এম.আর মাহমুদ


মফস্বলের একজন নাখান্দা গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে অমানবিক ভাবে নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের কাছে ক্ষমা চেয়ে লিখাটি শুরু করছি। টেকনাফ থানা পুলিশের হাতে চরমভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আপনি। কিন্তু কক্সবাজার জেলায় অসংখ্য সংবাদকর্মী থাকার পরও কেউ আপনার জন্য মুখ খুলে প্রতিবাদ করার সাহসটুকু দেখাতে পারেনি। এটা আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা।

আপনি অর্ধডজন মামলার আসামী হয়ে ১১ মাস কারা ভোগ করে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এতে আপনার পরিবার-পরিজন উৎফুল্ল। আপনার আগের চেহারা আর বর্তমান চেহারার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। আপনাকে দেখে চিনতে কষ্ট হয়। শারীরিক অবস্থা আগের মত ক্রিয়াশীল হয় কিনা আল্লাহই ভালে জানে। তারপরও মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে ফরিয়াদ ফরিদুল মোস্তফা খান যেন আগের মত সংবাদ জগতে ফিরে আসতে পারে। তবে একটি কথা না বললে হয় না আপনি ফরিদুল মোস্তফা খাঁন কারাগারের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন কিনা সন্দেহ।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খান পুলিশ পরিদর্শক (বরখাস্তকৃত) লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি (বরখাস্তকৃত) প্রদীপ কুমার ও উপপরিদর্শক নন্দলাল রক্ষিতের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা না ঘটলে। যে ঘটনা নিয়ে সারাদেশে রীতিমত তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বহু বিতর্কিত মূর্তিমান আতঙ্ক টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ বাবুর হাতে বিচার বহির্ভূতভাবে ২০৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তাদের মধ্যে অপরাধী নেই এমন কথা আমি বলছি না। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যক্তিকে ইয়াবা পাচারে জড়িত তকমা দিয়ে ক্রসফায়ারের নামে সরকারি গুলি খরচ করে হত্যা করেছে। কি আজব শৃঙ্খলার দেশ। যারা এভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার রয়েছে তাদের মর্ম বেদনা ভূক্তভোগীরা ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

কবির ভাষায় বলতে হয় “কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে……?” টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ মনে করেছিল, আপনাকে নির্যাতন করে হাতের আঙ্গুলগুলো তেতলিয়ে দিয়ে মরিচের গুড়ো দিয়ে চোখের দৃষ্টি শক্তি নষ্ট করে জেলে পাঠিয়ে আত্ম তৃপ্তির ডেকো তুলেছিল ফরিদুল মোস্তফা খান শেষ। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অসীম রহমতে আপনি এখনও বেঁচে আছেন।

আপনাকে গ্রেফতারের সময় বিদেশী মদের বোতল, অস্ত্র ও সাধারণ মানুষকে ঘায়েলে অন্যতম উপকরণ ইয়াবাগুলো দেখিয়েছিল আপনি যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিনে হয়তো এ পরিমাণ বিদেশী মদ ইয়াবা কিনে খাওয়ার সৌভাগ্য হবে না। তবে আমরা জানতাম আপনি হালকা নেশা করতেন। ফরিদুল মোস্তফা খানের দোষ ছিল একটি ‘সে কানার দেশে আয়না বিক্রি করতে চেয়েছিল, কানার কাছে আয়নার কোন কদর নেই যা পাগলও জানে।’ সরকারি উর্দি পড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে যতসব অপকর্ম করেছে তা এখন প্রদীপ বাবুরা তিলে তিলে ভুগছে।

প্রদীপ কুমার দাশ কোনদিন চিন্তা করেনি তার হাতে আইনের চুড়ি পড়ানো হবে। দিনের পর দিন র‌্যাবের হেফাজতে রিমান্ডে থাকতে হবে। ইতিমধ্যে তার বেশ কিছু কুকর্মের সহযোগী বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ এ জবানবন্দী দিয়েছে। হয়তো ক’দিন পর প্রদীপ বাবুও নিজেও জবানবন্দী দিতে বাধ্য হবে। আফসোস শুধু এক জায়গায় যে প্রদীপ বাবুর হাতে নির্যাতিত মানুষগুলো কাউকে নির্যাতনের ক্ষত চি‎‎হ্ন দেখাতে পারেনি। আজ সে প্রদীপ বাবু আদালতে কাপড় খুলে তাকে নির্যাতনের চিত্র দেখাতে বাধ্য হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে না বললে হয় না, ফেরাউন, নমরূদ কম শক্তিশালী ছিল না। তাদের পরিণতি আল্লাহ দেখিয়েছে।

জালেম বাদশা সাদ্দাত তার জন্ম ও বেঁচে থাকার ইতিহাস ভুলে আল্লাহর সাথে প্রতিযোগিতা করে নকল বেহেস্ত তৈরী করতেও ভুল করেনি। সাদ্দাত নকল বেহেস্ত তৈরী করতে গিয়ে তার রাজ্যের সব মানুষের মূল্যবান স্বর্ণালংকার কেড়ে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সাদ্দাতের বাহিনী ওই দেশের এক অসহায় বুড়ির শেষ সম্বল একটি স্বর্ণালংকার কেড়ে নিতে গেলে বুড়ি জানতে চেয়েছিল আমার স্বর্ণালংকার কেন নিয়ে যাচ্ছ? আমি মারা গেলে এ স্বর্ণালংকার বিক্রিলব্ধ টাকা দিয়ে পাড়া প্রতিবেশীরা আমাকে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করবে। সেদিন সাদ্দাত বাহিনী বুড়ির কথা শুনেনি। তবে বুড়ির শেষ উক্তি ছিল, তোদের বাদশার শেষ ইচ্ছা আল্লাহ কখনও পূর্ণ করবে না। টিকই সাদ্দাতের নকল বেহেস্ত নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নকল বেহেস্তে পদার্পণ করার সুযোগ আল্লাহ দেয়নি।

প্রদীপ বাবু অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে অঢেল টাকা-পয়সার মালিক হয়েছে। হয়তো দেখা যাবে তার সে সম্পদ ভোগ করার সুযোগটুকু হবে না। ইতিমধ্যে প্রদীপ বাবুসহ তার সহধর্মিনীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে দূর্নীতি দমন কমিশন মামলাও করেছে। যে প্রদীপ বাবু চাল-চলন ছিল রাজার হালে। মাইকেল মধু সূদন দত্তের মত প্রতি ঘণ্টায় ড্রেস পাল্টাতেন। গায়ে মাখত উন্নতমানের স্প্রে। অথচ আজ এক কাপড়ে দিন কাটাচ্ছে প্রদীপ বাবু। তার গায়ের ঘামের গন্ধে ভুত পালায় অবস্থা। আল্লাহ চাইলে সবই পারে।

ঢাকা থেকে বিক্রম নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো যার পাঠক ছিলাম আমি। সেখানে ‘কেউ দেখে কেউ দেখে না’ নামক একটি কলাম লিখতেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবুল খায়ের মোসলেহ উদ্দিন। তিনি এখন বেঁচে নেই। প্রসঙ্গক্রমে তার নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন ‘চোরের মানসম্মান আছে’। দেশের এক শীর্ষ চোর রাজবাড়িতে চুরি করতে প্রবেশ করে। অঢেল মূল্যবান মালামাল চুরি করে এক জায়গায় মওজুত করে রেখে আরও কিছু মালামাল চুরির কাজে লিপ্ত ছিল। এ সময় রাণী রাজাকে বলে বসল তুমি ঘোড়ার মত হয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকো। আমি ঘোড়ার পিঠে শোয়ার হব। রাজা রাণীর কথামত ঘোড়ার মত উপুড় হয়ে শুয়ে রইল আর রাণী ঘোড়ার পিঠে শোয়ার হয়ে ঘোড়ার লাগাম টানছে। এসব দৃশ্য দেখে চোর বেচারা থমকে দাঁড়াল।

রাণী বুঝতে পারল বাড়িতে কোন চোর ঢুকেছে। বিষয়টি রাজার নজরে আনার পর রাজা জানতে চাইল এত রাতে রাজবাড়িতে তুমি কে? চোর বলে বসল হুজুর আমি চোর। তখন রাজা চানতে চাইল, তুমি কিছু চুরি করেছো? চোর বলল হুজুর আপনার বাড়ির অর্ধেক সম্পদ আমি চুরি করেছি। তবে আমি কিছুই নেব না। খালি হাতে চলে যাব। তখন রাজা কৌতুহলি হয়ে চোরের কাছে জানতে চাইল এত কষ্টকরে চুরি করার পর মালামাল নিচ্ছ না কেন? চোর বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন, ‘যে রাজা রাণীর কথায় ঘোড়ার মত উপুড় হয়ে শুয়ে আর রাণী ঘোড়ার পিঠে চড়ে আমি রাজার মালামাল চুরি করি না।’ হুজুর চোরের মানসম্মান আছে।

সবকথার শেষ কথা হচ্ছে একটি কাক বিদ্যুৎ তারে জড়িয়ে মারা গেলে অন্তত ৩০-৫০টি কাক সমস্বরে আর্তনাদ করে। ফরিদুল মোস্তফা খান নির্যাতিত ও ৬টি মামলার আসামী হওয়ার পরও কক্সবাজার জেলা তথা সারাদেশের সংবাদকর্মীরা কি কাকের মতোও প্রতিবাদ করতে পারেনি? এ জন্য ফরিদুল মোস্তফা খানের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। এর একজন দেশের চৌকস অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোঃ রাশেদ খানকে আইনের উর্দি পড়া পুলিশের কতিপয় অতি উৎসাহী পুলিশের হাতে প্রাণ হারানোর জন্য রাশেদ খানের মা বোনের কাছে বার বার ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমাদের করার কিছুই নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •