এম.আর মাহমুদ

সভ্যতার যুগে অন্ধকার যুগের বর্বরতা দেখলে দেশের মানুষ থমকে দাঁড়ায়। শুরু হয় বাদ-প্রতিবাদ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে বর্বর যুগে কোন ঘটনা দেখলে সহজেই ভাইরাল হয়ে যায়। তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তৎপর হয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের কথা ভুলে গিয়ে আমরা সভ্যতার যুগের দিকে দিন দিন অগ্রসর হচ্ছি। তারপরও মানবরূপী কিছু দানবের কারণে সেই অন্ধকার যুগের কথা বার বার বার স্মরণ করতে হয়। সম্প্রতি চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তার কিছু অনুগত লোকজন মা ও ২ মেয়েকে কোমরে রশি বেঁধে যেভাবে নির্যাতন করেছে তা কোন সভ্যদেশে আশা করা যায় না। এ ঘটনায় জড়িতরা যতই দাবী করুক মা, ২ মেয়ে, ১ ছেলে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা করে একটি গরুর বাঁচুর চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় তাদেরকে উত্তেজিত জনগণ আটক করে পিঠিয়ে কোমরে রশি বেঁধে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসে। তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হোক মা, ২ মেয়ে ও ১ ছেলে একজন সিএনজি চালকসহ হারবাং বৃন্দাবনখিল এলাকা থেকে গরু চুরি করতে এসেছিল। কিন্তু একটি গরুর বাঁচুরসহ সিএনজির পিছনের সিটে ৩ জন কিভাবে বসতে পারে সে প্রশ্নের জবাব এখনও পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ মানুষের অভিমত, একটি সিএনজির পিছনের সিটে ৩ জন মানুষ বসার পর সেখানে একটি গরুর বাঁচুর রাখা কোনদিনই সম্ভব নয়। তারপরও মা, ২ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নির্দয়ভাবে পিঠিয়ে কোমরে রশি বেঁধে প্রকাশ্যে রাস্তায় হেঁটে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এনে চেয়ারম্যান কর্তৃক পুনরায় মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার সঠিক জবাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কল্পকাহিনী শুনে ছোট বেলার একটি কবিতা বার বার স্মরণ হচ্ছে। তবে কবিতাটি মাত্র ২ লাইন স্মরণ থাকলেও বাকিগুলো ভুলেই গেছি “মাথায় কত প্রশ্ন জাগে দিচ্ছে না কেও জবাব তার, সবাই বলে মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার।” ছোট বেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কবিতাটি পড়লেও তেমন অর্থ বুঝতাম না। শিক্ষক মহোদয়ের পিঠুনির ভয়ে মুখস্ত করতাম মাত্র। যাক এসব কথা স্মরণ করেও শিশুকালের দিকে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় হারবাংয়ের মা মেয়ে নির্যাতনের ভাইরাল হওয়া দৃশ্য দেখে হতাশ হয়ে দীক্ষার জানিয়েছে। জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গরু চুরির মামলা থেকে মা ও ২ মেয়ে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। পরে হারবাং ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি মিরানুল ইসলাম (মিরান) সহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন, নির্যাতনের শিকার মহিলাদের মা পারভীন বেগম। পুলিশ এ মামলাভূক্ত ৩ আসামীকে গ্রেফতার করে শ্রী ঘরে পাঠিয়েছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এখনও পলাতক। তদন্ত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় চূড়ান্ত করেছে। হয়তো আজকের মধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে জমা দিবে। তখন হয়তো ভেসে উঠবে সেদিনের বাস্তব চিত্র। একটি কথা না বললে হয় না নির্যাতনের শিকার মহিলাগুলো অপরাধী হলেও তাদের বিচারের কিছু প্রক্রিয়া আছে। সে প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তারা আইন হাতে নিয়ে মহিলাদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করেছে তা সভ্য সমাজে আশা করা যায় না।

চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে হারবাং একটি আলোচিত ইউনিয়ন যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থান করে আসছে। এ ইউনিয়নের পুরনো অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। অবিভক্ত বাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী খাঁন বাহাদুর জালাল উদ্দিনের জন্মস্থান হারবাং। যেখানে জন্ম নিয়েছেন অনেক কীর্তিমান পুরুষ। হারবাংয়ের মানুষ সুশিক্ষিত করে ধরে খায়, কারো দ্বারে নেই। তবে সব কথার শেষ কথা হচ্ছে “হারবাং নামকরণের ইতিহাস নিয়ে নানা মনির নানা মত রয়েছে। জনশ্র“তি রয়েছে হারবাং পাহাড়ে ছিল হারমাদ রাজার আস্তানা। সেখান থেকেই হারমাদ বাহিনী পুরো সমুদ্র পথে ডাকাতি করত। আর শাসন করত পুরো এলাকা। পরে হারমাদ বাহিনীকে তাড়িয়ে এখানেই জনবসতি স্থাপিত হওয়ার পর এ ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে “হারবাং”। হারমাদ রাজা দস্যু বাহিনীকে তাড়িয়ে হারবাং হলেও তার প্রেতাত্ত্বারা হয়তো এখনও রয়ে গেছে। সবকথার শেষ কথা হচ্ছে সিএনজির পিছনে সিটে ৩ জন মহিলা যাত্রী বসার পরে সেখানে গরু ঢুকিয়ে চুরি করতে পারলে অবশ্যই স্বীকার করে নিতে হবে “পাগল যেন গাছে ধরে”।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •