ইমাম খাইর :
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং বাহারছরা তদন্তকেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর ‘ডিভিশন’ নিয়ে সমালোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়াতেও বিষয়টি বেশ প্রচার পায়। রয়েছে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা।

প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলী ডিভিশন পেলেও সমালোচনার মুখে বাতিল করা হয়েছে জানিয়ে সংবাদও ছেপেছে অনেকে।

তবে, সিনহা হত্যা মামলার আলোচিত এই দুই আসামিকে কারাগারে আদৌ ডিভিশন বা বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে কিনা, জানার আগ্রহ অনেকের।

প্রদীপ কুমার দাশ এবং লিয়াকত আলীর কারাগারে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তি নির্ধারণে ‘প্রত্যয়নপত্র’ চেয়ে গত ৭ আগস্ট পুলিশ সুপারকে একটি পত্র দেন জেল সুপার মোঃ মোকাম্মেল হোসেন।

তার অনুকূলে দুইজনের জন্য পৃথক দুইটি ‘প্রত্যয়নপত্র’ দিয়েছিলেন পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন, বিপিএম (বার)।

যেখানে ডিভিশন বা বিশেষ সুবিধা দেয়া না দেয়া সংক্রান্ত কোন বক্তব্য ছিল না। অনুরোধমূলক বাক্যও নেই। শুধু লেখা হয়েছে- ‘একজন ১ম শ্রেণীর স্থায়ী (নন-ক্যাডার) কর্মকর্তা।’

পুলিশ সুপারের প্রত্যয়নপত্র প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করেছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার মোঃ মোকাম্মেল হোসেন।

তবে, কাউকে ডিভিশন দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রত্যয়নপত্র প্রদান প্রসঙ্গে জেলা পুলিশের বক্তব্যঃ
সকলের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, গত ০৭ আগস্ট ২০২০খ্রি: কক্সবাজার জেল সুপারের কার্যালয়ের স্মারক নং-৫৮.০৭.২২০০.১১৪.০১.০০২.২০-২৭৩১ মূলে টেকনাফ মডেল থানার মামলা নং-০৯( জি,আর- ৭০৩/২০) এর বিচারাধীন বন্দি পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ এবং পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী এর বিষয়ে তারা স্থায়ী ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা কি না জানতে চেয়ে দুটি প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হয়।
জেল সুপার মোঃ মোকাম্মেল হোসেন মহোদয় কর্তৃক স্বাক্ষরিত উক্ত চিঠি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গৃহিত হলে গত ৮/৮/২০২০খ্রি: পুলিশ সুপার কক্সবাজার মহোদয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর পুলিশ শাখা-২ এর স্মারক নং-স্বঃ মঃ/পু-২/উন্নীতকরণ-১/২০০৮/৬২৫, তারিখ-৩০/৭/৩০১২ এর প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ী পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ এবং পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী প্রথম শ্রেনীর স্থায়ী (নন-ক্যাডার) কর্মকর্তা উল্লেখ করে পত্রের জবাব প্রদান করেন।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের স্মারক নং- ২৬৭১/১ম, তারিখ -৮/৮/২০২০খ্রি: মোতাবেক প্রেরিত উক্ত পত্রে পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ এবং পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে কারাগারে বিশেষ মর্যাদা বা ডিভিশন দেয়া হবে কি হবেনা সে বিষয়ে কোনো মতামত দেয়া হয়নি।
পত্রে জেল সুপারের চাহিদা অনুযায়ী শুধুমাত্র তাদের পদমর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু একটি স্বার্থানেষী মহল অসৎ উদ্দেশে সোস্যাল মিডিয়াসহ নানা মাধ্যমে বিকৃতভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এ ধরনের বিকৃত তথ্য প্রচার না করার জন্য সকলকে অনুরোধ করা হলো।

সুত্র মতে, জেল কোডের (কারাবিধি) বিধান মোতাবেক দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বন্দিদের ডিভিশন দেওয়া হয়।
যা জেল কোডের ৬১৭ বিধিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই বিধিতে বলা হয়েছে, (১) নাগরিকত্ব নির্বিশেষে নির্মোক্ত বন্দিগণ ডিভিশন-১ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন- (ক) ‘যারা ভালো চরিত্রের অধিকারী ও অনভ্যাসগত অপরাধী; (খ) সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে যাদের জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের এবং (গ) যারা নির্মোক্ত অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নয়-নৃশংসতা, নৈতিক স্খলন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক অপরাধ বা বিস্ফোরক আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা, সম্পত্তি সংক্রান্ত মারাত্মক অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নন বা অন্য কাউকে এসব অপরাধ করতে প্ররোচিত বা উত্তেজিত করেনি তারা ডিভিশন-১ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন।

এছাড়া বিধি ৬১৭ (২)-এ বলা হয়েছে, ‘নাগরিকত্ব নির্বিশেষে সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের বন্দিগণ ডিভিশন-২ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন। অভ্যাসগত বন্দিগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই শ্রেণির বহির্ভূত হবে না, সরকারের অনুমোদন বা পুনর্বিবেচনার শর্তে শ্রেণি বিভাজনকারী কর্তৃপক্ষকে বন্দির চরিত্র এবং প্রাক পরিচিতির ভিত্তিতে এ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ক্ষমতা দেওয়া হবে। যেসব বন্দি ডিভিশন ১ ও ২-এর অন্তর্ভুক্ত নয় তারা তৃতীয়টির অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেখানে বলা হচ্ছে, আদালত কোনও বন্দিকে ডিভিশন ১ ও ডিভিশন ২ প্রদানের জন্য প্রাথমিক সুপারিশটি সরকারের অনুমোদন কিংবা পুনর্বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন এবং মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন বা পুনর্বিবেচনা করবেন।

সরকারের নিকট প্রেরিত সুপারিশ অনিস্পন্ন থাকাবস্থায় সুপারিশকৃত যেসব সাজাপ্রাপ্ত বন্দির পূর্ববর্তী জীবনমান সাধারণের চেয়ে উন্নততর বলে ঘোষিত অথবা বিচারাধীন বন্দিকে ডিভিশন-১ বিচারাধীন বন্দির শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে, যদি তারা ভালো চরিত্রের অনভ্যাসগত অপরাধী হয় এবং অপরাধের ধরন হিসেবে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির ডিভিশন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে বিবেচিত ঘোষিত হয় তারা সে সময় দ্বিতীয় শ্রেণির ডিভিশনপ্রাপ্ত বিবেচিত হবেন।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় এপিবিএনের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। এরপর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে ঘটনাটি। নিহতের বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার বাদী হয়ে কক্সবাজার আদালতে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। এরপর সাত অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়। মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৩ জন।
সিনহা হত্যার পর পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষীকে গ্রেফতার করে মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব।
এছাড়া হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও তিন এপিবিএন সদস্যকে গ্রেফতার করে এলিট ফোর্সটি। বর্তমানে ওসি প্রদীপসহ সবাইকে র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
একই ঘটনায় টেকনাফ থানায় দুইটি ও রামু থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। সাক্ষী অপহরণের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় পরে আরেকটি মামলা হয়।
সিনহা হত্যার ঘটনার ১ মাস পার হলো। এ পর্যন্ত মোট ৫টি মামলা হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •