নীলের জলের ঝগড়ায় বাগড়া দিচ্ছে মার্কিন

প্রকাশ: ৭ আগস্ট, ২০২০ ০১:০১

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


This picture taken on November 26, 2019 shows a view of the church of the Coptic Orthodox Church of Saint George and its adjacent service building, overlooking the Nile river in the Egyptian capital Cairo’s southern suburb of Kozzika, about 15 kilometres south of the city centre. – Egypt has for years been suffering from a severe water crisis that is largely blamed on population growth. Mounting anxiety has gripped the already-strained farmers as the completion of Ethiopia’s gigantic dam on the Blue Nile, a key tributary of the Nile, draws nearer. Egypt views the hydro-electric barrage as an existential threat that could severely reduce its water supply. But Ethiopia insists that Egypt’s water share will not be affected. (Photo by Amir MAKAR / AFP) (Photo by AMIR MAKAR/AFP via Getty Images)

 


আবদুর রহমান খান


বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান নীল নদের অববাহিকা। নীল নদের কথা বর্নিত রয়েছে ধর্মগ্রন্থে, প্রাচীন লোকগাথায়, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে , সংগীতে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার পেছনে রয়েছে এই নীল নদের অবদান।

নীল নদকে বলা হয় বিশ্বের দীর্ঘতম নদী। আফ্রিকার মধ্য অঞ্চলের দেশ উগান্ডার দি গ্রেট ভিক্টোরিয়া লেক থেকে উৎপন্ন হয়ে নীল নদ তার উত্তরমুখি যাত্রাপথে বিশাল ভিক্টোরিয়া লেকের নীলবর্ণ জলে সমৃদ্ধ হয়ে মিশরের বদ্বীপ মেহনায় ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে। এ দীর্ঘ ৬,৬৫০ কিলোমিটার (৪,১৩০ মাইল) পথ পরিক্রমায় নীল নদ সিক্ত করেছে অফ্রিকার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত; এগারেটি দেশ । এ নদীর অববাহিকা অঞ্চলের পরিধি চৌত্রিশ লক্ষ বর্গকিলোমিটার, যা গোটা আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় একদশমাংশ ।

সাধারনত: জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টির পানিতে উৎসমুখের জলাধারা ভরে যায়। নদীও ফুলে ফেঁপে ওঠে। আর যখন নদীতে বান ডাকে, দুকুল ভাসিয়ে দেয়। এরকম প্লাবনে পলিমাটি এসে আবার সুজলা সুফলা করে দেয় অববাহিকার অঞ্চল সমূহ। আর যে বছর অনাবৃষ্টি বা খড়া হয় সেবার ফসলহানি, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এমনটিই চলে আসছিল প্রাচীন কাল থেকে।

জল নিয়ে ঝগড়ার সূত্রপাত

অতি সম্প্রতি এই নীল নদের পানি ব্যবহার নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েছে নদী অববাহিকার তিন দেশ – মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়া। এবারের বিবাদের শুরুটা হয়েছে, ইথিওপিয়া তার দেশে এ নদীতে বাঁধ দিয়ে একটি বিশাল জলবিদ্যুত প্রকল্প স্থাপন করেছে । দি গ্রান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসা ড্যাম নামের এ জলবিদ্যুত প্রকল্পটি চালুকরার জন্য বিশালাকার জলাধারে পানি আটকে দেবার কাজও শুরু করেছে। এবারে বর্ষার পানি দিয়ে জলাধার পূর্ণ করার কাজ শুরু করেছে ইথিওপিয়া। বিশালাকার জলাধারটি পূর্ণ করতে ছয় বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছে প্রকৌশলীরা। সম্পূর্ন চালু হলে এ প্রকল্প থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়া যাবে। ইথিওপিয়ার ৬৫ ভাগ মানুষের কাছে এখনো বিদ্যুত পৌঁছায়নি। আর বিদ্যুতের সংকটের কারনে তারা শিল্পায়নেও পিছিয়ে রয়েছে।

উপনিবেশিক আমলে ১৯২৯ সালের এক চুক্তি অনুযায়ি নীল নদের উজানে কোন দেশ নীল নদের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে মিশর তাতে আপত্তি তুলতে পারবে। এ চুক্তির অজুহাত দেখিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে ইখিওপিয়ার এ বাঁধ নির্মান প্রকল্প। দেশের প্রচন্ড চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে ইথিওপিয়া ২০১১ সালে রেনসেসাঁ বাধ প্রকল্পের কাজ শুরু করে দেয়। সে সময়টা ছিল আরব বসন্তের সময়। আর মিসর ব্যস্ত ছিল ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে।

ইথিওপিয়া ইতোমধ্যে ড্যামের মূল অবকাঠামো নির্মান শেষ করে ফেলেছে। বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য টারবাইন ও যন্ত্রপাতি কিনতে অর্থ লগ্নি করেছে চীনের ব্যাংক। আগামী ডিসেম্বরে দু’টি টারবাইন দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন শুরু করা যাবে বলে আশা করছে ইথিওপিয়া।

তবে, উজানের দেশ ইথিওপিয়ার এই বিশাল রেনেসাঁ ড্যাম নির্মানে সবচেয়ে বেশী ক্ষুব্ধ ভাটির দেশ মিশর। তাদের আশংকা, উপরের দিকে পানি আটকে দিলে তাদের ভাগের নদীতে পানি কম আসবে। এর ফলে তাদের আসওয়ান ড্যামেও পানি প্রবাহের সংকট দেখা দেবে। মিশরকে কৃষি-শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নীল নদের ৯০ ভাগ পানির ওপর নির্ভর করতে হয় ।

ইথিওপিয়ার যুক্তি হচ্ছে, নীল নদের পানির ৮৫ ভাগ সরবরাহ আসে তার দেশের ভিক্টোরিয়া লেক থেকে। অভাবগ্রস্ত দেশটির উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত খুবই দরকার। এখানে উৎপন্ন বিদ্যুত অত্র অঞ্চলের দেশগুলির জনগনের জীবনমানের উন্নতি ঘটাবে । এ বাঁধের কারনে ইথিওপিয়ার খরা কবলিত এলাকা উর্বর হবে। লবনাক্ততা কমবে। ফসল হবে। তাদের খাদ্যাভাব কমবে।

ইথিওপিয়া আরো বলছে, তাদের এ জলবিদ্যুত প্রকল্পের কারনে নীল নদের জলে সামান্যই টান পড়বে। তাছাড়া, পানিতো আর স্থায়ীভাবে আটকে রাখা হচ্ছে না; প্রকল্পটি চালু হলে নিয়মিতভাবেই সব পানি ছেড়ে দেয়া হবে নীল নদে।

কিন্তু মিশর এসব যুক্তি মানতে নারাজ। মিসরের যুক্তি হচ্ছে, নীল নদের পানি ব্যবহার নিয়ে ১৯৫৯ সালে মিশর ও সুদানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল সেটাই হতে হবে জলবন্টনের ভিত্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী নদীর জন্য ১০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার ( এম সি এম) পানি রেখে বাকীটা মিসর ও সুদান ব্যবহার করবে। সেসময় এ চুক্তিতে ইথিওপিয়া বা উজানের অন্য কোন দেশকে অর্ভূক্ত করা হয় নি। অথচ ওসব উজানের দেশ থেকেই নীল নদের বেশীরভাগ পানির সরবরাহ আসে।

তবে, ইথিওপিয়া ওরকম ভাগাভাগি গ্রহন করছে না। তারা নীলনদের তীরবর্তী অপর ছ’টি দেশের মধ্য স্বাক্ষরিত ২০১০ সালে চুক্তির কথা টেনে নতুন শর্তে চুক্তি প্রস্তাব করেছে।

ওদিকে তৃতীয় পক্ষ সুদান পড়েছে দোটানায়। শুরুতে তারা ইথওপিয়ার বাঁধ নির্মানের ব্যাপারে তেমন একটা আপত্তি তোলেনি। কারন, তাদের দেশের মানুষ মনে করেছিল ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ বাঁধের দ্বারা তারাও উপকৃত হতে পারে । কিন্তু সম্প্রতি সুদানের পানি ও সেচমন্ত্রী দাবী করেছেন, ইথিওপিয়ার বাঁধ নির্মানের কারণে নীল নদের ভাটিতে পানি প্রবাহের ঘাটতি দেখা দেবে এবং তাতে সুদানের নিজস্ব সেচব্যবস্থা ও বাঁধগুলির কার্যকরিতা হ্রাস পাবে ।

এ অবস্থায় মিশর চেষ্টা করছে ইথিওপিয়ার সাথে একটা রাজনৈতিক সমাধানে আসতে যাতে তাদের অংশের নদী জলশুষ্ক হয়ে তাদের জলসেচ কাজ ব্যহত না হয় এবং আসওয়ান বাঁধের জন্য নিরাপদ ও অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় থাকে।

মার্কিনী বাগড়া

মিশর ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের দরবারে হাজির হয়েছে। ওদিকে আফ্রিকার দুই প্রতিবেশী দেশের ঝগড়ায় মিশরের সিসি সরকারের সমর্থনকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার নাক বাড়িয়ে দিয়েছে । ইথিওপিয়ার পক্ষে চীনের সহায়তা এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগন। আমেরিকান ট্রাম্প সরকার হুমকি দিয়েছে ইথিওপিয়া পানি বন্টনের ব্যাপারে মিসর-সুদানের সাথে সমঝোতায় না এলে উন্নয়ন সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হবে।

এরকম জটিলতার প্রেক্ষাপটে সুদান , মিশর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে মধ্যস্ততার উদ্যাগ নিয়েছে আফ্রিকান দেশ সমূহের জোট – আফ্রিকান ইউনিয়ন। গত ২১ জুলাই আফ্রিকান ইউনিয়নের এক সভায় এ ব্যাপারে একটি গাইডলা‌ইনও ঠিক করে দেয়া হয়েছে।

সে গাইডলাইনের ভিত্তিতে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট তিন দেশ কয়েকদফা বৈঠক করেছে।

ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট তিনটি দেশই একমত হয়েছে যে রেনেসাঁ বাঁধের তলায় পানির প্রবাহ যদি ৩৫-৪০ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের নিচে নেমে যায় তা হলে ভাটিতে মরুকরণ ঘটবে। তাই মরুকরন ঠেকানোর মতো যথেষ্ট পানি প্রবাহের দাবী সুদান ও মিশরের। তবে সুদান এ ব্যাপারে এখনো কোন নিশ্চয়তা দেয় নি। তারা এব্যাপারে একটি ঢিলেঢালা শর্ত চাচ্ছে । কারন তাদের ধারনা বিদ্যুত প্রকল্পের জন্য বিশাল জলাধার পরিপূর্ন রাখতে গিয়ে পানি প্রবাহের চাপ কিছুটা কমে যেতে পারে।

গত সপ্তাহে ত্রিদেশীয় টেকনিক্যাল কমিটির আলোচনা বৈঠকে অংশ নেয়া থেকে বিরত থেকেছে সুদান ও মিসর। একটি সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে  নিজেদের সরকারের সাথে আলোচনার জন্য সময় চেয়েছে এ দু’দেশ । এ বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ।

এ অবস্থায় আফ্রিকান পর্যবেক্ষকদের পরামর্শ হচ্ছে মিসর, সুদান ও ইথিওপিয়া সহ নীল নদের অংশিদার দেশগুলি নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে যদি একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তবে সেটাই হবে উত্তম কাজ। নীল নদের পানির সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা  গোটা অঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মানব কল্যান বয়ে আনবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •