আবদুর রহমান খান


একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে দোর্দন্ড দাপটে এগিয়ে যাচ্ছে দামোদর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত।

ভারতের গনতন্ত্রকামী মানুষের মতামতকে তুড়ি মেরে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার নামে মুসলমানদের দেশছাড়া করার নীতি আবলম্বন, কেবল সামরিক শক্তির জোরে কাশ্মীরকে দুমড়ে মুচড়ে পর্যুদস্ত করা, এ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে দিল্লিতে পুলিশের মদদে এক সপ্তাহের অধিককাল ব্যাপী দাঙ্গা পরিচালনা করে মুসলিম নাগরিকদের হত্যা করা , গরুর গোস্ত নিষেধের নামে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার এবং সর্বশেষ বিশ্ব মহামারী করোনা আতংকের মাঝে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের ধ্বংস্তুপের উপর রাম মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নরেন্দ্র মোদির সরকার যথার্থভাবেই প্রমান করেছে যে তারা মুসলিম বিরোধী উগ্র হিন্দুত্ববাদী। তারা নিজ জনমত বা বিশ্ব জনমতের তোয়াক্কা করে না।

লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, রাম মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে ৫ আগষ্টকে । একবছর আগে এই দিনটিতে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মার্যাদা খর্ব করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এ অঞ্চলটিতে পুরোপুরিভাবে দখলদারিত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

কাশ্মীর দখলের বর্ষপূর্তিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয় শংকর সগৌরবে দাবী করেছেন জম্মু-কাশ্মির-লাদাখে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। আইনের সংশোধন, বিচার ব্যবস্থার সংশোধন আর উন্নয়রের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে ।

আর এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রীভি গাঙ্গুলি ঢাকার একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে সাক্ষাতকারে বলেছেন বাংলাদেশের সাথে ভারতের এমন সম্পর্ক বিশ্বে আর কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না। আগামীতে এ সম্পর্ক আরো বাড়বে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার কাশ্মীরের সংকট বা ভারতের বিতর্কিক নাগরিকত্ব আইনকে সে দেশের আভ্যন্তরীন বিষয় বলে মনে করে থাকে।

ওদিকে, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি কাশ্মির দখল দিবসকে তাদের “নয়া কাশ্মীর” দিবস হিসেবে উৎসবের দিন বলে উদযাপন করছে। এ নিয়ে পনের দিন ধরে তাদের কর্মসূচী রয়েছে।

আর খোদ কাশ্মীরের মানুষ এ দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে ঘোষনা দিয়ে ৫ আগষ্ট হরতাল পালন করেছে। কোনরকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ যাতে হতে না পারে সে জন্য দু’দিন আগেই কাশ্মীরে জারি করা হয় কারফিউ। রাস্তঅয় সেনা টহল, মোমোড়ে বেরিকেড দিয়ে সাজেআয়া যান নিয়ে মোতায়ের সি আরপি ফের্স । এ দিন কাশ্মীরে বর্ষীয়ান নেতা ফারুক আবদুল্লার বাড়ীতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈঠক করতেও দেয়া হয় নি। কাশ্মীরে রাজনৈতিক নেতারা এমন পরিস্থিতিকে বলেছেন জম্মু-কাশ্মীর হচ্ছে এখন একটা বিশাল জেলখানা।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাঝেও ৫ আগষ্ট সোপিয়ান জেলার বনবাজার এলাকায় দু’দফা গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছে।

কী ঘটছে কাশ্মীরে

১৯১৯ সালের ৫ আগষ্ট ভারতীয় পার্লামেন্টে সংবিধান সংশেধন করার আগেই বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠিয়ে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে জেলে পুরে আর জরুরী অবস্থা জারি করে কাশ্মিরকে পরিপূর্ণভাবে দখলে নিয়ে নেয়া হয়। এরপর কাশ্মীরকে দু’টি অঞ্চলে ভাগ করে কেন্দ্রীয় শাসনের আধীনে নিয়ে আসা হয়।

কাশ্মীরীদের প্রতিরোধ সংগ্রাম মোকাবেলায় ভারত সরকার কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ আর সামরিক বাহিনী নিয়েআগ করে চরম নির্যাতন আর দমন অভিযান পরিচালনা করছে । কারফিউ, পাড়া-মহল্লা ঘেরাও করে বাড়ী বাড়ী তল্লাসী, সন্দেহভাজনদের বিশেষ করে যুবকদের বেছে বেছে হত্যা, নারীদের ওপর নির্যাতন- এসব এখন কাশ্মীরের দিনলিপি।

ভারত সরকার কাশ্মীরকে দখলে নেবার পর এখন সেখানে ইসরায়েলের প্যালেষ্টাইন দখলের কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। এর আগে কাশমীরের জমি-সম্পত্তি ক্রয়, চাকুরি, খনিজ আহরণ- এসবের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার ছিল কাশ্মীরীদের। এখন তা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে ভারতীয়দের জন্য। কাশ্মীরে অভিবাসন আইনের সংশোধন এনে সেখানে জমি-সম্পত্তি ক্রয় করে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য ভরতের অন্য রাজ্য থেকে আগত সরকারী কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এরকম কয়েক হাজার অভিবাসন অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

আরো নগ্নভাবে, একদা ব্রিটিশ সরকার যেমনটি করেছে, কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী ব্যক্তি বা কথিত জঙ্গী যুবকদের পরিবারগুলি চিহ্নিত করে তাদের সকল সম্পত্তি দখলে নেবার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। এ লক্ষ্যে ৪৪ সেনা কর্মকর্তা নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্সও গঠন করা হয়েছে।

ওদিক ক্যান্টনমেন্টের বাইরে সেনাদের দখলে থাকা বিপুল পরিমান জমি আইন করে তাদেরকে স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেখানে সেনারা তাদের ঘর-বাড়ী বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মান করতে পারবে। এর আগে ২০১৬ সালে কাশ্মীরের তৎকালীন চীফ মিনিষ্টার মেহবুবা মুফতি রাজ্যের আইন সভায় জানিয়েছিলেন যে, ভারতের সেনাবাহীনী জম্মুতে ৫১,১১৬ কানাল সরকারী জমি এবং কাশ্মীর ও লাদাখে ৩৭৯, ৮১৭ কানাল সরকারী জমি বেআইনী ভাবে দখল করে রেখেছে । কাশ্মীরে জমির মাপ – এক কানালে ৫১০ বর্গ মিটার অথবা এক একরের আট ভাগের একভাগ জমি।

সম্প্রতি ভূমি বিষয় আইন – ডেভলপমেন্ট এ্যক্ট ১৯৭০ এবং কন্ট্রোল অব বিল্ডিং অপারেশনস এ্যাকট ১৯৮৮ সংশোধন করে এবার এসব জমির ওপর সেনাবাহিনীর আইনগত অধিকার, পাকা স্থাপনা নিমানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ নিয়ৈ স্থানীয়দের কোন মতামত দেবার আর সুযোগ থাকল না।

অপরদিকে চীনের সাথে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জরুরী অবস্থার নামে যুদ্ধের কৌশলগত কারন দেখিয়ে যে কোন স্থানে ভূমি দখল করার সূযোগ করে দেয়া হয়েছে সেনাবাহীনিকে। নির্মান করা হচ্ছে গণ-বাংকার।

কাশ্মীরে দখলদারিত্ব নির্বিঘ্ন করতে বন্দুকের নিশানা বানানো হয়েছে কাশ্মীরের প্রতিবাদী যুবকদের, ঠিক যেভাবে ইসরাইলিরা করছে প্যালেষ্টাইনে। বৃহৎ গনতন্ত্রে দাবীদার ভারতে কাশ্মীরীদের নেই কোন নাগরিক অধিকার, ঈদ বা জুম্মার নামাজে জমায়েত হতে পারেন না মুসলিশ অধ্যুষিত রাজ্যের মানুষেরা। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ তো দূরে থাক , স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন না কাশ্মীরের মানুষ। রাজনৈতিক লক-ডাউনের সাথে জুড়েছে কোভিড-১৯ জনিত লক-ডাইন। জরুরী ওষুদ, চিকিৎসাসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের সংকট। ইন্টারনেট টেলিফোন সেবা ব্যহত। আইন করে গনমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রনে রেখে বন্দী করা হচ্ছে সাংবাদিকদের। দীর্ঘদিন কারাগারে বা গৃহবন্দী রাখা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে।

এরকম একটা শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থার কথা উল্লেখ করে ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমানে রাজ্যসভার সদস্য পি চিদাম্বরম রবিবার ( ০২ আগষ্ট) ইন্ডিয়ান একপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটা নিবন্ধে বলেছেন, কাশ্মীরে সকল মৌলিক অধিকার স্থগিত, জন নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছা প্রয়োগ, ঘেরাও-তল্লাসী নিত্যদিনের বিপদ, গণমাধমের স্বাধীনতা লুন্ঠিত।

নিন্দায় সোচ্চার আন্তর্জাতিক মহল

কাশ্মীর দখলের বর্ষ পূর্তিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার নেতৃবৃন্দ কাশ্মীরে চরম মানবাধির লংঘনের ধারাবাহিকতা বন্ধ করতে ভারত সহ আন্তর্জাতি সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেবার আহবান জানিয়েছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার নের্তবৃন্দের সমর্থনে ওআইসি মানবাধিকার কমিশন এক বার্তায় কাশ্শীরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম সহ যাবতীয় মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কাশ্মীর দখল দিবস উপলক্ষে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখানে গত একবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চলছে, চলছে গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা।

তাছাড়া, লন্ডনভিত্তিক এমনেষ্টি ইন্টারন্যশনাল এ উপলক্ষে সেখানকার নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলাচল ও জীবন যাপনের আধিকার ফিরিয়ে দেবার দাবী জানিয়েছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রিত প্রবাসী কাশ্মীরীদের ৫৬টি সংগঠনের মোর্চা কাশ্মীর এয়্যারনেস ফোরাম জানিয়েছে ৫ আগষ্ট ২০১৯ এর পর থেকে এক নির্মম দখলদারিত্বের অধীনে কাশ্মীরের সাধারন মানুষ চরম নির্যানের কবলে নিষ্পেষিত হচ্ছে।

এদিকে কাশ্মিরী শহীদদের স্মরনে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে একটি দেয়াল উন্মোন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এ দিনটিতে কাশ্মীরকে পাকিস্থানের অংশ হিসেবে দেখিয়ে নতুন ম্যাপ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার। আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঘোষনা দিয়েছে তারা কাশ্মীরের জনগনের মুক্তির লড়াইয়ে সর্বদাই সাথে থাকবে।

ওদিকে কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলকে নিজের ভূখন্ড দাবীকরে বসে আছে চীন। এ নিয়ে জুনে এদফা সংঘর্ষ হয়ে গেছে ভারতের সাথে। এখন এক দিকে চলছে সমর সজ্জা বৃদ্ধি আর একদিকে চলছে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য দফায় দফায় বৈঠক।

এ রকম অবস্থায় অবরুদ্ধ কাশ্মীরীদের ভাগ্যে আরো কত দুর্ভোগ বাড়বে আর কতদিনই বা চলবে তা এখনই বলার সময় আসে নি। ##

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •