অনলাইন ডেস্ক : বিত্তহীন শ্বশুর অজিত কুমার কারন চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় হঠাৎ করেই বনে যান ছয় তলা বাড়ির মালিক। ‘স্নেহশীল পিতা’ হয়ে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রাম সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দানপত্র দলিল করে সেই বাড়ি আবার হঠাৎ লিখে দেন নিজের মেয়ে চুমকি কারনকে। অথচ অজিত কুমার কারনের দুই পুত্র ছাড়াও আছে আরও এক মেয়ে। দুই পুত্রের তেমন কোনো সহায়সম্পদ নেই। তাহলে কেন হঠাৎ বাকিদের রেখে কেবল এক মেয়েকে ছয় তলা বাড়ি লিখে দিলেন?

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানে নেমে দেখে, অজিত কারনের সেই মেয়ে চুমকি কারন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের স্ত্রী। চতুর প্রদীপ শ্বশুরের নামে বাড়ি বানিয়ে পরে সেটি স্ত্রীর নামে দানপত্রে লিখে নিয়ে নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে এলেও দুদকের সন্ধানী চোখে অভিনব এই দুর্নীতি ধরা পড়তে সময় লাগেনি বেশি।

এটিই শুধু নয়, ওসি প্রদীপ কুমার দাশ নিজেকে আড়াল করতে সম্পদ কিনেছেন স্ত্রীর নামে। চার কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সেই স্ত্রী চুমকি কারণ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার প্রধান আসামি। তালিকায় পরের নামটিই ওসি প্রদীপের। মেজর (অব.) সিনহা হত্যামামলায় ওসি প্রদীপ এখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কব্জায় থাকলেও তার স্ত্রী চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বাসিন্দা চুমকি কারণ এখন কোথায়— সেই হদিস কেউ জানে না।

জানা গেছে, ওসি প্রদীপ গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্ত্রী চুমকি কারন পাথরঘাটার বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। নানা সূত্রে ইঙ্গিত পেয়ে দুদক এখন আশঙ্কা করছে, চুমকি কারণ ভারতে পালিয়ে যেতে পারেন। অবশ্য কারও কারও ধারণা, তিনি ইতিমধ্যে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র সেটি এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।

দুদক এখন বিষয়টি এমনই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে যে, সোমবার (৩১ আগস্ট) পুলিশ সদরদপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে চুমকি কারণের দেশত্যাগ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে।

গত ২৩ আগস্ট অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকি কারণের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলার এজাহারে বলা হয়, স্বামী ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরপূর্বক একে অপরের সহযোগিতায় ভোগদখলে রেখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন চুমকি কারণ।

ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকি কারনের বিরুদ্ধে সম্পদবিবরণী চেয়ে নোটিশ দেয় দুদক। ওই বছরের ১২ মে তারা দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। ওই সম্পদ বিবরণীতে ৪ কোটি ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৯ টাকার স্থাবর অস্থাবর সম্পদ থাকার তথ্যপ্রকাশ করেন তারা। দুদক সম্পদ বিবরণী যাচাই করে ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার তথ্য পায়। একইসঙ্গে ঘোষিত সব সম্পদ অর্জনের সপক্ষে আয়ের কোন প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি তারা। দুদকের কর্মকর্তারা অনুসন্ধানে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত আয়ের মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে বলে প্রমাণ পান।

প্রদীপের স্ত্রী চুমকি কারন তার পিতা অজিত কুমার কারনের কাছ থেকে দানপত্রমূলে জমিসহ একটি ৬ তলা বাড়ি দানপত্র হিসেবে পান বলে সম্পদ বিবরণীতে প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রাম সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দানপত্র দলিলটি (নং-১১৮৮২) সম্পাদন হয়। দুদক অনুসন্ধানে জানতে পারে, প্রদীপের ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয়ের মাধ্যমে বাড়িটি তার শ্বশুর নেন। যা পরে মেয়ে চুমকি কারনকে (প্রদীপের স্ত্রী) দানপত্র করেন।

দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, ‘চুমকির পিতা বাড়িটি দানপত্র করে দিলেও তার (চুমকি) অন্য দুই ভাই ও এক বোনকে কোনো বাড়ি দান করেননি। অথচ তার দুই ছেলের নামে উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদও নেই। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ওসি প্রদীপ কুমার দাশ তার ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ গোপন করতে তার শ্বশুরের নামে বাড়ি নির্মাণ করে পরে তার স্ত্রীর নামে দানপত্র করে নিয়ে ভোগ দখল করছেন।’

দুদকের অভিযোগ থেকে জানা যায়, চুমকি একজন গৃহিণী হলেও তিনি নিজেকে কমিশন ব্যবসায়ী ও মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে সম্পদের মালিক দেখান। চুমকি কমিশন ব্যবসায়ী হিসেবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। পরবর্তীতে মৎস্য ব্যবসা ও বাড়ি ভাড়া থেকে আয় দেখিয়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে আসছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে চুমকির নামে কোনো কমিশন ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

চুমকি কারন ২০১৩ সাল পর্যন্ত মৎস্য ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয়ের হিসাব আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন। এর সপক্ষে ২০০২ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে পাঁচটি পুকুর নগদ সাড়ে ১৬ লাখ টাকায় ১০ বছরের জন্য ইজারা নেয়ার চুক্তিপত্র দুদকে দাখিল করেন। কিন্তু দুদক যাচাই করে দেখেছে, চুমকি মূলত একজন গৃহিণী এবং তার স্বামী ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ১৯৯৫ সালে এসআই হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০২ সালে তার কিংবা স্বামী প্রদীপের ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সঞ্চয় ছিল না।

প্রদীপের স্ত্রী চুমকির ব্যাংক হিসাব বিবরণীতে মৎস্য ব্যবসা সম্পর্কিত কোনো লেনদেন না পাওয়ার কথাও মামলায় উল্লেখ করেছেন দুদক কর্মকর্তা। দুদকের এজাহারে বলা হয়, ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, আসামি চুমকি মৎস্য ব্যবসা থেকে কোনো আয় করেননি। তিনি তার স্বামী প্রদীপ কুমার দাশের অপরাধলব্ধ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করার অসৎ উদ্দেশে ভুয়া মৎস্য ব্যবসা প্রদর্শন করে উক্ত আয় দেখিয়েছেন।’

দুদকের অনুসন্ধানকালে আসামি চুমকি কারন তার আয়ের সপক্ষে কমিশন ব্যবসার লাইসেন্স, সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে ব্যবসা করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বা অন্য কোন প্রামাণ্য রেকর্ডপত্র সরবরাহ করতে পারেননি বলে মামলার বাদি এজাহারে উল্লেখ করেছেন। সবমিলিয়ে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত আয়ের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •