শাহনেওয়াজ জিল্লু:
অনতিবিলম্বে কক্সবাজারকে তার নিজস্ব রূপ লাবণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। এটি করতে হবে এখানকার আপামর জনসাধারণকেই; অর্থ্যাৎ কক্সবাজারবাসীকেই। পর্যটন, মৎস, লবন, পান, সুপারিসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক এবং মৌলিক অর্থনৈতিক উৎস আমাদের রয়েছে। এসবকে পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। শুধুমাত্র মাদক এবং অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে আজ কক্সবাজারের পর্যটন ও প্রাকৃতিক শিল্প বান্ধব রূপ শ্রী হারিয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- ইতিমধ্যেই একটি মাদক বান্ধব প্রজন্ম কক্সবাজারে সৃষ্টি হয়েছে। এরা মাদক সেবন কিংবা বেচাকেনা ছাড়া কিছুই বুঝে না। শিক্ষাদীক্ষার বালাই নেই। মানবতা নেই। মনুষত্ব বোধ নেই। মাদক বিক্রি করে দুচার পয়সা উপার্জন করে ক্ষণে ক্ষণে দুই চাকার যানে রদবদল করে পাঙ্কু করা আর বড়জোর একটি হেরেমখানার মতো আলিশান বাড়ি নির্মাণ করা ছাড়া এদের জীবনে আর কোনো লক্ষ্য উদ্দেশ্য নেই।

টাইম মেশিন ধরে বেশি দুর পেছনে যেতে হবে না। আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে চিন্তা করুণ। এইযে শহরতলীর বানুপ্লাজা থেকে হোটেল সীকুইন পর্যন্ত এসব এলাকা ছিলো পর্যটক বান্ধব দৃষ্টিনন্দন এলাকা। এখানেই পর্যটকরা থাকতেন। ঘুরতেন বেড়াতেন। রাত্রিযাপন করতেন। আর এখন এসব এলাকা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কে করেছে? আমরাই করেছি। পুরো শহরের রাস্তাাঘাটের যে অবস্থা দেখলে মনে হবে বিগত পঞ্চাশ বছরেও এখানে কোনো সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ নজর দেয়নি। শহরতলীর প্রধান সড়কের উপরেই বিশাল বিশাল গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে মিনি পুকুরে রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে জানি। কিন্তু আজকে আমরা যারা নিজেদের বিবেক সচেতন নাগরিক বলে মনে করি তারা কি একটা বারও এসব সমস্যার মৌলিক সমাধান খুঁজেছি? নাহ। কখনোই না। জন্তু জানোয়ারের মতো গোয়ালে ঢুকছি, বের হচ্ছি আর চলাফেরা করছি। আমরা যুবক ছেলে মানুষ। একারণে আমাদের হয়তো খুব একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু একটাবার নিজেদের পরিবারের বৃদ্ধ মা, বাবা, কিংবা অসুস্থজনদের কথা ভেবেছি? তারা এসব সড়ক দিয়ে যারপরনাই কষ্ট সহ্য করে গমন করেন; এসব কি আমরা একটাবারও মনের গভীর থেকে ভাবতে পেরেছি??? অথচ সড়কের খানাখন্দের কবলে পড়ে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও যান উল্টে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

এবার আসি মাদক প্রসঙ্গে। বিগত ১০/১২ বছর ধরে লক্ষ্য করেছি জেলার বাহিরে অর্থাৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোথাও গমন করার ক্ষেত্রে পদে পদে পথে পথে মোড়ে মোড়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। এটা যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে। ১০/১২ বছর পূর্বে শুধুমাত্র কুমিল্লার দিকে একটি চেকপোস্টে তল্লাসি করা হতো। এখন কক্সবাজার থেকে ঢাকা পৌছানোর আগ পর্যন্ত কমপক্ষে ৭/৮টি তল্লাশি চৌকিতে আপনার চৌদ্দগোষ্ঠীর ইন্টারভিউ দিতে হয়। উখিয়া টেকনাফের অথবা চেহারা সুরত একটু ব্যাকাত্যাড়া টাইপের হলে তো আর কোনো কথাই নেই। ম্যারাথন ইন্টারভিউ মোকাবেলা করেই আপনাকে রাজধানী ঢাকায় পৌছাতে হবে। তল্লাশী চৌকিতে দায়িত্বরত লোকজনদের আচরণের কথা আর নাই বা বল্লাম। লোমহর্ষক ব্যপার হলো- কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদেরও একই হয়রাণির শিকার হতে হয়। সচেতন নাগরিকগণ! আপনাদের কি ধারণা- এই পর্যটকরা কি দ্বিতীয়বার কক্সবাজার আসতে চাইবে আর? গত ১০/১২ বছর ধরে কক্সবাজারের সচেতন নাগরিকরা এখনও পর্যন্ত এসব বিপর্যয় নিয়ে কখনওই মাথা ঘামাতে দেখিনি। আপনাদের লজ্জা হয় না? আত্মসম্মানবোধ নেই?? আপনাদের কাছে সময়ের কি কোনো মূল্য নেই?? দেশের প্রতি কি কোনো মায়া মমতা নেই??? স্বনির্ভর এলাকা হিসেবে মেট্রো রেল, রেললাইন, গ্যাসলাইন চাইবো দুরে থাক উল্টো এলাকা ছেড়ে পালানোর মতো পরিস্থিতিতে এসে দাড়িয়ে আছি আমরা এখন।

প্রিয় কক্সবাজারবাসী! সময় এসছে এখনই মাদক এবং অযোগ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার। পর্যটক সুরক্ষামূলক কর্তৃত্ব গড়ে তোলার। এখানে যারা সরকারি চাকরি করতে আসে তাদের মূলে কক্সবাজার বান্ধব চেতনা পুশ করার। অযোগ্য অথর্ব তাবেদারি মানসিকতা সম্পন্ন বুড়োদের সসম্মানে চেয়ারচ্যুত করে পরিস্কার কক্সবাজার বান্ধব নেতৃত্ব গড়ে তুলতেই হবে। তা করা না গেলে- প্রজন্ম আমাদের অভিশাপ দিবে। তারা আমাদের ক্ষমা তো করবেই না বরং ছেড়ে দিয়ে কথা বলবে না। আপনাদের বিবেকের চোখ খুলুন। তারা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে আমাদের পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, মেরিনড্রাইভ এলাকাকে ভুতুড়ে নগরী বানিয়েছে, পর্যটকদের নানাভাবে হয়রাণি করছে, চিংড়ি ও লবণ শিল্পকে ধ্বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মৎস আহরণেও নানাবিধ বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। তাহলে কক্সবাজারের মানুষের সেই গৌরবের জায়গাটি আর কোথায় থাকলো। এভাবে চলতে থাকলে অত্র এলাকার প্রতিটি মানুষ মাদক, দালালী, ফাড়িয়া, জোচ্চুরি, বাটপারিসহ নানাবিধ অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে। দয়া করে আগের মতো সেই স্বনির্ভর জাতি গঠনে উদ্যোগী হউন।

শাহনেওয়াজ জিল্লু
গণমাধ্যমকর্মী
২৩.০৮.২০ (রাত ০১:৩০টা)
shahnewaz.zillu@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •