অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন


আগস্ট মাস, বাঙালির শোকের মাস। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোরে একদল সেনাসদস্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। সেনাবাহিনীর চাকরিরত ও চাকরিচ্যুত ৭-৮ জন মেজর পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং ২টি ইউনিট এই বর্বরতায় অংশ নেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতাবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্র তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় মুজিবকে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। স্বাধীনতাবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসররাই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমেরিকার নিক্সন-কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো চক্র বাংলাদেশের স্বাধীনতারই শুধু বিরোধিতা করেনি, স্বধীন বাংলাদেশ যাতে বিশ্ব মানচিত্রে টিকে থাকতে না পারে তারও চক্রান্ত করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত, এর প্রমাণও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রবল প্রতাপশালী দেশের বিরোধিতা সত্ত্বেও মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কিসিঞ্জারের সাবেক স্টাফ অ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিস এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবের প্রতি তার (কিসিঞ্জার) ঘৃণার কথা স্বীকার করেছেন। মরিস জানান, ‘শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতেন।

এ হলো আধুনিক সভ্যতার দাবীদার তথাকথিত সুসভ্য ইংরেজদের জগন্যতম বর্বরতার জলন্ত নিদর্শন। অতচ এজন্য লজ্জায় ইংরেজ ঐতিহাসিকগনের মাথা নত হয়না। যেমনটি হয়নি বাংলার শেষ নব্বা মিরাজউদদ্দৌলার ক্ষেত্রে।ইংরেজশাসকরা পরদেশ দখললের জন্য পাকিস্থান সহ অন্যান্যদেশকে যতটুকু সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষদের যেখাভে ধ্বংসকরার জন্য সহযোগীতা দেখিয়েছে তা পলাশীর যুদ্ধে সিরাজকে পরাজিত করার ষড়যন্ত্র একিই রকম মনে হয়। সিরাজদ্ধৌল্লা স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষা, দেশবাসীর সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেও যুদ্ধবন্দীদের সাথে এর শতভাগের এক ভাগও অন্যায় করেন নি। ঠিক বঙ্গবন্ধু পাক বাহিনীর পরাজয়ের পর তাদের প্রতি এতটুকু অন্যায় আচরন করেননি।উপরন্তু যেখানে ইংরেজ বিরোধীদের নৃশংসভঅবে হত্যা করেছে, সেখানে সিরাজ পরম শত্রু , পরদেশলোভী, ষড়যন্ত্রকারী উদ্ধত ইংরেজ যুদ্ধ বন্দীদের সসম্মানে মুক্ত করে দিয়েছেন।তবুও তথ্কাথিত ‘সুসভ্য’ইংরেজরা সিরাজ চরিত্র কলংকিত করেছে হলও্রয়েল রচিত মিথ্যা “অন্ধকুপ হত্যা’১৭৮৬ সালে তথাকথিত“ঢাকা হত্যাকাহিনী রচনা করে।

আমাদের দেশে বিকৃত ইতিহাস পরিবেশনের জন্য ইংরেজদের দোষ দেওয়া হলেও তাদের কূটনৈতিক জ্ঞান ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারার কথা অস্বীকার করা যায় না। তারা বুঝেছিলেন, ইতিহাস ভেজাল দিয়েই ভারতবাসীকে অন্ধকারে রাখা সম্ভব, এবং উদ্দেশে ইতিহাস-স্রষ্টা মুসলিম জাতির অক্লান্ত পরিশ্রমের রচনা-সম্ভব আরবী, ফারসী ও উর্দু ইতিহাসগুলোর প্রায় প্রতেকটি অধ্যয়ন, গবেষণা ও অনুবাদ করতে তারা যে অধ্যবসায় ও পরিশ্রমশীলতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা অনস্বীকার্য এবং উল্লেখযোগ্য।সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়ার যত কুট কৌশল এই ইংরেজরাই করে গেছে। স্কুল কলেজর ইতিহাসে সুকৌশলে সত্য ইতিহাস গোপন করে ছেলে মেয়ে দের মাথা নস্ট করা তাদের মুল উদ্দেশ্য ছিল। এবং তা তারা পেরেছিল।আসল ইতিহাস তারা চাপা দিতে পেরেছিল।

মীরজাফর ইংরেজদের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। বন্ধু ছিলেন ক্লাইভ, ওয়াটস, হলওয়েল সবারই। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্টজনদের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়।যে আপন জনের ষড়যন্ত্রে সিরাজ নিহত হয়েছেন , ঠিক সেই রকম আপনজনের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু নিহত হন।ঠিক একই রকম ষড়যন্ত্রে নিহত হন ভারতের প্রধান মন্ত্রি ইন্দিরা গান্ধি।বিদেশী ষড়যন্ত্রেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে।দুজনের মৃত্যুই একি সুত্রে গাঁথা।

আজ আমরা স্বাধীন হয়েছি। অনেক কোরবানীর বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছি।কিন্তু আমাদের শত্রুদের সেই পুরনো ষড়যন্ত্র এখনো থামেনি। দ্বিধাদন্ধ এখনো ঘুচেনি; নিজেদের মধ্যে আজো চলছে দলাদলি ও স্বার্থের হানাহানি। এখন ইংরেজদের সেদিন আর নেই। তাই তার স্থ্না নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের দোসররা এবং তাদের পোষ্যপুত্র দেশী বিদেশী দালাল এ যুগের মীর জাফর, উমিচাঁদ,জগৎশেঠরা ।আমাদের বিরুদ্ধে অহরহ যড়যন্ত্র পাকাচ্ছে তারা। রাজনৈতিক আযাদীর চেয়ে মানসিক আজাদীর মুল্য অনেক বেশী।আর এটা এখনো আমাদের মধ্যে হাসিল হয়নি।মানসিক গোলামীও পরোক্ষ গোলামী।তাই আজ সময় এসেছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণের, সবক গ্রহণের শপত গ্রহনের এবং সকল সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হওয়ার।

আবার ফিরে এসেছে সেই অভিশপ্ত আগস্ট মাস।তাই স্বভাবত বাঙ্গালীদের হৃদয়ে সেই শোকের ছাপটা রয়ে গেছে।যতদিন চাঁদ সূর্য উঠবে,বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভুমিকা বাঙ্গালি মনে রাখবে।