ইশতিয়াক আহমেদ জয় 

৫২,৬৯,৭১,৭৫ পেরিয়ে,আমি দাঁড়িয়ে আছি একবিংশ শতাব্দীর ভয়াল আগস্ট মাসের আজকের বৃষ্টিস্নাত দিনে,এক দৃঢ় ছায়ামূর্তি হয়ে…

আমার চারপাশে চাষ ও সবুজ, আমার সামনে সমুদ্র ও পাহাড়,আমার মননে স্বীকারোক্তির এক দীপ্ত স্লোগান,আমি জয় বাংলার সন্তান,আমি বাংলাদেশের মত উদার আহ্বান।

আমার পায়ে
কাদা, হাতে কাদা, ঘ্রাণে কাদা,
কাদা নয়, সোনা-
আমার মাঠের দিকে তাকাও,

অভিজ্ঞ স্বর্ণকারের মত সেখানে ফলিয়ে এসেছি- স্বপ্নের মত সোনালী ধান।

আমাকে শুনতে হবে তোমাকে, মন দিয়ে শুনতে হবে আমার পরিচয়।

ওঁই সোনালী ধানের কথা বললাম, হ্যাঁ আমি কৃষক।

আমার পদবী “চাষা’’।
সভ্যের মুখে যা গালি হয়ে ভাসে………………

চলো হাটি কয়েক পা—-

ওঁই যে সামনে আকাশটা দেখছো, মাত্র দুপুর নেমে আসা আকাশ, ওটা আমার…………

আমি জানি রোদ-বৃষ্টির সমস্ত খবর,

আমি তোমার মেরুদণ্ডের পুস্টি ফলাই, কাঁদায়-ধুলোয়।

এসো একটু পেছনে তাকাই…
দেখতে পাচ্ছো? ওঁই যে- দূরে দাঁড়িয়ে আছে একাত্তর সাল,

ওই দেখো রেসকোর্স,তর্জনী ডাক..

তিনি বলছেন,
এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,
তিনি বলছেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম..

চিনতে পারছো লোকটাকে, যদিও অমন কন্ঠস্বর পৃথিবীতে একজনরেই মাত্র হয়,যার বুকের দিকে তাকালে দেখা যায় সাহসের প্রতিচ্ছবি।

হ্যাঁ …
শেখ মুজিবর, আমার নেতা, আমার বন্ধু, আমার একান্ত স্বজন।

ওঁই সাড়ির দিকে তাকাও,বুকে পিঠে জয় বাঙলা লিখে,স্বাধীনতার স্বপ্ন লিখে, সাহসের প্রতিশব্দ মুজিব লিখে আমরা এসেছিলাম।

কেউ এসেছিলাম ত্রিশ মাইল পায়ে হেঁটে,

কেউ এসেছিলাম কারখানা অস্বীকার করে,

কেউ এসেছিলাম মায়ের কাছের ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি লিখে,

সন্তানের গালে চুমুর চিহ্ন এঁকে।

আমরা সবাই এসেছিলাম,

ওঁই যে কাস্তে হাতে চার নম্বর সাড়িতে দাঁড়িয়ে জয় বাঙলা স্লোগান দিচ্ছি, ওটাই আমি, চাষা।

মন দিয়ে শোন,তোমাকে শুনতে হবে তোমার সন্তানের স্বার্থে, তোমার সীমানার স্বার্থে।

সেদিনে ওদের কামান, রাইফেলসহ নানান অস্ত্রের ভান্ডার ছিল,

আমাদের কি ছিলো?

ছিল, স্টেইজে দাঁড়ানো মুজিবর, কয়েক প্লাটুন সৈন্যে ও গোলাবারুদের চেয়ে ভয়ঙ্কর।

পাকিস্তানীরা তো দখলের স্লোগান শিখেছে আজন্মতাই টের পায়নি ভালোবাসার মহাতেজ।

ওঁই যে একটু ময়লা ময়লা কালো চেক শার্ট লোকটা দেখছো, চার নম্বর সাড়ির শেষ ডানে, উনি একজন স্কুল মাস্টার।

কতদিন কোন ছাত্রকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেন নি,

চিৎকার উনি সহসাই হয়ে উঠেছেন, সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ,

ভালোবাসার এমনই জোর‍!!!

খেয়াল করেছিলে কি, ???
যখন মুজিবর বলল তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে,তখন অনাগত রক্তের দৃশ্যে কেউ ভীত নয়, সবাই সমস্বরে চেচিয়ে উঠলো জয় বাংলায়….

যেন সামনে এক যাদুকর,মন্ত্রমুগ্ধ সমবেত কাস্তে-লাঠিতে ঠেকাবে বুলেট।

এরপর তো তুমি জানোই,কত হত্যা,কত নৃশংসতা….
ধর্মের নামে কি অশ্লীল মিথ্যাচারে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইলো, স্বাধীনতার মত পবিত্র চাওয়া।

পারে নি।
আমরা মরেছি, মেরেছি এবং জিতেছি।

আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নসারথি, এরপর বাংলাদেশ নামের এক দিব্যরথে রওনা হলেন, সমৃদ্ধির দিকে।

খুনীরা বরাবর লজ্জাহীন, খুনীরা হেরে গেলেও ফিরে আসে ষড়যন্ত্রের নির্মম তেলাপোকায়,

খুনীরা রাতের অন্ধকারে, স্পর্শ করে সাহসের বুক।

সাহস এত সুন্দর ও পবিত্র, যে কর্পূরের মত ঘ্রাণ নিয়ে উড়ে যায় মহাশুণ্যে।

রাসেলের নাম শুনেছো?

শেখ রাসেল।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট- ষড়যন্ত্রের জলপাই জীপ ঠেকাতে কর্নেল জামিল সোবাহানবাগে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

ওরা কর্নেল জামিলকে বাঁচতে দেয় নি, কারণ সেনাবাহিনীর পবিত্রতায় মোড়া সৈন্য ওরা না

ওরা পাকিস্তানি প্রেতাত্মা, ওরা সেনাবাহিনীর বদনাম।

কর্নেল জামিল বাঁচেন নি।

সাহসের মত খালি পায়ে হেঁটে মুজিবর সিড়ি বেয়ে নেমে এসেছিলেন,

হাতে পাইপ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

মৃত্যুর দিনে দাঁড়িয়ে কাব্য মানায় না, তবু কবিতার মত এক অদ্ভুত শিহরণ যেন।

মুজিব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি চাস তোরা’?

মুজিব জানতেন ওরা তার সন্তান,
ওরা যদি একবার উচ্চারণ করতো, ‘আপনার রক্ত চাই”

বিশ্বাস করো, ওঁই মহান পিতা হাসতে হাসতে দাঁড়াতেন বিপথগামী বন্দুকের বুকে,,,

কাব্য নয় কাব্য নয়, এটা মুজীবিয় বাস্তবতা, কখনও কখনও যা কবিতার প্রতিশব্দ।

ওরা আসলে শুধু বন্দুকটাই চালানো শিখেছিল,
সাহস শব্দের চর্চা করে নি কখনও!! পিতার প্রশ্নে তাই ছুটে গেল উত্তরহীন বুলেট।

পিতা সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লেন,
আর তার বুকে রাখা বাংলাদেশ একবার এদিকে একবার ওদিকে হুমড়ি খেতে লাগল।

বাংলাদেশ কেঁদেছিল,
হাউমাউ করে কেঁদেছিল,প্রিয় সন্তানের মৃত্যুতে কি কোন মা কান্না আঁটকে রাখতে পারে?

ওরা রাসেলকে মেরেছিল, যে রাসেল মাত্রই শিখেছিল সম্বোধন

যে রাসেল, আধো আধো সুরে বা ডাকতো, মা ডাকতো- ঘরময় দৌড়ে বেড়াতো দেবদুত উচ্ছলতায়।

সেই রাসেলের বুকে বুলেট ডুকড়ে ডুকড়ে কাঁদতে থাকলো নিয়ন্ত্রণের অপারগতায়।

মারা গেলেন, শেখ কামাল, শেখ জামাল, সহ সবাই- সবাই, এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে কেবল ক্ষমতাচুত্যের মানসেই হত্যা নয়।

এই হত্যা পুনরায় পাকিস্তানবাদ প্রতিষ্ঠার হত্যা।

মাতা ফজিলুত্তুন্নেছা মুজিব, একজন যোগ্য সহধর্মিণী, সাহসের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক,

যার চোখের তারায় একবিন্দু কালি জমে নি, জেলবন্দী স্বামীর জন্য কান্নায়।

বরং সমস্ত কান্না সাহস আর প্রার্থনায় রুপান্তরিত হয়েছে, এক বাঙালি বধুর অসামান্যতায়।

এ যেন নাজিম হিকমতের উচ্চারণের মত সত্য,

সেই কবি বলেছিলেন,
“মনে রাখবে স্বামী যার জেলখানায়,তার মুখ যেন সর্বদাই হাসিখুশি থাকে’।

এরপর, এরপর একজন মায়ের নিস্তেজ শরীর বেয়নেটের চাদর মুড়িয়ে, শুয়ে আছে নিথর, নিস্তেজ।

যে মায়ের গর্ভে জন্মেছে হাসিনার মত দৃশ্যমান প্রত্যয়, রেহেনার মত বোনের আন্তরিকতা।

রাসেল পানি চেয়েছিল, হয়তো শেষবারের মত মায়ের বুকে মাথা রেখে বলতে চেয়েছিল, “মাগো আমার ভয় পাচ্ছে খুব,ওরা কি ভুত’’?

পারে নি।

সে হত্যা ক্ষমতার দখলের জন্যই ছিল না শুধু, সে হত্যা ছিল নিসচিনহের এক নির্মম এজেন্ডা।

ওরা সমুলে মুছে দিতে চেয়েছিল একজন স্বপ্নদ্রষ্টার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত।

ওরা শুধু মুজিবের রক্তই, ভয় পেয়েছে তার সাহচর্যে বেড়ে ওঠা প্রতিটি অস্তিত্বকে।

ওদের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন বকুল, যিনি কাজের মেয়ে ছিলেন মুজিববাড়ির, ওরা বকুলকেও ভয় পেয়েছিল, কারণ ওদের মুল আতঙ্কের নাম ছিল মুজিব আদর্শ।

জাতীয় চারনেতা বাচেন নি, যাদের বুকের ভালোবাসার মত শব্দ করে করে বাজতেন, মুজিবর, প্রিয় নেতা, প্রিয় সহচর।

এরপর ক্ষমতায় কারা এল তাতো দেখেছোই, কীভাবে এল, কীভাবে বদলালো ওঁই যে, ওঁই খানে লেখা আছে তার পুরোটা।

জিয়া কেন ফিরিয়ে আনলেন গোলাম আজমকে, যে গোলাম আজমকে ক্ষমা করেন নি স্বয়ং শেখ মুজিব?

এই প্রশ্ন জাগে নি তোমার মনে?

শোন,
পিতাকে বলা হয়েছিল, সমস্ত শত্রু নিশ্চিহ্ন করে দিতে,কিন্তু তিনি তো শেখ মুজিব,মানুষের সাথে মিশে,মানুষের জন্য চিৎকার করে, শেষমেশ মানুষের পাতে ভাত খেয়ে তৃপ্তির হাসি মেখে ঘরে ফিরে আসা টুঙ্গিপাড়ার খোকা।

তিনি ভালোবাসতেন, ভালোবাসার নায্য অধিকার ছিনিয়ে আনতে স্লোগান দিতেন, দিতেন সিদ্ধান্ত, তাতে হয়তো প্রাণহানী হত্ কম বেশি, যেমনটা দেখেছি যুদ্ধদিনে।

কিন্তু যুদ্ধ শেষে পরিকল্পনায় তিনি হত্যার নির্দেশ দেবেন, সেতো তার চরিত্র বিরুদ্ধ।সাধারণ ক্ষমা করলেন,যে বাঙালিরা বিরোধিতা করেছিল বাংলাদেশের।

ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বিরোধ মিটেই যায়, এ আমাদের চিরকালীন চরিত্র—পিতা জানতেন…

কিন্তু ক্ষমা করেননি গোলাম আজমদের,তারা চলে গিয়েছিল তাদের প্রিয় পাকিস্তানে।

এরপর তাকে কেন ফিরিয়ে আনলো জিয়া???একবার প্রশ্ন করো তাকে, যদি দেখা হয় কখনও।

মুক্তির সাথে বেইমানি করলে অন্তরাত্মা উড়ে যায়,আর কোন পাখি বসে না উঠোনে, তাকে বলে দিও।

দুই টুকরো আশা সীমানা ছাড়িয়ে বেঁচে থাকলো শুধু,
যেন একটা বিশাল সমুদ্র,তার ভেতর লুকিয়ে আছে তীরবর্তী সমস্ত উপকূল বিনির্মাণের দুই অলৌকিক স্বপ্নকাঠি।

হাসিনা ফিরলেন একদিন,ফিরলেন রেহেনাও।

হাসিনায় জনজোয়ার হল, স্লোগান হল…

পুনরায় পাখিতে প্রাণ পেল, জয় বাঙলা শীষে।

উঠোনে উঠোনে দোয়েল আবার, শাপলা পুকুরে জয়নুল, নজরুল।

আবার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আবার পুনরায় বেঁচে ওঠার প্রত্যয়—-

হাসিনায় হাসিনায় দারুণ হাসি,
বাংলার প্রতিটি গ্রামে গঞ্জে,মায়ের ঘুম ভাঙা সকালের প্রতিটি উঠোনে যেন প্রিয় স্বজন, ঘরের বোন, উপার্জনক্ষম সংসারের বড় মেয়ের ফিরে আসার আনন্দিত মুহূর্ত।

হাসিনা ফিরলেন, হাসিনা দেখলেন, হাসিনা বললেন———–
‘জয় বাঙলা’….

কিন্তু তত দিনে ষড়যন্ত্রের সমস্ত বিষ পরিপূর্ণ- ডালপালায়- দাঁড়িয়ে আছে বিষাক্ত নখে,

মগজে মগজে দারুণ সংক্রমণ।

তবু ভয়হীন এক প্রাণ হেঁটে গেলেন বাংলাদেশের পথ বেয়ে

এত কাঁটা, এত রক্তপাত তিনি দমেন নি…………

কারণ তার মান্সে তখন কেবলই পুনুরুদ্ধারের স্বপ্ন,যে স্বপ্ন সকালের মত সত্য ও সুন্দর।

একবার তো গ্রেনেড ছোড়া হল সমাবেশে,
প্রাণ হারালেন তার সহযোদ্ধা আইভি রহমান, প্রাণ হারালালেন আরও কিছু বাংলাদেশের মত প্রাণ।

দুঃখিনী বাংলাদেশের আন্তরিক প্রার্থনায় সেদিন বাঁচলেন, বেঁচে আছেন এখনও…

কিন্তু শোন,
তোমাকে বলছি তরুণ, এই যুদ্ধটা তার একার নয়, তোমারো…..

এই যুদ্ধটা একটি রাজনৈতিক দলেরই নয় কেবল,

যুদ্ধটা বাংলাদেশের , প্রতিপক্ষ অদৃশ্য ছায়ামুর্তি–

খেয়াল করে দেখবে, অপপ্রচার থেমে নেই, খেয়াল করে দেখবে চারপাশে দুষ্টু লোকেরও কমতি নেই

এ দায় বাংলাদেশের নয়,

এ দায় সেনাপতির নয়

এ দায় ব্যাক্তির,

এ দায় পুরনো কিছু গোপ্ন স্বার্থের

শোন, আমাকে সাথে নাও, চলো একসাথে হাটি

লিখে পরিপূর্ণ বাংলাদেশে

মুজিবের চোখের কালো বেয়ে যে এক টুকরো হতাশার জল জমেছিল সেদিন, ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে

সেই জলের পবিত্রতায় চলো তরুণ আমরা বাংলাদেশ লিখি।

আমি কে?

আমি হচ্ছে তুমি

তুমি কিন্তু তুমি নও
তুমি হচ্ছে আমরা

আমরা কারা?

আমরা ৭ মার্চের রেসকোর্সের তর্জনী সাহস

আমরা কালো ফ্রেম ঠিক্রে বেড়িয়ে আসা ভালোবাসা মাখা চোখ…

আমরা গ্রামের রাস্তা

আমরা সমুদ্রের উচ্ছ্বাস

আমরা বনানীর মুগ্ধতা

মুক্তির ডাকটিকিট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা প্রত্যেকে একেকজন বাংলাদেশ…

—————————————————————–

ইশতিয়াক আহমেদ জয়,
০৬ অগাস্ট ২০২০ ইং
কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •