সিবিএন ডেস্ক:
বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো টিউশন-ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে বেপরোয়া। করোনাকালেও এসব স্কুলগুলো বিভিন্ন ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখা গেছে।

টিউশন-ফি বকেয়া থাকায় অনলাইন ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ারও অভিযোগ ছিলো কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বিরুদ্ধে।

শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের নানা অভিযোগের মধ্যে বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালতি না হওয়া, নিবন্ধনে অনীহা, ব্যয় বিবরণী প্রকাশ না করাসহ স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনছে সরকার। এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সম্প্রতি আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞাঁ গত ২০ আগস্ট এক চিঠিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে নিবন্ধন নিশ্চিতকরণ এবং নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

শনিবার (২২ আগস্ট) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞাঁ  বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো যে ফি নিচ্ছে, সেগুলো যথাযথ নয়। কারণ তাদের কমিটি বোর্ড থেকে অনুমোদিত হয়নি। ইচ্ছা করলেই তারা ফি নির্ধারণ করতে পারেন না। দেশের নিয়মনীতি মেনেই তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে।

ঢাকা বোর্ডের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদেশি কারিকুলামে পরিচালতি বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বিধিমালা ২০১৭ অনুযায়ী নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ওই নির্দেশনার আলোকে কিছু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন গ্রহণ করলেও কতিপয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে। নির্দেশনায় নির্ধারিত ফি দিয়ে নিবন্ধনের আবেদন করতে বলা হয়।

স্কুলগুলোতে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের অনুমোদর নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো বোর্ড থেকে কোনো কমিটি অনুমোদন না করেই বিধি বর্হিভূতভাবে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বোর্ডের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে হিসাবরক্ষণ ও হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করে আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি প্রত্যেক অর্থবছরে শেষে আয়-ব্যয় বাংলাদেশ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস অর্ডার, ১৯৭৩ অনুযায়ী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টদের হিসাব বিবরণী সম্পাদন করবে এবং রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্তাপন করবে; যা পালন করা হচ্ছে না।

এছাড়াও, পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিমাসে বা বছরে শ্রেণিভেদে আদায় করা টিউশন-ফি, ভর্তি-ফি, খেলাধূলা-ফি, গ্রন্থাগার-ফি, টিফিন-ফি, মুদ্রণ-ফি এবং অন্যান্য-ফি এর পরিমাণ ও বিবরণী উল্লেখ করার বিধান আছে। যা নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে অবিহত করা হচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে নিবন্ধন এবং ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন, ব্যয়-বিবরণী উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যয় বিবরণী অভিভাবকদের লিখিতভাবে অবহিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ ধরনের নিবন্ধিত এবং নিবন্ধনহীন কতটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আছে তার একটি তালিকাও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং এই নয়টি বোর্ডের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অঞ্চলের উপ-পরিচালকদের চিঠি দিয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা মোতাবেক বিধি ১৯ (৩) বাস্তবায়নের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং এই নয়টি বোর্ডের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অঞ্চলের উপ-পরিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞাঁ জানান, ঢাকা বোর্ডের অধীনে ‘এ’ লেভেল এবং ‘ও’ লেভেল পর্যায়ে ১১৮টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্যারেন্টস ফোরামের প্রেসিডেন্ট একেএম আশরাফুল হক বাংলানিউজকে বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ে সরকারের এসব উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ ও ধন্যবাদ জানাই। আমরাও চাই স্কুলগুলো একটা নিয়মের মধ্যে চলে আসুক।

তিনি বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো পরিচালনায় একটা পৃথক বডি থাকবে, টিউশন-ফি যৌক্তিকরণ হবে-এগুলো নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছি।

তিনি বলেন, করোনাকালে আমরা ৫০ শতাংশ টিউশন-ফি নেওয়ার দাবি করছিলাম। কিন্তু টিউশন-ফি দিতে না পাওয়ায় অনলাইন ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, স্কুল থেকে বের করে দেওয়া বা উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়ে ভর্তি বাতিল এবং ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের আয়-ব্যয়ের বিবরণী প্রকাশ এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনের অনুমোদনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, এটা সরকারের প্রশংসনীয় ও ভালো উদ্যোগ। এটা আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, নিবন্ধন ছাড়া কীভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো ইংলিশ মিডিয়াম গজিয়ে ওঠে। গাফিলতির কারণে গড়ে উঠেছে এবং তারা ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত টিউশন-ফি নিচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়া গড়ে উঠেছে এবং ফি নিচ্ছে সেগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে, যারা নিচ্ছে এটা ঠিক কিনা? পাশাপাশি সরকারের একটা মনিটরিং কমিটি থাকতে হবে।

ইংলিশ মিডিয়ামের পাশাপাশি বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোরও হিসাব বিবরণী দাখিল ও নিরীক্ষা করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে ফি ঠিক করতে হবে।

বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক আবুল মনছুর বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। তাদের ধার্য করা ফি যথাযথ হয়নি। তারা বলেছেন যে, কমিটি অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু কমিটি তো অনুমোদিত নয়। ইচ্ছা করলেই তারা ফি নির্ধারণ করতে পারেন না। এতে তারা ভুল স্বীকার করেছেন। আমরা বলেছি, নিয়মনীতি মেনেই ব্যবসা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তারা বলেছেন বোর্ড থেকে কমিটি অনুমোদন করে নেবেন। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ইআইআইএন নম্বর দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের শনাক্ত করা যায়। রোববার (২৩ আগস্ট) থেকে তারা আবেদন করবেন।

ইংলিশ মিডিয়ামের ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও আইন বা বিধিমালা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যে কার্যক্রম শুরু করেছি তাতে ভবিষ্যতে হয়ে যাবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •