ষাটের দশকে অধিগ্রহনের টাকা নিয়ে গেছে পূর্বপুরুষ

গণপূর্তের উন্নয়ন কাজে ‘হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা’ এনে দখলকাজ চালাচ্ছেন মামলার বাদি!

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১০:৫১ , আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১০:৫৬

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোন কলাতলীতে খোলামাঠের আদলে তিনটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক তৈরী করছে গণপূর্ত বিভাগ। শহরের বাহারছরা গোলচত্তর মাঠ, কলাতলীর সী-প্যালেসের পূর্ব মাঠ ও লংবিচ হোটেল সংলগ্ন প্রধানসড়ক লাগোয়া গণপূর্তের নিজস্ব জমিতে এসব প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পে গোল চত্বর ও সী-প্যালেস অংশের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এলেও লংবিচ সংলগ্ন প্রকল্পটি কোন মতেই এগুতে পারছে না। ১৯৬৩-৬৪ সালে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানা দাবি করে একটি চক্র আদালতে একেক সময় একেক ধরণের অভিযোগ করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগ।

কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগ সূত্র মতে, নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতের কোথাও তাদের মালিকানার পক্ষে যথাযথ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি চক্রটি। ফলে প্রতিটি স্টেপে আদালত তাদের দাবি নাকচ করে দেয়। এরপরও উচ্চ আদালতকে সঠিক তথ্য সম্পর্কে অন্ধকারে রেখে প্রকল্পে ‘স্থিতাবস্থা বজায়’ রাখার নির্দেশনা এনে উন্নয়ন কাজ স্থিমিত করছে তারা। গণপূর্ত বিভাগ আদালতের নির্দেশনাকে সম্মান জানালেও ‘স্থিতাবস্থা’ আনা বাদি পক্ষ প্রকল্পের চারপাশে দোকানঘর তৈরী করে নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছে। এসব রদ করতে গেলে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের নামে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালায় ভূমি খেকো চক্রটি। এতে পিছিয়ে পড়ছে সরকারি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ।

গণপূর্তের কক্সবাজারস্থ নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহমদ জানান, কলাতলী সড়কের লাগোয়া লং বীচ হোটেলের বিপরীতে আর এস-১৭/৯১২৪ নং দাগের ৫ দশমিক ৪০ একর জমি ১৯৫৭ সালে সরকার কক্সবাজার স্বাস্থ্য নিবাসরূপে উন্নয়নকল্পে মহাপরিকল্পনার আওতায় এল এ মামলা নং-৩৯/৬৩-৬৪ মূলে পুরো জমি অধিগ্রহনকরা। অধিগ্রহনের পর ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসের ৬ তারিখে চুড়ান্ত গ্যাজেট আকারেও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ জরীপেও জমিটি গণপূর্ত বিভাগ, কক্সবাজারের নামে রেডর্কীয়। অধিগ্রহনকৃত জমিতে মাষ্টার প্ল্যান অনুযায়ী আবাসিক প্লট বরাদ্দের পর ব্যবহারকারিদের সুবিধার্থে ১ দশমিক ৫০ একর জমি খেলার মাঠ হিসাবে রাখা হয়। বর্তমানে পর্যটন জেলায় খেলার মাঠের স্বল্পতা এবং পর্যটকদের সন্ধ্যার পর হাটা-বসার সুযোগ না থাকায় উক্ত জমিতে একটি আধুনিক খেলার মাঠ কাম পার্ক নির্মাণে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রকল্পের আওতায় গণপূর্ত বিভাগ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে মাঠ উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগের মালিকানাধীন সেই উন্নয়ন প্রকল্পের ১ দশমিক ৫০ একর জমি দখলের পায়তারা করছে একটি চক্র।

তিনি জানায়, শহরের বাহারছরার অছিয়র রহমানের ছেলে গিয়াস উদ্দিন ঘোষনামূলক ডিক্রি পেতে বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত কক্সবাজারে অপর মামলা- ১৪৭/২০১১ দায়ের করেন। এটি চলাকালীন হাইকোর্টের দায়ের করেন সিভিল রিভিশন মামলা নং-১৬১৮/২০১৮। মহামান্য হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৩১ মে রুলনিশি জারী করে চলমান প্রকল্পে ৬ মাসের স্থিতাবস্থার আদেশ দিলে গণপূর্তের উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে গণপূর্ত বিভাগের আবেদনের প্রেক্ষিতে উক্ত স্থিতাবস্থার উপর ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি উচ্চ আদালত উভয় পক্ষের শুনানী শেষে ‘বিধি নিস্পত্তি’ করে কক্সবাজার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে চলমান অপর মামলাটি ৩০ দিনের মধ্যে শুনানী শেষে নিষ্পত্তির আদেশ দেন। সেই মতে ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট কক্সবাজারের বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত দীর্ঘ শুনানীর পর বাদী গিয়াস উদ্দিন কর্তৃক চাওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নামঞ্জুর করেন। এতে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় বাঁধা উঠে যায়।

কিন্তু যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়াস উদ্দিন উচ্চ আদালতে সিভিল রুল-৫৯৭ (এফএম) ২০১৯ দায়ের করলে হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট জমিতে চলমান কাজে ৬ মাসের ‘স্থিতাবস্থা’ দেন। সেই স্থিতাবস্থার মেয়াদ শেষ হবার আগে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আরো ৬ মাস মেয়াদ বাড়িয়ে আনেন বাদি।

নির্বাহী প্রকৌশলী আরো জানান, হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা উপেক্ষা করে মামলার বাদী গিয়াস উদ্দিন ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর গণপূর্তের সেই জমিতে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চালান। এতে সংশ্লিষ্ট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বাধা দিয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন (নং-৮০৮/২০১৯)। একই বছর (২০১৯) ২৬ ডিসেম্বর পর্যটন এলাকায় সরকারি জমিতে অবৈধ দখল বা স্থাপনা উচ্ছেদে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কর্তৃক নির্বাহি ম্যাজিষ্ট্রেট ও শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে চালানো অভিযানে অন্যান্য স্থানের মতো স্থিতাবস্থা আনা গিয়াস উদ্দিন কর্তৃক সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকাজও বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নিজের আনা ‘স্থিতাবস্থা’ অমান্য করে মামলার বাদী গিয়াস উদ্দিন চলতি বছরের ১ আগস্ট সরকারি ছুটির দিনে বিরোধীয় জমিতে অবৈধ ভাবে দোকান ঘর নির্মাণ শুরু করে। গণপূর্ত বিভাগের বাধার পরও মাঠের চারপাশে অবৈধ দোকান নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি ২৩ আগস্ট জেলা প্রশাসকসহ শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা থাকা জমিতে নির্মিত সকল অবৈধ স্থাপনা অপসারনে প্রশাসনের হস্থক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার জানান, জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখার নথি মতে, ঝিলংজা মৌজার বন্দোবস্তী খতিয়ান ১২২৪/২৯২ এর আরএস-১৭/৯১২৪ দাগের ৫ এশর ৪০ শতক জমি ৩৯/১৯৬৩-৬৪ এলএ মামলা মূলে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬ হাজার ৭৫০ টাকা সেই সময়ে কক্সবাজারের বাহারছরার আলী আহমদের ছেলে অছিয়র রহমান, মৃত ফকির মোহাম্মদের ছেলে আশরফজামান ও মকবুল আলীর ছেলে ফরোখ আহমদ গ্রহণ করেন। কক্সবাজার যুগ্ন জেলা জজ ১ম আদালতের অপর মামলা-১৪৭/২০১১ এর প্রয়োজনে প্রতিবেদন চাওয়ায় ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখার ০৫.২০.২২০০.১১৮.০৩.০২.১৯-২১৬ স্বারকে আদালতকে তা অবহিত করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, যুগ যুগ ধরেই জমিটি গণপূর্তের দখলে রয়েছে। বিগত কয়েক বছর পূর্বে একটি চক্র মালিক হিসেবে জাহির করে সরকারের অগোচরে চারপাশে ঝুপড়ি দোকান করে দখল বোঝানোর চেষ্টা চালান। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা কেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেট জমিটি হাতাতে অর্থ ঢালছে। তারা প্রয়োজনে সরকারের উচ্চ মহলকেও কৌশলে ব্যবহার করছেন।

স্থিতাবস্থা থাকা বিরোধীয় জমিতে কাজ করা সম্পর্কে মামলার বাদি মৃত অছিয়র রহমানের ছেলে গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমাদের জমিতে আমরা উন্নয়ন কাজ করি। উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থা ‘অবস্থানে’ নয় ‘দখলে’ দিয়েছে। এখানে আইন অমান্য হলে তা আদালত বুঝবে। বন্দোবস্তি মতে আমরাই জমির মালিক। আমাদের তল্লাশী আবেদনে এ জমি অধিগ্রহণে কে টাকা তুলেছে সে তথ্য দিতে পারেনি ভূমি অধিগ্রহণ শাখা। আমরা সবাইকে আদালতে দাঁড় করাবো, কারাগারে নেব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •