটা হয় না। এটা বাবা মায়ের অক্ষমতা নয়। আসলে তাদেরকে হাজারো সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। পরিবারের ভরণপোষণ,চাকরিক্ষেত্র,আত্মীয় স্বজনের দেখা শোনা,নিজেদের দাম্পত্য সমস্যা,জীবনযাপনের ক্লান্তি এসব কারণে তারা অনেক সময়ই নিজ সন্তানের চাওয়ার
দিকে নজর দিতে পারেন না। পারলেও মাঝে মাঝে তাদেরকে উপেক্ষা করতে হয়। আবার চাকরিজীবী বাবা-মায়ের সন্তানেরা তাদের বাবা-মাকে কাছেই পায় না। কোনো কোনো অভিভাবক সন্তানকে অতি আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে গিয়ে নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে যায়। ফলে সন্তান যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

বাড়িতে টিনএজার থাকা মানে যেন একটা পারমাণবিক চুল্লী থাকা ,যেটা যে কোন সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। টিনএজ আগ্নেয়গিরির লাভা সবকিছুকে ভস্মীভূত করে দিতে পারে। তাই সকল বাবা মা টিনএজদের সাথে বন্ধু সুলভ আচরণ করা। তাদের চাওয়া -পাওয়ার নিয়ে তাদের সাথে খোলামেলা আলাপ করা। না থাকা সময় থেকে একটু সময় নিয়ে টিনএজদেরকে সময় দেওয়া। ট্রাস্ট বা বিশ্বাস যে কোন সম্পর্কের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি আপনার টিনেজ সন্তানকে আপনার কথা শুনাতে চান, তাহলে আপনাকেও কিন্তু তার কথা শোনার সময় ও ধৈর্য থাকতে হবে। আপনাকে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। একটি খোলা সম্পর্ক রাখুন সন্তানের সাথে, যেখানে আপনারা একে অপরের সাথে কিছু ভাগ করতে পারেন। যখন আপনি আপনার জীবন এবং কর্ম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো আপনার টিনেজ সন্তানের সাথে ভাগ করেন, তখন আপনার সন্তান জানবে যে আপনি তাকে গুরুত্ব দেন এবং তার জীবনের বিষয়ে আপনার কাছে খোলাখুলি হতে পারে। সন্তানের মূল অভিভাবক পরিবার। পরিবার থেকে যদি সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়া হয়, ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষা দেয়া হয়, নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ দেয়া হয়, তাহলে টিনএজদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম থাকে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •