আবদুর রহমান খান


আফ্রিকার দারিদ্রপীড়িত, ইবেলা ভাইরাসে পর্যুদস্ত আর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত একটি জনপদের নাম কঙ্গো। খাতা কলমে নাম ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। আট কোটির অধিক জনসংখ্যা অধ্যূষিত দেশটির ৬৪ ভাগ মানুষ বাসকরে দারিদ্র সীমার নীচে। অথচ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে রয়েছে ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অনুত্তোলিত খনিজ।

গত শুক্রবার রাজধানী কিনশাশায় অবস্থিত ইউনিসেফের গুদামে আগুন লাগার ঘটনায় আবারো একবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর হয়েছে দেশটি। কোন প্রান হানি ঘটে নি। তবে, গুদামে মজুদ ইবোলা ও কোভিড আক্রান্ত শিশুদের জন্য অষুধপত্র , চিকিৎসা সামগ্রী এবং শিশুখাদ্য এসব সম্পূর্ন ধ্বংস হয়ে গেছে । গুদামে আগুন লাগার ঘটনার কারন অনুসন্ধান চলছে।

তবে কঙ্গোর দরিদ্র রোগাক্রান্ত শিশুদের জন্য মজুদ অষুধপত্র আর চিকিৎসা সামগ্রীর গুদামে আগুন লাগাবার পেছনে সেদেশের যুদ্ধমান কোন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে বলে অনেকেই সন্দেহ করছে।

সংঘাতের ধারাবাহিকতা

দারিদ্য, রোগ আর সংঘাতের মাঝে চরম দুর্দশায় বেঁচে আছে কঙ্গোর মানুষ। আইএমএফ বলছে, বিশ্বের অতিদরিদ্র এগারোটি দেশের একটি হচ্ছে কঙ্গো। আর এমন দরিদ্র দশার অন্যতম কারণ হচ্ছে সশস্ত্র উপজাতী গোষ্ঠির মধ্যে চলমান দীর্ঘবছরের বিবাদ লড়াই। সরকারী বাহীনি ও বিদ্রাহী বাহীনির মধ্যে সং ঘাতে প্রান হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ ।

সেটা প্রায় তিন দশক আগের কখা । কঙ্গোর সরকারী বাহিনী প্রতিবেশী দেশ নামিবিয়া, এঙ্গোলা ও জিম্বাবুয়ের সহযোগিতা নিয়ে বিদ্রোহী বাহিনী দমনে যুদ্ধে নামে। তখন বিদ্রোহীদের সমর্থন যোগয় রুয়ান্ডা আর উগান্ডা । পাঁচ বছর ধরে চলা সে যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষের বেশী মানুষ মারা যায়। তারপর ২০০৩ সালে একটি শান্তি চুক্তি করে কঙ্গোতে আন্তর্বর্তীকালিন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু দেশের পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র গ্রুপ তুৎসি বিদ্রোহীরা তাদের তৎপরতা অব্যাহত রাখে । আর তাদের সমর্থন যোগায় রুয়ান্ডা। এ অবস্থায় জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনীর সহায়তায় কঙ্গোর সরকারী বাহিনী ২০০৯ সালে তুৎসিদের সাথে একরকম শান্তি স্থাপন করে । তবে অন্য বিদ্রোহী গ্রুপ তাদের সশস্ত্র তৎপরতা ব্যাহত রাখে । দেশে একটি দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার থাকার ফলে সরকারী আর বেসরকারী বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। হত্যা , লুন্ঠন আর ধর্ষনের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাড়ীঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

কঙ্গোকে বলা হচ্ছে নারী ও শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর দেশ । এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ছয় বছরের মেয়েরা থেকে আশি বছর বয়সী মহিলারা যৌন নির্যতনের শিকার হচ্ছেন। গত এক দশকে এরকম অন্তত: দু’লক্ষ কন্যা ও মহিলা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কোন কোন অঞ্চলের অবস্থা এতোই খারাপ যে সেখানে দিনে অন্তত: চল্লিশজন মেয়ে-মহিলা ধর্ষনের শিকার হচ্ছেন।

অপরাধের শিকার এসব মেয়ে বা মহিলাদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতে ভূগতে হয়। তাদের চিকিৎসা দেবার মত যথষ্ট ডাক্তারও নেই। শুধু তাই নয় , উল্টো তাদের পরিবার ও সমাজে লাঞ্ছিত হতে হয়। অবিবাহিত এরকম মেয়েদের বিয়ে হয় না। আর লঞ্ছিত মহিলাদের স্বামী পরিত্যাগ করে দেয়। এ কারনে দরিদ্র মেয়ে ও মহিলাদের দুর্গতির শেষ নেই দরিদ্র এ দেশটিতে।

রোগের প্রকোপ:

২০১৮ সালে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমন ধরা পরে কঙ্গোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্রুতই এ রোগটিকে জরুরী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষনা দেয়। এ রোগটিত পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কঙ্গোতে। গত দু’বছরে দেশটির দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলে ইবোলা ভাইরাসে প্রায় তিনহাজার মানুষ মারা গেছে। গত জুনে দেশটিতে দ্বিতীয় দফায় ইবালা সংক্রমনের খবর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমন। জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশটিত কোভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে চার হাজারর মত মানুষ। মারা গেছে ৬০ জন আর সুস্থ হয়েছেন প্রায় ১,৬০০ জন।

রাজনৈতিক সংকট

প্রেসিডেন্ট যোসেফ কবিলার টানা ১৮ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ৈ বিরোধী নেতা ফেলিক্স সিসেকেদি পেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত বছর জানুয়ারীতে নতুন সরকার গঠন করে। কঙ্গোর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা বদলের ঘটনা। তবে নানা কারনে সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

নতুন সরকারক উত্তরাধিকার সূত্রে মোকাবেলা করতে হচ্ছে সারা দেশে সক্রিয় অন্তত: শ’ খানেক সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপকে যারা সরকারের সাথে সংঘাতের সাথে নিজেদের মধ্যেও খুনাখুনিতে লিপ্ত রয়েছে।

অপরদিকে রয়েছে ব্যাপক দারিদ্র, ইবোলা আর কোভিডের প্রকোপ। এ অবস্থায় দেশের বর্তমান দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার কী পারবে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে? যুদ্ধের রোগে আক্রান্ত বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে কী জিততে পারবে কঙ্গো? এসব প্রশ্নের উত্তর এখুনি জানা না গেলেও এটা বলা খুবই সহজ যে কঙ্গোতে মহামারী, ক্ষুধা আর গুলিতে আরো অনেক মানুষ প্রান হারাবে। আরো অনেক মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের মাঝে নিপতিত হবে। আরো অনেক কন্যা ও মহিলা যৌন নির্যাতনের শিকার হবে।

০৯ আগষ্ট, ২০২০