নজরুলের জানা অজানা

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট, ২০২০ ০২:০০ , আপডেট: ২৮ আগস্ট, ২০২০ ০৮:১৪

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে



    অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন


আজ ১২ ভাদ্র। ২০২০ সাল, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এ দিনে তিনি শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অখন্ড বঙ্গভূমির বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিলেও নন্দিত কবিপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম আজ আমাদের জাতীয় কবি।নজরুলের এদেশের মাটিতে পা রাখেন কৈশোরেই।দরিদ্রপরিবারের এই কিশোর নজরুল আসানসোলের মাথরুন স্কুলের ষষ্ট শ্রেনীর পাঠ চুকিয়ে প্রসাদপুরের এক বাঙ্গালী খৃষ্টান পরিবারে বাবুর্চির কাজ করেন।এর পর তিনি আবারো আসানসোলে এসে রুটির দোকানে চাকরী করেন। এসময় তার সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় পেয়ে রফিজউল্লাহ নামে এক পুলিশ অফিসার তাকে নিজ বাড়ীতে নিয়ে রাখেন।১৯১৪ সালে দরিরামপুর হাই স্কুলে নজরুলকে ভর্ত্তি করিয়ে দেওয়া হয়।সেখানে নজরুল নিজগুনে বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ পান এবং প্রথম স্থান অধিকার করে অস্টম শেনীতে উত্তির্ন হন।এখানে পড়াকালীন সময়ে নজরুলের ছোট্ট একটি ঘটনা না বললে নয়। সেখানে ক্লাসে আগে গরু রচনা মুখস্থ লিখতে দেওয়া হতো ।যেমনটি আমরাও লিখেছি গরুর চারটি পা আছে, লেজ আছে,গরুঘাস খায়, গরু দুধ দেয় ইত্যাদী।এটাকে বলা হতো রচনা আমরাও তাই পড়েছি।নজরুল যে ক্লাসে পড়তেন সে ক্লাসে গরু রচনা মুখস্থ করতে দেওয়া হলো।নজরুলতো মুখস্ত করার লোকনা, টিচার তাকে পিটাচ্ছেন।শিক্ষক বলছেন , “তুই তো বাউন্ডেলে, বল গরুর রচনা মুখস্থ বল”নজরুল প্রশ্ন করে, “স্যার রচনা মানেকি স্যার?”স্যার বলে,“রচনা মানেকি, তুই মুখস্থ করছস কিনা বল, প্রথম আট লাইন? নজরূল বলে না স্যার।রচনা মানে কি আমি আপনার কাছে জানতে চাই।”শিক্ষক বলেন “রচনা মানেতো বানানো। নজরুল বলে ,বানানো হলে মুখস্থ করে বানানো হলো কেমনে?তখন শিক্ষক বলেন“বেয়াদপ নজরুল, রচনা বানানোর মুরদ তোর আছে নাকি? নজরুল বলে “ হ্যাঁ স্যার বানাবো আমি বানাবো , তা গদ্যে বানাবো না পদ্যে বানাবো?”শিক্ষক বলেন “বেয়াদব পদ্যে আবার রচনা হয় নাকি? নজরুল বলে নিষেধ কোথায় স্যার? দ্বিতীয়বার ধরা থেয়ে শিক্ষক বলেন “ঠিক আছে গদ্যেই লিখ, পদ্যে লিখতে হবেনা। তখন নজরুল বলে “বাংলায় লিখবনা না ইংরেজীতে লিখব স্যার?শিক্ষক বলে,“দুই অক্ষর ইংরেজী জাননা বাউন্ডেলে তুই ! তুই আবার ইংরেজীতে রচনা লিখবি!নজরুল বলে,“ স্যার আমি লিখবো স্যার।তো স্যার কিসের উপর লিখবো ।শিক্ষক বলেন, ঐতো গরু নিয়ে লিখবি।নজরুল বলে স্যার আকাশে পাখী উড়ছে গরু নিয়ে লিখবো কেন? তখন ত্রিশালের আকাশে শকুনিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠিক আছে ঐ পাখীর উপর লিখবি।নজরুল বলেন, দেন স্যার কাগজ।তাৎক্ষনিক বসে নজরুল সাত পৃষ্টা ইংরেজী রচনা লিখে দিয়েছিলেন।নজরুলের লেখা সেই রচনা ঐ স্কুলের বেরসিক শিক্ষকেরা একটুও সংরক্ষন করেননি।ক্লাস সেভেনে পড়া একজন নজরুল ইংরেজীতে সাতপৃষ্টা রচনা লিখতে পারে তা স্কুল কর্তৃপক্ষের সংরক্ষন করা উচিত ছিল।

এর পর তিনি কোন অজানা কারনে আবারো চুরুলিয়া ফিরে যান।পরিণত বয়সে নজরুল ময়মনসিংহের অনেক জায়গা ঘুরেছেন। ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ এলাকায় নির্বাচন করেন্।নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তার জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।ভোটে পরাজিত হলেও কবি হিসেবে তিনি সর্বত্র সমাদৃত ছিলেন।নজরুলের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ময়সনসিংহে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে।

নজরুল প্রথম বারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ১৯২৬ সালের ২৪ শে জুন, মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে।১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আবারো তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। এর পর হঠাৎকরে ঢাকা এলে রানু সোম নামে এক সুকন্ঠী মহিলার সাথে তার পরিচয় হয়।পরে বুদ্ধবেদব বসুর স্ত্রী হওয়ায় প্রতিভা বসু নামে পরিচিত হন। নজরুল তাকে বনগ্রামের বাসায় গানের তালিম দেন।এসময় নজরুল একদল গোড়া হিন্দু তরুনের আক্রমনের শিকার হন। তারা লাঠিসোটা নিয়ে পথে নজরুলের উপর ঝাপিয়ে পড়লেও সৈনিকের প্রশিক্ষন প্রাপ্ত নজরুলের সাথে গোড়া হিন্দুরা পেরে উঠেনি।নজরুলের সঙ্গে রানুসোমের সম্পর্ককে ব্যঙ্গ করে নজরুলের গান “কে উদাসী হে বিদেশী’ গানটিকে প্যারডি করে “কে উদাসী বনগাবাসী” লেখা হয়।

আরেক দিনেরকথা শ্যামা সঙ্গীতের রেকর্ডিং শেষে কাজী নজরুল ইসলাম বাড়ি ফিরছেন। যাত্রাপথে তাঁর পথ আগলে ধরেন সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীন। একটা আবদার নিয়ে এসেছেন তিনি।নজরুলকে তিনি ‘কাজীদা’ বলে ডাকেন। নজরুল বললেন, “বলে ফেলো তোমার আবদার।”

আব্বাস উদ্দীন সুযোগটা পেয়ে গেলেন। বললেন, “কাজীদা, একটা কথা আপনাকে বলবো বলবো ভাবছি। দেখুন না, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালী গায়। শুনেছি এদের গান অসম্ভব রকমের বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গেলে হয় না? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান হবে।” বাজারে তখন ট্রেন্ড চলছিলো শ্যামা সঙ্গীতের। শ্যামা সঙ্গীত গেয়ে সবাই রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। এই স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে অনেক মুসলিম শিল্পী হিন্দু নাম ধারণ করেন। মুনশী মোহাম্মদ কাসেম হয়ে যান ‘কে. মল্লিক’, তালাত মাহমুদ হয়ে যান ‘তপন কুমার’। মুসলিম নামে হিন্দু সঙ্গীত গাইলে গান চলবে না। নজরুল নিজেও শ্যামা সঙ্গীত লেখেন, সুর দেন। নজরুল বললেন, “আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজী করাতে পারো কিনা।” আব্বাস উদ্দীন ভাবলেন, এইতো, কাজীদার কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলাম, ভগবতী বাবুকে কিভাবে রাজী করাতে হয় সেটা এখন দেখবেন।

গ্রামোফোনের রিহার্সেল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবুর কাছে গিয়ে আব্বাস উদ্দীন অনুরোধ করলেন। কিন্তু, ভগবতী বাবু ঝুঁকি নিতে রাজী না। ঐদিকে আব্বাস উদ্দীনও নাছোড়বান্দা। এতো বড় সুরকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভগবতী বাবুর পিছু ছাড়ছেন না। অনুরোধ করেই যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয়মাস চললো অনুরোধ প্রয়াস। এ যেন পাথরে ফুল ফুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা!

একদিন ভগবতী বাবুকে ফুরফুরে মেজাজে দেখে আব্বাস উদ্দীন বললেন, “একবার এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন না, যদি বিক্রি না হয় তাহলে আর নেবেন না। ক্ষতি কী?” ভগবতী বাবু আর কতো ‘না’ বলবেন। এবার হেসে বললেন, “নেহাতই না ছোড়বান্দা আপনি। আচ্ছা যান, করা যাবে। গান নিয়ে আসুন।” আব্বাস উদ্দীনের খুশিতে চোখে পানি আসার উপক্রম! যাক, সবাই রাজী। এবার একটা গান নিয়ে আসতে হবে।

নজরুল চা আর পান পছন্দ করেন। এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে আব্বাস উদ্দীন নজরুলের রুমে গেলেন। পান মুখে নজরুল খাতা কলম হাতে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে পড়লেন। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাস উদ্দীন খান অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো সময় যেন থমকে আছে। সময় কাটানোর জন্য আব্বাস উদ্দীন পায়চারী করতে লাগলেন।

প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেলো। বন্ধ দরজা খুলে নজরুল বের হলেন। পানের পিক ফেলে আব্বাস উদ্দীনের হাতে একটা কাগজ দিলেন। এই কাগজ তাঁর আধ ঘন্টার সাধনা। আব্বাস উদ্দীন খানের ছয় মাসের পরিশ্রমের ফল।

আব্বাস উদ্দীন খান কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেনঃ-

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।”

আব্বাস উদ্দীনের চোখ পানিতে ছলছল করছে। একটা গানের জন্য কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে। সেই গানটি এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি কি জানতেন, তাঁর হাতে বন্দী গানটি একদিন বাংলার ইথারে ইথারে পৌঁছে যাবে? ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে টিভিতে ভেজে উঠবে- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…?

দুই মাস পর রোজার ঈদ। গান লেখার চারদিনের মধ্যে গানের রেকর্ডিং শুরু হয়ে গেলো। আব্বাস উদ্দীন খান জীবনে এর আগে কখনো ইসলামি গান রেকর্ড করেননি। গানটি তাঁর মুখস্তও হয়নি এখনো। গানটা চলবে কিনা এই নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি শঙ্কায় আছে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম বেশ এক্সাইটেড। কিভাবে সুর দিতে হবে দেখিয়ে দিলেন।

হারমোনিয়ামের উপর আব্বাস উদ্দীনের চোখ বরাবর কাগজটি ধরে রাখলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই। সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত কণ্ঠ থেকে বের হলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…”।

ঈদের ছুটির পর প্রথমবারের মতো অফিসে যাচ্ছেন। ট্রামে চড়ে অফিসের পথে যতো এগুচ্ছেন, বুকটা ততো ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক করছে। অফিসে গিয়ে কী দেখবেন? গানটা ফ্লপ হয়েছে? গানটা যদি ফ্লপ হয় তাহলে তো আর জীবনেও ইসলামি গানের কথা ভগবতী বাবুকে বলতে পারবেন না। ভগবতী বাবু কেন, কোনো গ্রামোফোন কোম্পানি আর রিস্ক নিতে রাজী হবে না। সুযোগ একবারই আসে।

আব্বাস উদ্দীন যখন এই চিন্তায় মগ্ন, তখন পাশে বসা এক যুবক গুনগুনিয়ে গাওয়া শুরু করলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এই যুবক গানটি কোথায় শুনলো? নাকি আব্বাস উদ্দীন খান ভুল শুনছেন?

ছুটে চললেন নজরুলের কাছে। গিয়ে দেখলেন নজরুল দাবা খেলছেন। তিনি দাবা খেলা শুরু করলে দুনিয়া ভুলে যান। আশেপাশে কী হচ্ছে তার কোনো খেয়াল থাকে না। অথচ আজ আব্বাস উদ্দীনের গলার স্বর শুনার সাথে সাথে নজরুল দাবা খেলা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। নজরুল বললেন, “আব্বাস, তোমার গান কী যে হিট হয়েছে!”

অল্প কয়দিনের মধ্যেই গানটির হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়। ভগবতী বাবুও দারুণ খুশি। একসময় তিনি ইসলামি সঙ্গীতের প্রস্তাবে একবাক্যে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন, আজ তিনিই নজরুল-আব্বাসকে বলছেন, “এবার আরো কয়েকটি ইসলামি গান গাও না!” শুরু হলো নজরুলের রচনায় আর আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের জাগরণ।

বাজারে এবার নতুন ট্রেন্ড শুরু হলো ইসলামি সঙ্গীতের। এই ট্রেন্ড শুধু মুসলমানকেই স্পর্শ করেনি, স্পর্শ করেছে হিন্দু শিল্পীদেরও।

একসময় মুসলিম শিল্পীরা শ্যামা সঙ্গীত গাইবার জন্য নাম পরিবর্তন করে হিন্দু নাম রাখতেন। এবার হিন্দু শিল্পীরা ইসলামি সঙ্গীত গাবার জন্য মুসলিম নাম রাখা শুরু করলেন। ধীরেন দাস হয়ে যান গণি মিয়া, চিত্ত রায় হয়ে যান দেলোয়ার হোসেন, গিরিন চক্রবর্তী হয়ে যান সোনা মিয়া, হরিমতি হয়ে যান সাকিনা বেগম, সীতা দেবী হয়ে যান দুলি বিবি, ঊষারাণী হয়ে যান রওশন আরা বেগম।

তবে বিখ্যাত অনেক হিন্দু শিল্পী স্ব-নামেও নজরুলের ইসলামি সঙ্গীত গেয়েছেন। যেমনঃ অজয় রায়, ড. অনুপ ঘোষল, আশা ভোঁসলে, মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায়। কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গান লেখার সহজাত প্রতিভা ছিলো। খাতা কলম দিয়ে যদি কেউ বলতো, একটা গান লিখুন, তিনি লিখে ফেলতেন।

একদিন আব্বাস উদ্দীন নজরুলের বাড়িতে গেলেন। নজরুল তখন কী একটা কাজে ব্যস্থ ছিলেন। আব্বাস উদ্দীনকে হাতের ইশারায় বসতে বলে আবার লেখা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে যুহরের আযান মসজিদ থেকে ভেসে আসলো। আব্বাস উদ্দীন বললেন, “আমি নামাজ পড়বো। আর শুনুন কাজীদা, আপনার কাছে একটা গজলের জন্য আসছি।”

কবি শিল্পীকে একটা পরিস্কার জায়নামাজ দিয়ে বললেন, “আগে নামাজটা পড়ে নিন।” আব্বাস উদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন আর নজরুল খাতার মধ্যে কলম চালাতে শুরু করলেন।

আব্বাস উদ্দীনের নামাজ শেষ হলে নজরুল তাঁর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিন আপনার গজল!” হাতে কাগজটি নিয়ে তো আব্বাস উদ্দীনের চক্ষু চড়কগাছ। এই অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল গজল লিখে ফেলছেন? তা-ও আবার তাঁর নামাজ পড়ার দৃশ্যপট নিয়ে?

“হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ,

দিলাম তোমার চরণতলে হৃদয় জায়নামাজ।”

কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর রচিত নাতে রাসূলের জন্য।

১। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়

আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়’

২। ‘মুহাম্মদ নাম জপেছিলি, বুলবুলি তুই আগে,

তাই কি রে তোর কন্ঠের গান, এমন মধুর লাগে।’

৩। ‘আমি যদি আরব হতাম মদীনারই পথ

আমার বুকে হেঁটে যেতেন, নূরনবী হজরত’

৪। ‘হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়

সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে যায়।

সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা।’

….গানগুলো ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। গানগুলো রচনার প্রায় নব্বই বছর হয়ে গেছে। আজও মানুষ গুনগুনিয়ে গানগুলো গায়।

বাংলায় ইসলামি গানের যে নবজাগরণ নজরুল সূচনা করেছিলেন, যে পথ দেখিয়েছেন, পরবর্তীতে সেই পথের পথিক হয়েছেন জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, গোলাম মুহাম্মদ, মতিউর রহমান মল্লিক।

নজরুল অমর কাব্য লিখতে পৃথিবীতে আসেন নাই।তিনি এসেছিলেন মানুষকে ভালোবাসতে।মানুষের ভালোবাসার জন্য তিনি জীবন দিতে রাজী ছিলেন। তাঁকে কিন্তু অফার দেওয়া হয়েছিল।যিনি তাঁর বিচারক ছিলেন চীফ প্রেসিডেন্সী মেজিস্ট্রেট মি: সুইন হো,ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের উনি ২৭ বছর বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন। নজরুলকে ক্ষমা করে দেওয়ার একটি অফার দেওয়া হয়েছিল।তখন “রাজবন্দীর জবান বন্দী” এবং কি সেই জবানবন্দী? এটি পড়লে এমনি মাথা উচা হয়। বুক ফুলে উঠে।রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁকে “বসন্ত“ উৎসর্গ করতে গেলেন,তখন ঐ জেলার বলেছিলেন,“ ইজ দিজ ক্রিমিনাল সো গ্রেট এ ম্যান?”তখন তিনি বুজতে পেরেছিলেন , নজরুল জগৎ কাঁপিয়ে দেওয়ার একজন মানুষ।সকল বিধি বিধান ,তথাকথিত শৃঙ্খলভেঙ্গে ,বাধন এবং ভয়কে জয় করতে এসেছিলেন নজরুল।তাঁর কবিতায় তিনি বলেছেন,“এই শিকল পরা ছল মোদের শিকল পরা ছল, এই শিকল পরে শিকল তোদের করবোরে বিকল।””

রামধনু হতে লাল রঙ ছানি এনে প্রেমিকাকে আলতা পরাতে পারতেন,তাঁর গানের সাত সুর দিয়ে বাসর রচনা করতে পারতেন,সেই কবি কি ইচ্ছেকরলে ব্রিটিশ বড়লাটের একটি কবিতা লিখতে পারতেন না? পারতেন। তাহলে তো নজরুলকে জেল খাটতে হতো না।তখন তাঁর পিছনে টিক টিকি লেলিয়ে দেওয়া হতো না । উনি বলেছেন ,

“ এদেশ ছাড়বি কিন্ াবল?

নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।

তাই ওঁরে নবেল প্রাইজ দিবে কোন বলদে? তোমরা রইবে তেতলার পরে আর আমরা রইব নীচে, অথচ তোমাকে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে।তিনি বলেছেন, “ সত্যকে আজ হত্যা করে অত্যাচারীর খাড়ায়, নাই কিরে কেউ সত্য সাধক বুক ফুলে আজ দাড়ায়?”সত্য সাধক উনি খুজে বেড়িয়েছেন ।যারা বুক খুলে দাড়ানোর সাহস রাখে।দালালী চামচাগিরী করে ব্রিটিশের তোশামোদী এ জিনিসটা উনি করতে পারেন নাই।করতে পারার জন্য নজরুল জন্মাননি।উনি বলেছেন,“ আমি জন্ম স্বাধীন বাঁধা বন্ধনহীন” । জন্মেছিলেন স্বাধীনরুপে, একটা আশ্চর্য্য ধুমকেতুর মতো তিনি এসেছিলেন।বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতো তিনি এসেছিলেন।নিদ্রিত জাতীকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এসেছিলেন।তাঁর অনেকগুলো স্বাধ পুর্ণ হয়নি।

কাব্যে আমপারা নজরুল অত্যান্ত সার্থক ,সঠিক যথাযতভাবে আল কোরানের এক পারা তিনি কাব্যে অনুবাদ করেছেন।ইচ্ছে ছিল পুরো তিরিশপারা তিনি অনুবাদ করবেন।তাঁর সে আশাটি পুর্ণ হয়নি।তিনি চেয়েছিলেন মানুষকে ভালোবাসতে এবং মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে দেশ কে ভালোবাসার অপরাধে, মনুষ্যত্ব অর্জন করার অপরাধে, মানুষের আঘাত খেয়ে তিনি মরতে চেয়েছিরেন।তিনি বলেছেন,“মরণের হাতে মরিতে চাহিনা মানুষের প্রিয় করে, আঘাত খাইয়া যেনগো আমার শেষ নি:শ্বাস পরে।”সেটাও তার হয়নি। তিনি এসেছিলেন গরীবের জন্যে। সারা পৃথিবীতে গরীব রয়েছে।তিনি বলেছেন,

“গরীবের তরে মরিতে এসেছি,

মরিব এদেরি সাথে, মরিবার আগে মারিয়া যাইব প্রাণ ভরে দুই হাতে।”

সেটাও তিনি মেরে যেতে পারেন নাই। “এই মোর স্বাধ সাধনা আমার প্রার্থনা নিশীদিন, মানুষ রবেনা অন্ন বস্ত্রহীন আর পরাধীন” । “ ও কে চন্ডাল ? চমকাও কেন? নহে ও ভিন্ন জীব।

ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র ওই শ্বশানের শিব।

হুকুর জল আর ভাতের হাড়ি একেই ভাবলি জাতীর জান্ ,

তাই তো বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ খান।।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •