দিনুর আলম


‘এক মুজিব লোকান্তরে
লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’
৪৫ বছর পার হয়েছে, স্লোগান বাস্তব হয়ে উঠেনি এখনো। ঘরে ঘরে মুজিব কোট হয়েছে মুজিবের মতো হয়নি কেউ, হতে চায়নি কেউ।
মুজিবের রক্তে ভেজা বাংলার পবিত্র মাটিতে খালি পায়ে হেটে জীবন পার করে যারা কবরে চলে গেছেন, তাদের পয়সা ছিলনা গায়ে ছয় বোতামের মুজিব কোট জড়ানোর। মুজিবের জন্য আবেগ ছিল তাদের, ভালোবাসা, ছিল শ্রদ্ধা ছিল তা দিয়ে গেলেন।
মুজিব হত্যার পর যারা শোকবস্ত্র পরিধান করে বাকিটা জীবন কাটিয়েছেন তাদের নতুন করে গায়ে মুজিব কোট জড়াতে হয়নি।
♦বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে গ্রীষ্মের দাব দাহ যাদের গা থেকে মুজিব কোট সরাতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের খোঁজে পাওয়া যায়নি ৭৫-৯৬ পর্যন্ত।
♦সেই তারা ৯৬ থেকে মাঝখানে ২ বছর বাদ দিয়ে আজ পর্যন্ত শীত কিংবা গ্রীষ্মে মুজিব কোট খোলেনি আর।
♦এই মুজিব কোট গায়ে জড়িয়ে পাপুল হয়ে উঠেছে বিশ্ব দরবারে এদেশের জাতীয় লজ্জা।
♦এই মুজিব কোট পরে সাহেদ হয়েছে জগৎজোড়া প্রতারকের রোল মডেল।
♦ এই মুজিব কোট গায়ে জড়িয়ে হলমার্ক কান্ড করেছে তথাকথিত মুজিব সারথী
♦এই মুজিব কোট গায়ে দিয়ে বিশ্বে অতি ধনী ব্যক্তির সংখ্যায় শীর্ষে বাংলাদেশ।অথচ মুজিব চেয়েছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি।
মুজিব কোট মূলত কতিপয়ের রক্ষাকবচ আর কারো কারো হৃদয়াবেগ।

নামে-কামে(কাজে), চলনে-বলনে, অনেকেই মুজিব সাজতে মরিয়া।
১৫ আগস্ট আর ১৭ মার্চ হয়ে উঠে এদের অভিনয়ের ভরা মৌসুম। এরা পারলে প্রতি দিবসেই একটা করে মুজিব কোট বানায়। একটা মুজিব কোট দুই সিজন পড়লে ময়লা দেখাতে পারে। যাদের সুযোগ হয় তারা নয়া মুজিব কোট পরিধান করে, সিনা টান করে শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়ায়। যে করেই হোক শেখ হাসিনার কাছে খাঁটি মুজিব প্রেমী হিসেবে পরিচিত হওয়া চাই।
২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট চট্টগ্রামের রাজপথে হঠাৎ আবির্ভাব হলো হাজী ইকবাল নামের এক নয়া মুজিব প্রেমীর। শোক র‍্যালী’র সামনে হাজী ইকবাল সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবী আর মুজিব কোট পরিহিত । হাতে জিঞ্জির চাকু নিয়ে (যদিও ওটা আসল জিঞ্জির চাকু নয়) হায় মুজিব হায় মুজিব বলে পিঠে এমন ভাবে চাকু চালাচ্ছিল যদি পিঠে মশা থাকতো সেটাও মরতোনা। এই তামাশা মিডিয়ার সুবাদে দুনিয়াবাসী দেখেছে। গণমাধ্যম কর্মী সিটি মেয়রের কাছে মন্তব্য চাইতে গেলে “তিনি বলেন আমার মন্তব্য করার রুচি নেই, আমি ক্ষুদ্ধ।”

হাজী ইকবালের শোকানুভূতি আমি একেবারেই নকল তা বলছিনা। আমি বলতে চাচ্ছি হাজী ইকবাল কারবালার শোকের মতো শোক না জানিয়ে ১৫ আগস্টের মতো শোক জানাতে পারতেন।গায়ে জিঞ্জির চাকুর পরিবর্তে স্ট্যানগানের গুলি চালালে শোকের ষোলো কলা পূর্ণ হতো।

শেখ হাসিনা পঁচাত্তরের দুঃসহ বেদনা বুকে নিয়ে, ২১ আগস্টের মৃত্যুপুরী পাড়ি দিয়ে আজকের নব্য বেনিয়াতন্ত্রে বন্দিনী।
তাই একজন প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হয় ” একমাত্র শেখ হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামীলীগের সবাইকে কেনা যায়। ”
তিনি হয়তো তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে সক্ষম হন মুজিব কোটের ভেতর কতিপয় মোশতাকের হৃদয়। তাই হয়তো তিনি এখনও দক্ষ নাবিক হয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিচ্ছেন।
এদেশের মাটিতে আর কোনো ৭৫ চাইনা,চাইনা ২১ আগস্ট। কিন্তু অঘটন যদি ঘটেই যায় আমরা দেখবো অঘটনঘটনপটীয়সীর গায়ে ছিল মুজিব কোট,মুখে ছিল “এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। ”
হ্যাঁ, এরা ঠিকই বলছে যদিও মুখ আর মনের অমিল শতভাগ। একজন আসল মুজিবের অনুপস্থিতিতে এরা লক্ষ নকল মুজিব হতে চায়। এতে তাদের ষোলো আনা লাভ। মুজিবের বেশ ধরে এরা নিয়ত ছুরি চালাচ্ছে মুজিবের স্বপ্নে,এরা মুজিবের দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতি বিপ্লবী, এরা শয়তান,এরা চরিত্রহীন, এরা ধোঁকাবাজ, এরা মিথ্যুক,এরা দখলবাজ,এরা চাঁদাবাজ। আর এসব বিশেষণ এদের কাছে অতি নগণ্য।

একটি গল্পের অংশ বিশেষ মনে পড়েছে।
পুরো গল্পটা ঠিক মনে নেই, তবে সারমর্মটুকু এরকম..
“কোনো এক সংস্থার কতিপয় নিম্নপদস্থ কর্মচারী নামাজ-কালাম পড়েনা। তাদের ধর্মের প্রতি মোটেও আগ্রহ নেই। উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তাদের চাপে নামাজ পড়তে হচ্ছে।
তো তারা নামাজের নিয়ত করলেন এভাবে “শালারাও ছাড়েনা
আমরাও না পড়ে পারিনা
………….” (নাউজুবিল্লাহ)

আমার মনে হয় ওই কতিপয় মুজিব কোট পরিধানকারী দিন শেষে মুজিব কোট খোলতে খোলতে বলে থাকেন
“শালারাও ছাড়েনা আমরাও না পরে পারিনা, জয় বাংলা।” (এরা নিপাত যাক)

‘মুজিব কোট’ আর ‘জয় বাংলা’ এ দুটি কতিপয় সুবিধাবাদীর কুকর্মের রক্ষাকবচ, এদের বর্ম বিশেষ।
খোঁজ নিলে দেখা যাবে সবটুকু উজাড় করে দিয়ে, বুকে মুজিব প্রেম নিয়ে বেঁচে থাকা লোকের গায়ে ভালো কাপড় নেই, জুড়েনি একখানা ভালোবাসার মুজিব কোট।…….

দিনুর আলম
শিক্ষার্থী
কক্সবাজার আইন কলেজ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •