আবদুর রহমান খান


 

মুসলিম দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার পর থেকে ইসরাইলের দখলদার বাহিনী প্যালেষ্টাইনী নাগরিকদের ওপর বহুমূখী বর্বরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্যালেষ্টাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (পিসিএইচআর) বৃহস্পতিবার ( ২০ আগষ্ট) প্রকাশিত তাদের সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে গত সপ্তাহে ইসরাইলী বাহিনী প্যালেষ্টাইনের নগরগুলিতে বহুবার বর্বর হামলা চালিয়ে নাগরিকদের হত্যা করেছে , তাদের বাড়িঘর ধবংস করেছে এবং তাদের উপর নির্যাতন করেছে, ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পিসিএচআর প্রতিবেদনে এ সপ্তাহে এরকম ১৪৫টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গত এক সপ্তাহে গাজার পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সৈন্যদের হামলায় অন্তত: একজন প্যালেষ্টাইনী কিশোর নিহত সহ ১৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গাজায় বিমান হামলায় বাড়ীঘর ভেঙে একজন গর্ভবতী মা সহ চারজন আহত হয়েছে। গাজার সমুদ্রে প্যালেষ্টাইনী জেলেদের নৌকায় এবং ফসলের ক্ষেতে কাজ করা অবস্থায় প্যালেষ্টাইনী নাগরিকদের লক্ষ্য করে অন্তত: সাত দফা হামলা হয়েছে এ সপ্তাহে।

দু-একদিন বিরতিতে গত সপ্তাহে প্যালেষ্টাইনীদের ওপর আকাশ থেকে একাধিকবার গোলা নিক্ষেপ করছে ইসরাইলী যুদ্ধ বিমান ও ড্রোন; ভুমি থেকে সেল নিক্ষেপ করছে স্থল বাহিনী আর মারণাস্ত্র নিয়ে ছুটে আসছে পদাতিক খুনী সেনাদল। প্যালেষ্টাইনীরা জানিয়েছে, দক্ষিন গাজায় খান ইউনুস, জুহর আদ-দিক এবং আর-বেরুজি উদ্বাস্তু শিবিরে গোলা ও বোমা নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলী হামলাকারীরা। এরকম এক হামলায় গাজায় জাতিসংঘ উদ্বাস্ত সহায়তা সংস্থা পরিচালিত একটি স্কুলও ধ্বংস হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রত্যুষেও দখলকৃত গাজা উপত্যাতার প্যালিস্টাইনী বসতির ওপর অন্তত: তিনটি স্থানে শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এছাড়াও, ইরায়েলী বিশেষ সন্ত্রাসী বাহিনী রাতভর ঘরে ঘরে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু যুবকে ধরে নিয়ে যায়। বুধবার এরকম এক হামলায় মোহাম্মদ দামের মাতার নামক এক ১৭ বছরের কিশোরকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।

গাজায় অধিকৃত অঞ্চলে অবরুদ্ধ বিশ লক্ষ বাসিন্দাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্দির কৌশল হিসেবে ইসরায়েল ইতোমধ্যে গাজার একমাত্র বানিজ্য পথ কারমা আবু সালেহ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে সমুদ্রপথে জ্বালানী তেল আমদানী করা বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের সংকটে পড়ে গাজার বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র ১৮ আগষ্ট থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।

গত ১৬ আগষ্ট ইসাইলীর দখলদার বাহিনী ঘোষনা করে দিয়েছে, এখন থেকে প্যালেষ্টাইনীদের জন্য গাজায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া দখলকৃত গাজা আঞ্চলকে ভিন্ন ভিন্ন ক্যান্টনে ভাগ করে রাস্তায় রাস্তায় নিরাপত্তা চৌকি বসিয়েছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী । সেখানেবেসামরিক কাউকে দেখা গেলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

প্যালেষ্টাইনী মানবাধিকার সংস্থা পিসিএইচআর জানিয়েছে, ইসাইলের এসব ক্রমবর্ধমান হামলা ও নির্যাতনের কারনে প্যালেষ্টানের মানুষ অবর্ননীয় আর্থিক সংকট ও মারাত্ত্মক নিরাপত্তা সংকটে পড়েছেন।

আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির প্রতিক্রিয়া

ওদিকে ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতা চুক্তির প্রতিবাতে প্যালেষ্টানী নাগরিকরা গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর পূর্ব জেরুজালেমের প্রাচীন মসজিদ কুব্বাস আল সাখরা’র সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সেখানেও ইসরাইলী পুলিশ হামলা চালিয়ে প্রতিবাদকারীদের ছত্রভংগ করে দেয়, তাদের ব্যনার-ফেষ্টুন কেড়ে নেয় এবং একজন কর্তব্যরত সাংবাদিক মুস্তফা আবু রোমুজকে (৪৩) গ্রেপ্তার করে।

মার্কিনীদের নেপথ্য দুতিয়ালিতে ইহুদিবাদী ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গত ১৩ আগষ্ট এক যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

তবে ইসরাইল জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিম তীরের ৩০ ভাগ এলাকায় তাদের সম্প্রসারন পরিকল্পনা থেকে তারা সরে আসছে না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তি ঘোষনাকে প্যালেষ্টাইনী মুক্তি আন্দোলনের পিঠে ছুরিকাঘাত বলে অভিহিত করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো আরব আমিরাতের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। প্যালেষ্টানী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, আমিরাতের এ পদক্ষেপ হচ্ছে জেরুজালেম, আল আসকা ও ফিলিস্তনিদের প্রতি বিশ্বসঘাতকতা।

তাছাড়া বিশ্বের বহু মুসলিম দেশের জনগণ ও নেতৃবৃন্দ আবুধাবির এই বিশ্বাসঘাতকতার নিন্দা ও এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে।

মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

ইসরাইলের সাথে আরব আমিরাতের সহযোগিতা চুক্তিকে ইতোমধ্যেই স্বাগত জানিয়েছে মিসর, জর্ডান , ওমান ও বাহরাইন। তাদের ধারনা এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে। মিসর ও জর্ডানের সাথে আগে থেকেই ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

তবে, এ প্রসংগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী বলেছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গড়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বা আমিরাতের নিরাপত্তা শক্তিশালি হবে এমন ধারণা একটি বিরাট ভুল।

ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সভাপতি ও প্রভাবশালী আলেম আয়াতুল্লাহ আহমাদ জান্নাতি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ক্রীড়নক আরব শাসক ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে তাদের গোপন সম্পর্ক প্রকাশ করে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার মাধ্যমে দখলদার এই অবৈধ রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখা যাবে না।

বুধবার ( ১৯ আগষ্ট) তেহরানে এক বক্তব্যে আয়াতুল্লাহ জান্নাতি বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের তাবেদার আরব আমিরাত সরকারের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জঘন্য ও কলঙ্কজনক।

তিনি আরো বলেছেন, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো তাবেদাররা বহু বছর ধরে ফিলিস্তিন জবরদখলকারী ইসরাইলের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ তাদের শাসকদের এই বিশ্বাসঘাতকতা কখনো ভুলে যাবে না।

তুরস্ক জানিয়ে দিয়েছে, আরব আমিরাতের এ বেইমানী ও ভন্ডামী মুমলমানগন ক্ষমা করবে না এবং কখোনানেই ভুলবেনা।

ইসরাইলের -আরব আমিরাত সহযোগিতা ঘোষনার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এক সংবাদ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অন্য কোন মুসলিম দেশ এটা করলেও , পাকিস্তানের পরিস্কার ঘোষনা হচ্ছে প্যালেষ্টাইনীদের কাছে গ্রহনযোগ্য সমাধান এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরাইলের সাথে কেন প্রকার সম্পর্ক করবেনা।

আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির প্রতিবাদে এবং প্যালেষ্টাইনের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে গত রবিবার প্যালেষ্টাইন দিবস পালন উপলক্ষে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন রাজধানী ইসলামাবাদ, রাওয়ালন্ডি, করাচি, লাহোর, পেশোয়ার সহ বিভিন্ন শহরে বিশাল বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে।

আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখে এক সপ্তাহ পর বুধবার (১৯ আগষ্ট) সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সল বিন ফাহান জার্মানী সফরকালে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্যালেষ্টাইনীদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য কোন সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত তার দেশ ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবেনা।

ওদিকে, ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের একদিন পর মঙ্গলবার (১৮ আগষ্ট)ওমানের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাভি বিন আব্দুল্লাহকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এবং নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বাদ্‌র বিন হামাদ আল বুসাঈদীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

একই দিনে একই কারনে সুদানের পররাষ্টমন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র হায়দার বাদাউইকে বুধবার বরখাস্ত করা হয়েছে।

আফ্রিকার সংখ্যাধিক মুসলমানদের দেশ সুদান ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাল যুদ্ধের পর আটটি আরব দেশের ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সে সম্মলেনেই গৃহীত হয়েছিল ইসরাইল বিরোধী “তিন – না” নীতি। এ “ তিন -না” নীতি হচ্ছে: ইসরাইলর সাথে কোন শান্তি নয়, ইসরাইলের সাথে কোন সমঝাতা নয় এবং ইসরাইলকে কোন স্বীকৃতি নয়।

সুদানে দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা ওমর আল বাসারে সরকার গতবছর সামরিক বাহীনী সমর্থিত ব্যাপক গন আভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত হয়। এরপর দেশটি শাসনভার নিয়েছে সামরিক-বেসামরিক জোটের অস্থায়ী সরকার। এখন দেশের সরকার আর আগের মতো কঠিনভাবে ইসরাইল বিরোধী নয় ।

কী করবে বাংলাদেশ?

প্যালেস্টাইনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ কী করবে? এ প্রশ্নের জবাব পেতে সমিকরণ মেলাতে হবে সৌদি আরবের ভূমিকার সাথে। কারন, তারাও ইসরাইলের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখছে। আর বাংলাদেশ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাবিরোধী সামরিক চুক্তি করে বসে

এ ছাড়া, সৌদি অর্খনৈতিক সহায়তার ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করে বাংলাদেশ। আর আরব আমিরাতের সাথেও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের।

একই সাথে বাংলাদেশের রয়েছে; প্যালেষ্টাইনের মুক্তি সংগ্রাম সমর্থন করার অঙ্গীকার আর ইসরাইলর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক না করার নীতি ।

এ অবস্থায় মুসলিম দেশ হয়ে বাংলাদেশ বিতর্কিত ইসরাইল- আমিরাত চুক্তিকে সমর্থন করবে, না বিরোধীতা করবে, না কী আপাতত: নিরবতা পালন করবে- সেটাই দেখার বিষয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •